দলত্যাগ মামলা: ৩ মাসেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে স্পিকারকে, নির্দেশ শীর্ষ আদালতের

যা জানা জরুরি
- এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ব্যতিক্রমী কারণ না থাকলে সংবিধানের দশম তফসিলের অধীনে কোনও বিধায়কের সদস্যপদ খারিজের আবেদন তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে…
- যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে: ‘‘দশম তফসিলের অধীনে বিচারাধিকরণ হিসেবে কাজ করার সময় স্পিকার যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে সদস্যপদ…
- তবে যথার্থ কারণসমর্থিত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি না থাকলে, আবেদন জমা পড়ার দিন থেকে তিন মাসই হবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সর্বোচ্চ সময়সীমা।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
এক গুরুত্বপূর্ণ রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ব্যতিক্রমী কারণ না থাকলে সংবিধানের দশম তফসিলের অধীনে কোনও বিধায়কের সদস্যপদ খারিজের আবেদন তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে হবে বিধানসভার স্পিকারকে।
যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত নেওয়ার গুরুত্ব তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্ট বলেছে:
‘‘দশম তফসিলের অধীনে বিচারাধিকরণ হিসেবে কাজ করার সময় স্পিকার যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে সদস্যপদ খারিজের আবেদন নিষ্পত্তি করতে বাধ্য।”
কোন সময়সীমা যুক্তিসংগত, তা প্রতিটি মামলার তথ্য ও পরিস্থিতির উপর নির্ভর করবে। তবে যথার্থ কারণসমর্থিত ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি না থাকলে, আবেদন জমা পড়ার দিন থেকে তিন মাসই হবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সর্বোচ্চ সময়সীমা। দশম তফসিল লঙ্ঘনকারীদের সদস্যপদ খারিজের সাংবিধানিক উদ্দেশ্য পূরণ করতে হলে স্পিকারের কাছে দায়ের হওয়া আবেদনগুলি এই সময়ের মধ্যেই নিষ্পত্তি করতে হবে।
সাধারণত লোকসভা ও রাজ্য বিধানসভাগুলির মেয়াদ পাঁচ বছর—এই বিষয়টি মাথায় রেখেই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বিবেচনায় রাখা হয়েছে, যাঁরা সদস্যপদ খারিজের যোগ্য হয়েছেন, তাঁদের এক দিনও সাংসদ বা বিধায়ক হিসেবে থাকার অধিকার নেই।
মণিপুর বিধানসভায় দলত্যাগের অভিযোগ সংক্রান্ত একটি মামলায় বিচারপতি আর এফ নরিম্যান, বিচারপতি অনিরুদ্ধ বসু এবং বিচারপতি ভি রামসুব্রহ্মণ্যমের বেঞ্চ এই রায় দেয়।
রাজনৈতিক আনুগত্যের কারণে স্পিকারদের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের সমস্যাটিও স্বীকার করেছে বেঞ্চ। আদালত উল্লেখ করেছে, কিহোতো হোলোহান বনাম জাচিলহু ও অন্যান্য মামলায় সংখ্যালঘু বিচারপতিদের মতেও এই আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই কারণে দশম তফসিল সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিদের নেতৃত্বে স্থায়ী বিচারাধিকরণের মতো একটি স্বাধীন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংসদকে সংবিধান সংশোধনের কথা বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে বেঞ্চ।
আদালত বলেছে:
‘‘স্পিকার যখন আইনগত ভাবে অথবা কার্যত কোনও নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত থাকেন, তখন আধা-বিচারবিভাগীয় কর্তৃপক্ষ হিসেবে সদস্যপদ খারিজের আবেদন নিষ্পত্তির দায়িত্ব তাঁর হাতে থাকা উচিত কি না, তা নিয়ে সংসদের নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।”
