রামায়ণ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। তবে পৌরাণিক এই মহাকাব্যকে নারীবাদী চোখে দেখলে বিতর্ক যে কতটা তীব্র হতে পারে, তারই নতুন উদাহরণ ‘The Reel Woman: Feminist Version of Ramayana’। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই ভিডিও ঘিরে ইতিমধ্যেই তৈরি হয়েছে তীব্র মতবিরোধ। কেউ দেখছেন নারীর দৃষ্টিকোণ থেকে পুরনো কাহিনিকে নতুন করে পড়ার সাহসী প্রয়াস হিসেবে, আবার কারও অভিযোগ—এভাবে রামায়ণের চরিত্র ও দর্শনকে বিকৃত করা হচ্ছে।
বিতর্কের তীব্রতা এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে অনেকেই এর সঙ্গে ওম রাউতের ‘আদিপুরুষ’-এর বিতর্কের তুলনা টানছেন। তবে দু’টির বিতর্কের জায়গা এক নয়। ‘আদিপুরুষ’ মূলত সংলাপ, চরিত্রের উপস্থাপন, নির্মাণশৈলী ও ভিএফএক্স নিয়ে সমালোচিত হয়েছিল। ‘The Reel Woman’ সরাসরি রামায়ণের ঘটনা ও চরিত্রগুলিকে একটি আধুনিক নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে পড়ার চেষ্টা করেছে। আর সেখানেই তৈরি হয়েছে নতুন সংঘাত।
সীতা থেকে শূর্পণখা—নতুন পাঠ
ভিডিওটিতে রামায়ণের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে বর্তমান সময়ের লিঙ্গ-রাজনীতি, নারীর স্বাধীনতা এবং সামাজিক ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখানো হয়েছে।
সীতার অগ্নিপরীক্ষা ও বনবাস, শূর্পণখার নাক কেটে দেওয়া, কৈকেয়ীর ভূমিকা—পরিচিত ঘটনাগুলিকে এবার প্রশ্নের চোখে দেখা হয়েছে। কেন কোনও সিদ্ধান্তে নারীর ইচ্ছা বা মতামত উপেক্ষিত হয়? ক্ষমতার কাঠামোয় নারী কোথায় দাঁড়িয়ে? সমাজের নৈতিকতার দায় কি সবসময় নারীর উপরই বেশি চাপানো হয়?
এই ধরনের প্রশ্নই ভিডিওটির আলোচনার কেন্দ্রে।
নির্মাতাদের বক্তব্য, উদ্দেশ্য রামায়ণকে অসম্মান করা নয়; বরং একটি প্রাচীন মহাকাব্যকে বর্তমান সমাজের লিঙ্গ-রাজনীতি ও নারীর অধিকার নিয়ে চলা আলোচনার সঙ্গে যুক্ত করা। কিন্তু সমালোচকদের বক্তব্য সম্পূর্ণ বিপরীত। তাঁদের অভিযোগ, আধুনিক সামাজিক ও রাজনৈতিক মানদণ্ড দিয়ে রামায়ণের চরিত্রগুলিকে বিচার করতে গিয়ে মূল কাহিনি ও তার দর্শনকেই বদলে দেওয়া হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় দুই শিবির
ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসার পর দর্শকদের মতামতও দ্রুত দুই মেরুতে ভাগ হয়ে গিয়েছে।
সমর্থকদের যুক্তি, রামায়ণ কোনও একক, অপরিবর্তনীয় কাহিনি নয়। ভারতীয় উপমহাদেশে যুগে যুগে বিভিন্ন ভাষা, অঞ্চল ও সম্প্রদায়ের মধ্যে এই মহাকাব্যের অসংখ্য সংস্করণ ও পুনর্কথন তৈরি হয়েছে। কোথাও চরিত্রের গুরুত্ব বদলেছে, কোথাও ঘটনাপ্রবাহে এসেছে পরিবর্তন, কোথাও আবার রামায়ণের পরিচিত চরিত্রগুলিকেই সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে।
তাই তাঁদের মতে, নারীর অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে রামায়ণকে নতুন করে পড়া সাহিত্যিক ও সৃজনশীল স্বাধীনতারই অংশ।
বিরোধীদের প্রশ্ন অবশ্য অন্য জায়গায়। তাঁদের বক্তব্য, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকলেও ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত একটি মহাকাব্যকে পুনর্ব্যাখ্যা করার সময় সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার বিষয়টিও মাথায় রাখা জরুরি।
তাঁদের অভিযোগ, ভিডিওটি রাম, লক্ষ্মণ এবং অন্যান্য চরিত্রকে বর্তমান সময়ের সামাজিক ও রাজনৈতিক মূল্যবোধ দিয়ে বিচার করে এমন একটি বয়ান তৈরি করেছে, যা রামায়ণের প্রচলিত ভাবনার সঙ্গে মেলে না।
‘আদিপুরুষ’-এর সঙ্গে তুলনা কেন?
