মার্কিন নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজে ইরানের হামলার চেষ্টার পাল্টা জবাবে পাঁচটি ইরানি তেলবাহী জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে বলে মঙ্গলবার জানিয়েছে আমেরিকার সামরিক বাহিনী। কয়েক সপ্তাহের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পরে সাম্প্রতিক দিনগুলিতে যে সংঘর্ষ নতুন করে তীব্র হয়েছে, এই হামলা তাতে আরও ইন্ধন জোগাল।

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ওমান উপসাগরে ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ডস কোরের ব্যবহৃত চারটি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজ এবং খার্গ দ্বীপের কাছে আরও একটি জাহাজ ধ্বংস করা হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, দেশের তেলশিল্পের প্রধান কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ এবং দক্ষিণ উপকূলের বন্দরশহর জাস্কের কাছে ইরানি তেলবাহী জাহাজগুলিতে হামলা চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।

প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করে রেভলিউশনারি গার্ডস কুয়েত ও বাহরাইনের কাছে থাকা তেলবাহী জাহাজগুলি থেকে কর্মীদের সরিয়ে নেওয়ার সতর্কবার্তা দিয়েছে। এই দুই দেশেই মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। এর কিছু পরেই পৃথক বিবৃতিতে গার্ডস দাবি করে, তারা জর্ডনের একটি মার্কিন ঘাঁটিতে প্রবল ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে এবং মার্কিন নৌবাহিনীর দু’টি ডেস্ট্রয়ারে আঘাত হেনেছে।

ইরানের এই দাবিগুলি নিয়ে সেন্ট্রাল কমান্ড তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করেনি।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের বদলে দেশটির অর্থনীতি অবরুদ্ধ করার দিকে জোর দিতে চাইলেও, গত কয়েক দিনে লড়াই আবার মাথাচাড়া দিয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দু’পক্ষের টানাপড়েনই এই সংঘর্ষের কেন্দ্রে।

মার্কিন সামরিক কর্তারা অঙ্গীকার করেছেন, তেহরান প্রতি দু’টি জাহাজে আঘাত করলে তাঁরা তিনটি ইরানি জাহাজে হামলা চালাবেন। কিন্তু ইরান জাহাজে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহের পথ সংকুচিত করে প্রতিপক্ষের উপরে চাপ সৃষ্টির অন্যতম প্রধান হাতিয়ারটি নিজেদের হাতে রাখতে চাইছে তারা।

ফলে তৈরি হয়েছে অচলাবস্থা।

মঙ্গলবার যে ইরানি তেলবাহী জাহাজগুলিকে নিশানা করা হয়েছে, সেগুলি রেভলিউশনারি গার্ডস এবং অঞ্চলে তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলিকে অর্থ জোগানো বহু শত কোটি ডলারের একটি গোপন নেটওয়ার্কের অংশ বলে জানিয়েছে সেন্ট্রাল কমান্ড। তাদের বক্তব্য, ইরান দু’দিনে দু’বার একটি মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পরে এই হামলা চালানো হয়েছে।

মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে নতুন করে নিশানা করার কোনও চেষ্টার কথা ইরান তাৎক্ষণিকভাবে স্বীকার করেনি। তবে সপ্তাহান্তেও হামলা-পাল্টা হামলার একই চক্র দেখা গিয়েছিল। শনিবার আমেরিকা ও ইরান—উভয়েই পরস্পরের জাহাজে হামলা চালানোর কথা জানিয়েছিল।

সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছিল, দু’টি মার্কিন যুদ্ধজাহাজে ইরানের হামলার চেষ্টার জবাবে তারা তিনটি ইরানি অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজে আঘাত হেনেছে। মার্কিন জাহাজগুলিকে নিশানা করার দায় স্বীকার করে ইরান। এরপর মার্কিন হামলার জবাবে আরও ছ’টি জাহাজে হামলা চালানোর দাবি করে তারা।

এই পাল্টাপাল্টি নৌ-হামলার কয়েক দিন আগেই দক্ষিণ ইরানে বোমাবর্ষণ করেছিল আমেরিকা। তার জেরে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অন্যতম তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়। একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বেসামরিক মানুষও নিহত হন।

মঙ্গলবারের মার্কিন হামলাই অবশ্য দুই দেশের মধ্যে সমুদ্রে চলতে থাকা সংঘাতের একমাত্র নিদর্শন নয়।

এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইরানের নৌবাহিনী দাবি করে, তারা হরমুজ প্রণালীতে আমেরিকার একটি চালকবিহীন ডুবোযান আটক করেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, গভীর জলে দীর্ঘ সময় ধরে স্বাধীনভাবে অভিযান চালানোর উপযোগী করে যানটি তৈরি করা হয়েছিল। নজরদারি এবং মাইন শনাক্ত করাও তার কাজের অন্তর্ভুক্ত।

সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র ক্যাপ্টেন টিম হকিন্স জানিয়েছেন, চলমান অভিযানে সহায়তার জন্য ওই অঞ্চলের জলসীমা পর্যবেক্ষণে ব্যবহৃত একটি মার্কিন ডুবো ড্রোন এক দিনেরও বেশি আগে বিকল হয়েছিল। তাঁর বক্তব্য, সেটি ছিল পুরনো মডেলের একটি ত্রুটিপূর্ণ ড্রোন। সেটি কোনও সংবেদনশীল তথ্য সংগ্রহ করত না, তার মধ্যে কোনও গোপন সরঞ্জামও ছিল না। তবে ইরান সেটি আটক করেছে বলে যে খবর প্রকাশিত হয়েছে, তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি।

ইরান বরাবর দাবি করে আসছে, তার দক্ষিণ উপকূল সংলগ্ন হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিয়ন্ত্রণের অধিকার তাকে দিতে হবে। তেল এবং অন্যান্য অত্যাবশ্যক সম্পদ পরিবহণের জন্য এই জলপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফেব্রুয়ারিতে আমেরিকা ও ইজ়রায়েল যুদ্ধ শুরু করার পরে প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বিপুলভাবে কমে যায়।

মার্কিন নৌবাহিনী ওমানের উপকূলের কাছাকাছি প্রণালীর দক্ষিণের একটি পথ ধরে জাহাজগুলিকে যাতায়াতে সাহায্য করছে। সেই তৎপরতাকে কেন্দ্র করেই ইরান হামলা চালাচ্ছে।

ইরান ও আমেরিকার মধ্যে প্রায় এক মাসের তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতির পরে গত কয়েক দিনে নতুন করে এই হিংসা ছড়িয়েছে।

অগস্টের শেষ দিকে দু’পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি বিনিময় হয়। একই সময়ে ট্রাম্প নতুন করে হুমকি দেন। তিনি বলেন, ইরানের সন্দেহভাজন পরমাণু কেন্দ্র ‘পিকঅ্যাক্স মাউন্টেন’-এ আমেরিকা ‘খুব শীঘ্রই’ হামলা চালাতে পারে।

কৌশল বদলে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বন্দরগুলিতে নৌ-অবরোধ কার্যকর করা এবং তেহরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর মাধ্যমে দেশটিকে অর্থনৈতিক চাপে ফেলার চেষ্টা করছে।

কিন্তু সাম্প্রতিক লড়াই সেই কৌশল কার্যকর করার অসুবিধাগুলিই সামনে এনেছে। নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি কার্যকর করা বরাবরই অত্যন্ত কঠিন। ইরানের ক্ষেত্রে সেই চেষ্টা আমেরিকাকে মিত্রদেশ এবং পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতাসম্পন্ন শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে জটিল সংঘাতে জড়িয়ে দিতে পারে। সেই প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য চিন।