খবর

উত্তরপ্রদেশে ভোটের নতুন অঙ্ক: তরুণ ও মহিলাদের মন জয়ে কল্যাণের প্রতিশ্রুতি ঘিরে বিজেপি–সপা–বসপা লড়াই

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন এখনও বেশ কিছুটা দূরে।
  • কিন্তু তরুণ প্রজন্ম ও মহিলা ভোটারদের নিজেদের দিকে টানতে এখন থেকেই প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে বিজেপি, সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজ পার্টি।
  • মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এক লক্ষ তরুণ-তরুণীকে সরকারি চাকরি দেওয়া এবং প্রবীণ মহিলাদের বিনামূল্যে সরকারি বাসে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: উত্তরপ্রদেশে ২০২৭ সালের বিধানসভা নির্বাচন এখনও বেশ কিছুটা দূরে। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম ও মহিলা ভোটারদের নিজেদের দিকে টানতে এখন থেকেই প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতায় নেমে পড়েছে বিজেপি, সমাজবাদী পার্টি এবং বহুজন সমাজ পার্টি। মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ এক লক্ষ তরুণ-তরুণীকে সরকারি চাকরি দেওয়া এবং প্রবীণ মহিলাদের বিনামূল্যে সরকারি বাসে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন। পাল্টা সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব দরিদ্র ও বিপন্ন মহিলাদের বছরে ৪০ হাজার টাকা আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি পুনরায় সামনে এনেছেন। অন্য দিকে, বসপা নেত্রী মায়াবতী সংরক্ষিত শূন্যপদ দ্রুত পূরণের দাবি তুলেছেন।

এক জনসভায় যোগী দাবি করেছেন, উত্তরপ্রদেশে বিজেপির নয় বছরের শাসনকালে ৯ লক্ষ ৩০ হাজারেরও বেশি তরুণ-তরুণীকে সরকারি চাকরি দেওয়া হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় আরও এক লক্ষ সরকারি চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেছেন তিনি।

তবে মুখ্যমন্ত্রীর এই ঘোষণা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন নিয়োগ পরীক্ষা পরিচালনায় অনিয়ম, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছাত্র ও চাকরিপ্রার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। দিল্লির যন্তরমন্তর থেকে ঝাড়খণ্ড ও বিহার—সাম্প্রতিক কালে একাধিক রাজ্যে এই সব অভিযোগকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ হয়েছে।

উত্তরপ্রদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। পুলিশ ও লেখপাল নিয়োগ পরীক্ষা এবং নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস-সহ বিভিন্ন অভিযোগে মে মাসে প্রয়াগরাজ ও জুন মাসে লখনউয়ে বিক্ষোভ দেখিয়েছিলেন চাকরিপ্রার্থী এবং পড়ুয়ারা। ফলে যোগীর এক লক্ষ চাকরির ঘোষণা শুধু উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়, তরুণদের জমে থাকা ক্ষোভ প্রশমনের রাজনৈতিক প্রয়াস বলেও মনে করা হচ্ছে।

মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণার সময় নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা বসপা প্রধান মায়াবতী। তাঁর বক্তব্য, সরকারি চাকরি দেওয়া অবশ্যই সঠিক পদক্ষেপ। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের আগে এই ঘোষণা ভোটমুখী কৌশলও হতে পারে।

মায়াবতী সংরক্ষিত শ্রেণির শূন্যপদের বকেয়া নিয়েও সরব হয়েছেন। ৬৯ হাজার শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ তুলে সংরক্ষিত শ্রেণিভুক্ত ৬,৮০০ প্রার্থী দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন। বসপা নেত্রী সেই আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে দাবি করেছেন, নতুন চাকরির ঘোষণা করার পাশাপাশি সরকারকে আগে সংরক্ষিত শূন্যপদ পূরণ এবং বঞ্চিত প্রার্থীদের সমস্যার সমাধান করতে হবে।

বিজেপি অবশ্য মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণাকে নির্বাচনী চমক বলতে নারাজ। দলের দাবি, এক লক্ষ সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতিকে বিচ্ছিন্ন ভাবে দেখলে চলবে না। উত্তরপ্রদেশে বিজেপি সরকারের কর্মসংস্থানের সামগ্রিক রেকর্ডের নিরিখেই বিষয়টি বিচার করা উচিত।

