মাওবাদী নেতার খালাস থেকে তদন্ত-রিপোর্ট ‘উধাও’: ২০০৮ সালের বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতার হত্যাকাণ্ড ঘিরে কেন উত্তপ্ত ওড়িশা

যা জানা জরুরি
- বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা লক্ষ্মণানন্দ সরস্বতী হত্যার মামলায় মাওবাদী নেতা আজাদকে আদালত বেকসুর খালাস করার কয়েক দিনের মধ্যেই নিহত ধর্মগুরুর জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে ন্যায়বিচারের…
- অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ’ তোলার পাল্টা অভিযোগ করেছে বিজু জনতা দল।
- ওড়িশার অঙ্গুল জেলায় লক্ষ্মণানন্দের জন্মগ্রামে আয়োজিত জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মাঝির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
বিস্তারিত প্রতিবেদন
বাংলাস্ফিয়ার: বিশ্ব হিন্দু পরিষদের নেতা লক্ষ্মণানন্দ সরস্বতী হত্যার মামলায় মাওবাদী নেতা আজাদকে আদালত বেকসুর খালাস করার কয়েক দিনের মধ্যেই নিহত ধর্মগুরুর জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে ন্যায়বিচারের আশ্বাস দিলেন ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি। অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ’ তোলার পাল্টা অভিযোগ করেছে বিজু জনতা দল।
ওড়িশার অঙ্গুল জেলায় লক্ষ্মণানন্দের জন্মগ্রামে আয়োজিত জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মাঝির সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান।
মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাসের তিন দিন আগেই ওড়িশার একটি বিশেষ আদালত মাওবাদী নেতা ডি কেশব রাও ওরফে আজাদকে খালাস করে দেয়। ২০০৮ সালের অগস্টে লক্ষ্মণানন্দ এবং তাঁর চার শিষ্যকে হত্যার ষড়যন্ত্রকারী ও প্রধান অভিযুক্ত হিসেবে আজাদকে চিহ্নিত করেছিল পুলিশ। কিন্তু তাঁর বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত প্রমাণ না থাকায় আদালত তাঁকে মুক্তি দিয়েছে। অন্য মামলাগুলিতেও আগেই খালাস পেয়েছিলেন আজাদ। ফলে ১৫ বছর পরে ভুবনেশ্বরের ঝারপাড়া কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছেন তিনি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, পুলিশের দুর্বল তদন্ত এবং যথাযথ প্রমাণ সংগ্রহে ব্যর্থতার কারণেই আজাদ খালাস পেয়েছেন। তবে বিশ্ব হিন্দু পরিষদ-সহ বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠন এখনও লক্ষ্মণানন্দ হত্যার তদন্ত কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরোর হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে।
পুলিশ দাবি করেছিল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতা ও তাঁর শিষ্যদের হত্যার পরে অভিযুক্তেরা ঘটনাস্থলে একটি চিঠি ফেলে গিয়েছিল। আজাদের স্বাক্ষরিত বলে দাবি করা সেই চিঠিতে লেখা ছিল, মাওবাদীদের বংশধারা শাখা এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু আদালত জানিয়েছে, এমন কোনও চিঠি বিচারপর্বে তাদের সামনে পেশ করা হয়নি।
২০১৩ সালের অক্টোবরে ওড়িশার ফুলবানির একটি আদালত এই হত্যাকাণ্ডে মাওবাদী নেতা উদয়-সহ আট জনকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছিল। প্রায় ১০ বছর কারাবাসের পরে তাঁদের অধিকাংশই বর্তমানে জামিনে রয়েছেন।
কান্ধামাল হত্যাকাণ্ড ও সাম্প্রদায়িক হিংসা
২০০৮ সালের ২৩ অগস্ট কান্ধামাল জেলার জলেসপেটায় লক্ষ্মণানন্দের আশ্রমে জন্মাষ্টমীর অনুষ্ঠান চলছিল। সেই সময় ২০ থেকে ২৫ জন মুখোশধারী আততায়ী আশ্রমে ঢুকে ৮৪ বছরের লক্ষ্মণানন্দ এবং তাঁর চার সহযোগীকে গুলি করে হত্যা করে।
আদিবাসী অধ্যুষিত কান্ধামালে ষাটের দশকের শেষ দিকে এসেছিলেন লক্ষ্মণানন্দ। প্রত্যন্ত জলেসপেটায় তিনি আশ্রম ও কন্যাশ্রম অর্থাৎ আদিবাসী মেয়েদের আবাসিক বিদ্যালয় তৈরি করেছিলেন। তাঁর ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল আদিবাসী মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা। একই সঙ্গে তিনি গোহত্যা এবং আদিবাসীদের খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরণের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন প্রচার চালিয়েছিলেন। হত্যার আগে একাধিকবার হুমকি পাওয়ার পাশাপাশি তাঁর উপর হামলাও হয়েছিল।