এখানেই উঠে আসছে ‘আদিপুরুষ’-এর প্রসঙ্গ।
২০২৩ সালে ওম রাউতের ছবি মুক্তির পর সংলাপ, চরিত্রচিত্রণ এবং পৌরাণিক কাহিনির উপস্থাপন নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে রামায়ণের পরিচিত চরিত্রগুলিকে আধুনিক সিনেমাটিক ভাষায় উপস্থাপনের ধরন নিয়ে আপত্তি উঠেছিল।
‘The Reel Woman’-এর ক্ষেত্রে বিতর্কের ধরন আলাদা হলেও প্রশ্নটি অনেকটা একই জায়গায় এসে দাঁড়াচ্ছে—রামায়ণকে কতটা বদলে নতুনভাবে বলা যায়?
তবে অনেক দর্শকের মতে, ‘আদিপুরুষ’-এর সমস্যা ছিল মূলত তার উপস্থাপনায়। অন্যদিকে নতুন ভাইরাল ভিডিওটি সরাসরি কাহিনির নৈতিকতা, চরিত্রের ভূমিকা এবং নারীর অবস্থানকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। ফলে বিতর্কও আরও মতাদর্শগত হয়ে উঠেছে।
রামায়ণের কি একটাই ব্যাখ্যা?
বিশেষজ্ঞদের একাংশ অবশ্য মনে করিয়ে দিচ্ছেন, রামায়ণের বহুমাত্রিক পাঠ নতুন কোনও বিষয় নয়। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে লোকসংস্কৃতি, আঞ্চলিক সাহিত্য, নাটক, কবিতা এবং গবেষণায় এই মহাকাব্যের চরিত্র ও ঘটনাগুলিকে নানা দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
সীতাকে কেন্দ্র করে লেখা হয়েছে অসংখ্য পুনর্কথন। শূর্পণখা, কৈকেয়ী এমনকি রাবণের মতো চরিত্রকেও বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আধুনিক রচনায় নতুনভাবে দেখা হয়েছে।
সমস্যা তৈরি হয় যখন এই দীর্ঘ ও জটিল আলোচনাকে কয়েক মিনিটের সামাজিক মাধ্যমের ভিডিওতে সীমাবদ্ধ করা হয়। তখন বহুস্তরীয় চরিত্র ও ঐতিহাসিক-সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট সহজেই অতিসরলীকৃত হয়ে যেতে পারে। আর সেই সরলীকরণই অনেক সময় বিতর্ককে আরও তীব্র করে।
বিশ্বাস বনাম সৃজনশীল স্বাধীনতা
‘আদিপুরুষ’ বিতর্কের সময় অভিনেত্রী দীপিকা চিকলিয়া এবং অভিনেতা সুনীল লাহরীও মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, রামায়ণ শুধুমাত্র বিনোদনের বিষয় নয়। বহু মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস, সংস্কৃতি ও আবেগের সঙ্গে এই কাহিনি গভীরভাবে জড়িত।
তাঁদের বক্তব্যের মূল সুর ছিল—নতুন করে রামায়ণ বলার স্বাধীনতা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধও থাকা প্রয়োজন।
বর্তমান বিতর্ক সেই পুরনো প্রশ্নটিই আরও একবার সামনে এনে দিয়েছে।
পৌরাণিক কাহিনি কি সময়ের সঙ্গে নতুন করে পড়া ও ব্যাখ্যা করা যাবে? নাকি ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত চরিত্র ও ঘটনাগুলির ক্ষেত্রে কিছু সীমারেখা থাকা উচিত?
এর কোনও সহজ উত্তর নেই। কারণ একদিকে রয়েছে সৃজনশীল স্বাধীনতা ও নতুন প্রজন্মের চোখে পুরনো কাহিনিকে পুনরাবিষ্কারের অধিকার, অন্যদিকে রয়েছে কোটি কোটি মানুষের ধর্মীয় বিশ্বাস ও সাংস্কৃতিক আবেগ।
তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—সামাজিক মাধ্যমের যুগে রামায়ণকে নতুন চোখে দেখার চেষ্টা যত বাড়বে, বিশ্বাস, নারীবাদ, সাহিত্যিক স্বাধীনতা এবং সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতার সংঘাতও তত জোরালো হবে। আর সেই বিতর্কের কেন্দ্র থেকে রামায়ণ যে সহজে সরে যাচ্ছে না, তা ফের প্রমাণ করল ‘The Reel Woman’।