ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়াতেই যদি নাগরিকদের নাম বাদ পড়ে, তবে সেই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য কী? নির্বাচন কমিশনকে এই প্রশ্ন করল বম্বে হাইকোর্টের গোয়া বেঞ্চ। সোমবার, ৫ অক্টোবর, গোয়ার একটি পরিবারের ছয় সদস্যের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া সংক্রান্ত মামলার শুনানিতে আদালত এই প্রশ্ন তোলে। বিচারপতিদের বক্তব্য, যোগ্য ভারতীয় নাগরিকদের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার দায়িত্ব কমিশনের। বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআরের প্রয়োগে সেই দায়িত্ব কীভাবে পালিত হচ্ছে, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে।

মামলাকারী পরেশ সালগাঁওকর ও তাঁর পরিবারের পাঁচ সদস্য প্রায় আট বছর আগে সান্তা ক্রুজ বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যেই অন্য বাড়িতে চলে যান। বুথস্তরের আধিকারিকের পরামর্শে তাঁরা ঠিকানা পরিবর্তনের জন্য ফর্ম ৮ জমা দেন। তাঁদের অভিযোগ, পরে জানানো হয়, ভোটার তালিকা থেকে নাম মুছে যাওয়ায় ওই আবেদনগুলি আর বিবেচনা করা সম্ভব নয়।

পরিবারটির বক্তব্য, সহকারী নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক তাঁদের নতুন করে ফর্ম ৬ জমা দিতে বলেন। কারণ, কমিশনের ইআরওনেট ব্যবস্থায় বাদ যাওয়া ভোটার পরিচয়পত্রের তথ্য পুনর্বিবেচনা বা পুনর্বহালের সুযোগ নেই বলে জানানো হয়েছিল। অর্থাৎ, ঠিকানা সংশোধন করতে এসে তাঁদের সামনে নতুন ভোটার হিসেবে আবেদন করার পথ দেখানো হয়। ফলে আবেদনকারীরা প্রতিকার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন, শুরু হয় শুনানি।

কমিশনের আইনজীবী গৌরীশ অগ্নির যুক্তি, এসআইআরের নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গণনার ফর্ম জমা দেওয়া প্রয়োজন। সেই ফর্ম জমা না পড়লে খসড়া তালিকায় নাম থাকে না। আর খসড়া তালিকাতেই যাঁর নাম নেই, ফর্ম ৮ দিয়ে তাঁর ঠিকানা পরিবর্তন করা যাবে কীভাবে? কমিশনের বক্তব্য, এই অবস্থায় দাবি ও আপত্তি জানানোর পর্যায়ে ফর্ম ৬ এবং প্রয়োজনীয় ঘোষণাপত্র দিয়ে অন্তর্ভুক্তির আবেদন করা যায়।

বিচারপতি বাল্মীকি মেনেজেস ও বিচারপতি অমিত জামসন্দেকরের বেঞ্চ এই ব্যাখ্যা নিয়ে আপত্তি তোলে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, নতুন তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার আগে বিদ্যমান ভোটার তালিকাকে উপেক্ষা করা যায় না। একজন ব্যক্তি আগে থেকেই নথিভুক্ত ভোটার এবং শুধু ঠিকানা বদলাতে চাইছেন—তাঁর আবেদনকে কেবল খসড়া তালিকায় নাম না থাকার কারণে আটকে দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে বেঞ্চ। আদালত জানতে চায়, কেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ফর্ম ৮ সরাসরি বিবেচনা করা যাবে না।

গণনার ফর্মে থাকা ঘোষণার বিষয়টিও শুনানিতে গুরুত্ব পায়। আদালত জানায়, আগে থেকে পূরণ করা ফর্মে পুরনো ঠিকানায় বসবাসের ঘোষণা চাওয়া হলে বাড়ি বদলানো ব্যক্তি সমস্যায় পড়বেন। তিনি যখন আর সেখানে থাকেন না, তখন সেই ঠিকানায় থাকার ঘোষণা দেবেন কীভাবে? ঠিকানা পরিবর্তনের কথা জানানো নাগরিককে ভুল ঘোষণা করতে বাধ্য করা যায় না বলে মন্তব্য করে বেঞ্চ। এমন ঘোষণার আইনগত পরিণতি নিয়েও উদ্বেগ জানায় আদালত।

নাম বাদ দেওয়ার আগে পরিবারটিকে নোটিস দেওয়া হয়েছিল কি না, তাও জানতে চায় হাইকোর্ট। কমিশনের আইনজীবী জানান, বিভিন্ন স্তরের নোটিস বোর্ডে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছিল। তাঁর ব্যাখ্যা, ভোটারদের নতুন ঠিকানার তথ্য সব ক্ষেত্রে কমিশনের কাছে নাও থাকতে পারে। এই জবাবের মধ্যেই ব্যক্তিগত শুনানির সুযোগের প্রশ্নটি সামনে আসে।

১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধির ২১ নম্বর বিধির প্রসঙ্গ তুলে আদালত বলে, বিষয়টি বিদ্যমান তালিকার ভিত্তিতে দেখতে হবে। অন্যথায় ভোটার এমন এক চক্রে আটকে পড়বেন, যেখানে ঠিকানা বদলের আবেদনও গ্রহণ করা হচ্ছে না, আবার অন্য ফর্ম পূরণ করতে গিয়ে ঘোষণার সত্যতা নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। বেঞ্চ সংশ্লিষ্ট গণনার ফর্ম ও সংযুক্তিগুলিও দেখতে চেয়েছে।

সোমবারের এই মন্তব্যগুলি শুনানি চলাকালীন আদালতের মৌখিক পর্যবেক্ষণ। মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। মঙ্গলবার, ৬ অক্টোবর, ফের শুনানি হওয়ার কথা। পরবর্তী শুনানিতে কমিশনের পদ্ধতি এবং ঠিকানা বদলাতে চাওয়া ওই পরিবারের আবেদন কীভাবে বিবেচিত হবে, তা নিয়েই আলোচনা এগোবে।