লক্ষ্মণানন্দের হত্যার পরেই কান্ধামালে ব্যাপক সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়িয়ে পড়ে। তাতে অন্তত ৩৯ জন নিহত এবং ২৫ হাজারের বেশি মানুষ গৃহচ্যুত হন। বহু গির্জা, প্রার্থনাগৃহ ও বাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় অথবা ভাঙচুর চালানো হয়।
এই হিংসার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক প্রভাবও পড়েছিল। ২০০০ সাল থেকে ওড়িশায় জোটবদ্ধভাবে ক্ষমতায় ছিল মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়কের বিজু জনতা দল এবং বিজেপি। কান্ধামালের ঘটনার পরে দুই দলের সম্পর্ক ক্রমশ তিক্ত হয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত ২০০৯ সালের বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে বিজেপির সঙ্গে জোট ভেঙে দেন পট্টনায়ক।
২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে লক্ষ্মণানন্দের হত্যা এবং তার পরবর্তী সাম্প্রদায়িক হিংসার তদন্তে ওড়িশা হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এস সি মহাপাত্রের নেতৃত্বে বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করেছিল পট্টনায়ক সরকার। মহাপাত্রের মৃত্যুর পরে অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এ এস নাইডুকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। নাইডু কমিশন ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে রিপোর্ট জমা দিলেও ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকা পট্টনায়ক সরকার সেটি প্রকাশ করেনি।
তদন্ত-রিপোর্ট ‘উধাও’
বিরোধী দলে থাকাকালীন বিজেপি লক্ষ্মণানন্দ হত্যার তদন্ত সিবিআইয়ের হাতে দেওয়ার দাবি জানাত। ২০২৪ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজু জনতা দলকে হারিয়ে ওড়িশায় ক্ষমতায় আসে বিজেপি।
ক্ষমতা গ্রহণের দু’বছর পরে, ২০২৬ সালের ১০ জুন বিজেপি সরকার একটি এফআইআর দায়ের করে। তাতে অভিযোগ করা হয়, লক্ষ্মণানন্দ হত্যা ও কান্ধামাল হিংসা নিয়ে বিচারবিভাগীয় কমিশনের রিপোর্ট এবং ২০১৬ সালে এসইউএম মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডের তদন্ত-রিপোর্ট—এই দু’টি নথি মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে পাওয়া যাচ্ছে না। বিস্তর খোঁজাখুঁজির পরেও রিপোর্ট দু’টির সন্ধান মেলেনি।
মাঝি সরকারের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৪ জুন বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে বিজেপির জয় স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পরে স্বরাষ্ট্র দফতর থেকে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে পাঠানো বেশ কিছু রিপোর্ট ও নথি ফেরত দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই দু’টি রিপোর্ট ফেরত আসেনি।
এফআইআরে বলা হয়েছে, রিপোর্ট দু’টির ‘অন্তর্ধান’ থেকে যুক্তিসঙ্গত সন্দেহ তৈরি হয়েছে যে সেগুলি ইচ্ছাকৃতভাবে সরিয়ে ফেলা, আটকে রাখা, গোপন করা বা নষ্ট করা হয়ে থাকতে পারে। এমনকি নথিগুলির সঙ্গে অন্য কোনও বেআইনি আচরণ করা হয়েছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।
পূর্ববর্তী বিজেডি সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে রিপোর্ট দু’টি উধাও করেছে বলে অভিযোগ তোলে বিজেপি। পুলিশ অন্তত চার জন অবসরপ্রাপ্ত আমলাকে তলব করে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন নবীন পট্টনায়কের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং বিজেডি আমলে মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে কর্মরত ভি কে পাণ্ডিয়ান।
হিন্দুত্বের রাজনীতিতে নতুন চাপ