শুধু সরকারি চাকরি নয়, তরুণদের জন্য নতুন ব্যবসা, দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিনিয়োগের সুযোগ তৈরির কথাও সামনে আনছে বিজেপি। যোগীর দাবি, উত্তরপ্রদেশে বর্তমানে তরুণদের জন্য ২৪ হাজারেরও বেশি নতুন উদ্যোগের মঞ্চ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ, বিজেপি তরুণদের কাছে এক দিকে সরকারি চাকরির নিশ্চয়তা, অন্য দিকে স্বনির্ভরতা ও উদ্যোগপতি হওয়ার সুযোগ—দুই বার্তাই পৌঁছে দিতে চাইছে।

উত্তরপ্রদেশে তরুণ এবং ‘জেন জি’ ভোটারের সংখ্যা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। বিশেষ নিবিড় সংশোধনের পরে নির্বাচন কমিশন ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছে, তাতে রাজ্যের মোট ভোটার সংখ্যা ১৩ কোটি ৩৯ লক্ষ। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে শুধু ১৮ থেকে ১৯ বছর বয়সি নতুন ভোটারই রয়েছেন ১৭ লক্ষ ৬৩ হাজার। ফলে প্রথম বার ভোট দিতে চলা এই প্রজন্মকে কোনও দলই উপেক্ষা করতে পারছে না।

মহিলা ভোটারদের জন্য প্রতিশ্রুতির প্রতিযোগিতা

তরুণদের জন্য চাকরির ঘোষণা করার এক দিন পরেই যোগী আদিত্যনাথ মহিলাদের জন্য ‘লোকমাতা অহল্যাবাই মাতৃশক্তি যাত্রা যোজনা’ চালু করেন। এই প্রকল্পে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সি মহিলারা রাজ্য সরকারি বাসে বিনামূল্যে যাতায়াত করতে পারবেন।

রাখিবন্ধন উপলক্ষে ২৭ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত মহিলাদের সঙ্গে এক জন সহযাত্রীকেও বিনামূল্যে বাসে যাতায়াতের সুযোগ দেওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছে।

এই প্রকল্প বিজেপির বৃহত্তর মহিলা-কেন্দ্রিক রাজনৈতিক প্রচারেরই অংশ। মহিলাদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নের জন্য ‘মিশন শক্তি’, ১০৯০ মহিলা সহায়তা নম্বর এবং যাতায়াতের সুবিধার মতো কর্মসূচিকে সামনে রেখে বিজেপি মহিলা ভোটারদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

যোগীর ঘোষণার পরেই পাল্টা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন সমাজবাদী পার্টির সভাপতি অখিলেশ যাদব। তিনি জানিয়েছেন, ২০২৭ সালে সমাজবাদী পার্টি উত্তরপ্রদেশে ক্ষমতায় এলে ‘স্ত্রী সম্মান সমৃদ্ধি যোজনা’ চালু করা হবে। এই প্রকল্পে রাজ্যের প্রত্যেক দরিদ্র, বঞ্চিত ও বিপন্ন মহিলাকে বছরে ৪০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে।

অখিলেশের দাবি, তাঁর দলের ‘পিডিএ’—অর্থাৎ পিছড়া, দলিত ও অল্পসংখ্যক—রাজনীতির মধ্যেই রাজ্যের ‘অর্ধেক জনসংখ্যা’ মহিলাদের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আর্থিক শক্তিবৃদ্ধির অঙ্গীকার রয়েছে।

সমাজবাদী পার্টির প্রস্তাবিত কর্মসূচির মধ্যে ছাত্রীদের জন্য ল্যাপটপ ও সাইকেল, সরকারি বাসে মহিলাদের বিনামূল্যে যাতায়াত, আবাসন, জরুরি চিকিৎসার জন্য অ্যাম্বুল্যান্স পরিষেবা এবং বিনামূল্যে আইনি সহায়তার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

অখিলেশ এমন একটি অনুষ্ঠানে এই সব ঘোষণা করেন, যেখানে মঞ্চে দলের মহিলা নেত্রী, সাংসদ ও বিধায়কদের বিশেষ ভাবে উপস্থিত রাখা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে ছিলেন অখিলেশের স্ত্রী তথা সাংসদ ডিম্পল যাদবও। ফলে অনুষ্ঠানটির রাজনৈতিক বার্তা ছিল স্পষ্ট—মহিলা ভোটকে নিজেদের পক্ষে আনতে সমাজবাদী পার্টি আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছে।