‘‘দশম তফসিলের অধীনে সদস্যপদ খারিজ সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তিকারী হিসেবে লোকসভা ও বিধানসভার স্পিকারদের পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্টের কোনও অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অথবা হাই কোর্টের কোনও অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে স্থায়ী বিচারাধিকরণ গঠনের জন্য সংবিধান সংশোধনের বিষয়টি সংসদ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে পারে। অথবা অন্য কোনও বহিরাগত স্বাধীন ব্যবস্থাও গড়ে তোলা যেতে পারে। উদ্দেশ্য হবে, এই ধরনের বিরোধের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা। তবেই আমাদের গণতন্ত্রের সুষ্ঠু পরিচালনার পক্ষে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দশম তফসিলের বিধানগুলি প্রকৃত অর্থে কার্যকর হবে।’’
আদালতের সামনে থাকা মামলাটি ছিল মণিপুরের এক বিধায়কের সদস্যপদ খারিজের দাবি নিয়ে। অভিযোগ, ২০১৭ সালের বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের টিকিটে জেতার পর তিনি বিজেপিকে সমর্থন করেন এবং সরকার গড়তে সাহায্য করেন।
তাঁর সদস্যপদ খারিজের আবেদনে সিদ্ধান্ত নিতে স্পিকার দেরি করায় মণিপুর হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন আবেদনকারী। কিন্তু হাই কোর্ট হস্তক্ষেপ করতে অস্বীকার করে। হাই কোর্টের বক্তব্য ছিল, আদালত স্পিকারকে নির্দেশ দিতে পারে কি না, সেই প্রশ্ন সুপ্রিম কোর্টের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে বিচারাধীন।
এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করা হয়।
সুপ্রিম কোর্ট জানায়, স্পিকারকে নির্দেশ দেওয়ার বিষয়ে আদালতের ক্ষমতা সংক্রান্ত প্রশ্নটি বিচারাধীন রয়েছে বলে হাই কোর্ট যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা ভুল।
বেঞ্চের বক্তব্য, ২০০৭ সালেই রাজেন্দ্র সিংহ রানা বনাম স্বামী প্রসাদ মৌর্য মামলায়—যার উল্লেখ (২০০৭) ৪ এসসিসি ২৭০—এই প্রশ্নের মীমাংসা হয়েছিল। ওই রায়ে বলা হয়, স্পিকার তাঁর উপর ন্যস্ত বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ না করলে বিষয়টি আদালতের বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় আসবে।
সেই রায়টি নজরে না এনেই পরবর্তী একটি বেঞ্চ ২০১৬ সালে এস এ সম্পত কুমার বনাম কালে ইয়াদাইয়া ও অন্যান্য মামলায় বিষয়টি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠিয়েছিল।
বিচারপতি নরিম্যানের লেখা রায়ে বলা হয়েছে:
‘‘রাজেন্দ্র সিংহ রানা মামলার রায়, বিশেষত তার ৪০ ও ৪১ নম্বর অনুচ্ছেদের দাগ দেওয়া অংশগুলি পড়লে স্পষ্ট হয়, এস এ সম্পত কুমার মামলায় দুই বিচারপতির বেঞ্চ যে প্রশ্নটি বৃহত্তর বেঞ্চে পাঠিয়েছিল, তার উত্তর আগেই স্পষ্ট ভাবে দেওয়া হয়েছে। স্পিকারের উপর ন্যস্ত বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগে ব্যর্থতাকে দশম তফসিলের ৬ নম্বর অনুচ্ছেদের সুরক্ষা দিয়ে আড়াল করা যায় না। স্পিকার যখন যুক্তিসংগত সময়ের মধ্যে কোনও আবেদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকেন, তখন তা স্পষ্টতই এমন একটি ত্রুটি, যার ক্ষেত্রে হাই কোর্ট বিচারবিভাগীয় পর্যালোচনার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে।’’
এই মামলার নির্দিষ্ট পরিস্থিতি বিবেচনা করে সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দেয়, রায়টি স্পিকারকে জানানোর দিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে তাঁকে বিচারাধীন সদস্যপদ খারিজের আবেদনগুলির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
তবে সংশ্লিষ্ট বিধায়কের সদস্যপদ খারিজের প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্ট নিজে সিদ্ধান্ত নিতে অস্বীকার করে। আদালত জানায়, বিষয়টিতে প্রথম সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব স্পিকারেরই।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।