শুক্রবার লক্ষ্মণানন্দের জন্মশতবর্ষের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী মাঝি অভিযোগ করেন, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ নেতার হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত নথি উধাও করে অপরাধীদের আড়াল করার জন্য পট্টনায়ক সরকারের আমলে ‘পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র’ হয়েছিল। এই ঘটনায় তিনি পূর্ববর্তী সরকারের ‘ব্যর্থতা, অবহেলা এবং তোষণের রাজনীতি’র প্রসঙ্গও তোলেন।
মাঝি বলেন, “ওড়িশার সাড়ে চার কোটি মানুষকে আমি দৃঢ়ভাবে আশ্বাস দিতে চাই, এই ঘটনার পিছনের সত্য অবশ্যই প্রকাশ্যে আনা হবে।”
অনুষ্ঠানে ধর্মেন্দ্র প্রধান ছাড়াও বিজেপি ও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের বহু নেতা, সাংসদ এবং বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন।
হিন্দুত্বের রাজনীতিকে আরও সামনে আনার অংশ হিসেবে ফুলবানির একটি চিকিৎসা মহাবিদ্যালয়ের নাম লক্ষ্মণানন্দ সরস্বতীর নামে রেখেছে বিজেপি সরকার। কান্ধামালে তাঁর আশ্রম, কন্যাশ্রম এবং সংলগ্ন এলাকার উন্নয়নের জন্য মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ সহায়তা তহবিল থেকে ১৩ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। লক্ষ্মণানন্দের জন্মগ্রামকে ‘ঐতিহ্য গ্রাম’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাবও ঘোষণা করেছে সরকার।
বিজেডির পাল্টা আক্রমণ
লক্ষ্মণানন্দ হত্যা নিয়ে মাঝি ‘ভিত্তিহীন অভিযোগ’ করছেন বলে পাল্টা আক্রমণ করেছে বিজেডি। দলের মুখপাত্র লেলিন মোহান্তি বলেন, “কোন দল তোষণের রাজনীতি করে, তা গোটা দেশ জানে। বর্তমান রাজ্য বিজেপি সভাপতি মনমোহন সামল এবং প্রাক্তন রাজ্যপাল বিশ্বভূষণ হরিচন্দন ২০০৮ সালে পট্টনায়ক মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রী কি তাঁদের দিকেও অভিযোগের আঙুল তুলছেন?”
ক্ষমতায় আসার দু’বছর পরে গুরুত্বপূর্ণ কমিশন রিপোর্ট খোঁজার জন্যও মাঝি সরকারকে কটাক্ষ করেছে বিজেডি। মোহান্তির প্রশ্ন, “নিজেদের সংগঠনের কাউকে রক্ষা করার জন্য মুখ্যমন্ত্রীর দফতর থেকেই কি রিপোর্টটি ইচ্ছাকৃতভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে?”
কে এই আজাদ
অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীকাকুলাম জেলার মান্দাসা অঞ্চলের বাসিন্দা আজাদ ১৯৯০ সাল থেকে মাওবাদী কার্যকলাপে যুক্ত ছিলেন। শ্রীকাকুলামের উদ্দানম এলাকায় তিনি সংগঠনের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।
২০০৮ সালে নয়াগড় পুলিশের অস্ত্রাগারে মাওবাদী হামলার মামলাতেও তিনি অভিযুক্ত ছিলেন। সেই হামলায় ১৩ জন পুলিশকর্মী-সহ অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছিলেন। ২০০৬ সালের আর উদয়গিরি কারাগারে হামলার মামলাতেও আজাদের নাম ছিল। তবে সব ক’টি মামলাতেই তিনি খালাস পেয়েছেন।
২০১১ সালের মে মাসে অন্ধ্রপ্রদেশ পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন আজাদ। ওই বছরের জুনে তাঁকে ওড়িশা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। তার পর থেকে লক্ষ্মণানন্দ হত্যা মামলায় খালাস পাওয়ার আগপর্যন্ত টানা ১৫ বছর তিনি ভুবনেশ্বরের ঝারপাড়া কারাগারে বন্দি ছিলেন।
এর আগে আজাদের বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলির দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ওড়িশা ও অন্ধ্রপ্রদেশ সরকারকে বিশেষ আদালত গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল সুপ্রিম কোর্ট।
সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট
প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।
বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।
আরও লেখা →সম্পর্কিত প্রতিবেদন
খবর৪২ বছর পরে ব্রুনেইয়ে সুকুমার কুরুপের ‘সন্ধান’, ছবির ব্যক্তিকে ঘিরে নতুন রহস্য
আগস্ট 30, 2026
খবরউত্তরপ্রদেশে ভোটের নতুন অঙ্ক: তরুণ ও মহিলাদের মন জয়ে কল্যাণের প্রতিশ্রুতি ঘিরে বিজেপি–সপা–বসপা লড়াই
আগস্ট 30, 2026
খবরঅগ্নিমিত্রার ধমকের পর পুনর্বাসন, ফুটপাতবাসী সীতার জন্য ঘর ও কাজের ব্যবস্থা
আগস্ট 30, 2026
খবর৯/১১-র আগেই CIA-র হাতে ছিল সূত্র!
আগস্ট 30, 2026দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে
বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।