উত্তরপ্রদেশে বর্তমানে মহিলা ভোটারের সংখ্যা ৬ কোটি ৯ লক্ষ। তাঁরা রাজ্যের মোট ভোটারের ৪৫.৪৬ শতাংশ। এত বিপুল মহিলা ভোটারই ব্যাখ্যা করে কেন বিজেপি মহিলাদের জন্য একের পর এক কল্যাণমূলক প্রকল্প ঘোষণা করছে এবং সমাজবাদী পার্টিও তার পাল্টা আরও বড় আর্থিক সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।

মায়াবতী অবশ্য শুধু বিনামূল্যে যাতায়াতের মতো সুবিধাকে যথেষ্ট বলে মনে করছেন না। তাঁর বক্তব্য, মহিলাদের শোষণ ও অত্যাচার থেকে রক্ষা করতে সরকারের সঠিক সদিচ্ছা ও নীতি প্রয়োজন। একই সঙ্গে তাঁদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আত্মনির্ভরতা নিশ্চিত করতে হবে।

যোগী সরকারের বিরুদ্ধে মহিলাদের ‘নিরাপত্তাহীনতা, অবহেলা ও অপমান’ দেওয়ার অভিযোগ করেছেন বসপা নেত্রী। তাঁর দাবি, বিজেপির কাছে মহিলারা প্রকৃত ক্ষমতায়নের অংশীদার নন; তাঁরা কেবল রাজনৈতিক স্লোগানের বিষয়।

নির্বাচনের আগেই তৈরি হচ্ছে কল্যাণ-রাজনীতির রণক্ষেত্র

সরকারের একের পর এক ঘোষণা এবং বিরোধীদের পাল্টা প্রতিশ্রুতি থেকে স্পষ্ট, ২০২৭ সালের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনে কল্যাণমূলক রাজনীতি আরও তীব্র রূপ নিতে চলেছে।

বিজেপি তুলে ধরছে নিজেদের পরিষেবা পৌঁছে দেওয়ার দাবি—প্রায় এক দশকের শাসন, ৯ লক্ষ ৩০ হাজারের বেশি সরকারি নিয়োগ, মহিলাদের নিরাপত্তা ও কল্যাণমূলক প্রকল্প এবং ক্রমবর্ধমান নতুন উদ্যোগের পরিকাঠামো।

সমাজবাদী পার্টি তার পাল্টা আখ্যান তৈরি করছে পিডিএ গোষ্ঠী, মহিলা ও তরুণদের কল্যাণ এবং আর্থিক ক্ষমতায়নকে কেন্দ্র করে। বছরে ৪০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি সেই কৌশলের সবচেয়ে বড় অংশ।

অন্য দিকে, বসপা দাবি করছে, শুধু নির্বাচনের আগে নানা সুবিধা ঘোষণা করলেই মানুষের মৌলিক সমস্যার সমাধান হবে না। কর্মসংস্থান, সংরক্ষণের অধিকার, মহিলাদের নিরাপত্তা এবং মর্যাদার বিকল্প হিসেবে সাময়িক অনুদান বা বিনামূল্যের সুবিধাকে দেখানো যায় না।

ফলে ২০২৭ সালের নির্বাচনের আগে প্রতিযোগিতার মূল প্রশ্নটি ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে—উত্তরপ্রদেশের দুই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভোটগোষ্ঠী, তরুণ প্রজন্ম ও মহিলাদের আস্থা শেষ পর্যন্ত কোন দল অর্জন করতে পারবে? বিজেপি প্রশাসনিক কাজের খতিয়ান তুলে ধরছে, সমাজবাদী পার্টি আরও বড় আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, আর বসপা সংরক্ষণ, চাকরি, নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নকে সামনে আনছে। উত্তরপ্রদেশের আগামী নির্বাচনী লড়াইয়ের অন্যতম প্রধান রণক্ষেত্র যে এই দুই ভোটগোষ্ঠীকে ঘিরেই তৈরি হবে, তার ইঙ্গিত ইতিমধ্যেই স্পষ্ট।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles