খবর

তিন বছরেই ফের ভোট?

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • নয়াদিল্লি: বাংলার বিধানসভা ভোট কি পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়ে যেতে পারে?
  • বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র অন্দরের একটি প্রস্তাব ঘিরে এখন সেই প্রশ্নই জোরালো হচ্ছে।
  • পরিকল্পনা কার্যকর হলে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গেই এনডিএ-শাসিত ২২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা ভোট করানো হতে পারে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

নয়াদিল্লি: বাংলার বিধানসভা ভোট কি পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই হয়ে যেতে পারে? বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র অন্দরের একটি প্রস্তাব ঘিরে এখন সেই প্রশ্নই জোরালো হচ্ছে। পরিকল্পনা কার্যকর হলে ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের সঙ্গেই এনডিএ-শাসিত ২২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা ভোট করানো হতে পারে। সেই তালিকায় সদ্য যুক্ত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গও। ফলে ২০২৬-এর পর মাত্র তিন বছরের মাথাতেই ফের ভোটের মুখে পড়তে পারে বাংলা।

আইন অনুযায়ী গোটা দেশে লোকসভা ও সব বিধানসভার নির্বাচন একসঙ্গে হওয়ার সম্ভাব্য সময় ২০৩৪। কিন্তু তার পাঁচ বছর আগেই ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’-এর রাজনৈতিক মহড়া সেরে নিতে চাইছে শাসক জোট। বিজেপি নেতৃত্বের আলোচনায় থাকা প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৯ সালে প্রথম ধাপে লোকসভার সঙ্গে এনডিএ-শাসিত রাজ্যগুলির ভোট মিলিয়ে দেওয়া হতে পারে। পরে সাংবিধানিক কাঠামো অনুযায়ী ২০৩৪ সালে পৌঁছবে পূর্ণ সমন্বিত নির্বাচনী চক্র।

তবে কেন্দ্র একতরফা ভাবে কোনও রাজ্যের বিধানসভা ভেঙে দিতে পারবে না। সংশ্লিষ্ট রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী এবং শাসক জোটকেই নির্ধারিত মেয়াদের আগে বিধানসভা ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ সংক্রান্ত সংসদীয় যৌথ কমিটির চেয়ারম্যান পি পি চৌধুরীর বক্তব্যও একই—শেষ সিদ্ধান্ত নিতে হবে সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির মুখ্যমন্ত্রীদেরই। কেন্দ্রীয় স্তরে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হলে রাজ্যগুলি স্বেচ্ছায় ২০২৯-এর নির্বাচনী চক্রে নিজেদের যুক্ত করতে পারে।

২০৩৪-এর আগে ২০২৯ কেন?

এই প্রশ্নের উত্তর রয়েছে সংসদে পেশ হওয়া সংবিধান (১২৯তম সংশোধন) বিল, ২০২৪-এ। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায়, লোকসভা নির্বাচনের পরে নতুন লোকসভার প্রথম বৈঠকের দিন রাষ্ট্রপতি একটি ‘নির্ধারিত তারিখ’ ঘোষণা করবেন। সেই তারিখের পরে গঠিত বিধানসভাগুলির মেয়াদ পরবর্তী লোকসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার সঙ্গে শেষ হবে।

অর্থাৎ ২০২৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের পরে শুরু হবে নতুন সাংবিধানিক গণনা। তার পূর্ণ ফল মিলবে ২০৩৪ সালে। এনডিএ-র নতুন ভাবনা সেই দীর্ঘ অপেক্ষার আগেই একটি বড় অংশকে একই নির্বাচনী চক্রে নিয়ে আসা।

সহজ কথায়, ২০২৯ হতে পারে আংশিক ‘একসঙ্গে ভোট’, আর ২০৩৪ পূর্ণ সমন্বিত নির্বাচন।

মেয়াদ কাটছাঁটের ঝুঁকি

এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে বেশ কয়েকটি রাজ্যে বিধানসভার স্বাভাবিক মেয়াদ কমাতে হবে। কোথাও কয়েক মাস, কোথাও এক-দু’বছর আগেই ভোট ডাকতে হতে পারে।

যেসব রাজ্যে ২০২৮ সালে নির্বাচন হওয়ার কথা, তাদের ক্ষেত্রে সমস্যা আরও জটিল। ২০২৮-এর ভোট করিয়ে মাত্র এক বছর পর আবার নির্বাচন হতে পারে। অথবা ভোট ২০২৯ পর্যন্ত পিছিয়ে দেওয়ার কোনও সাংবিধানিক পথ খুঁজতে হবে। সংবিধানের ১৭২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জরুরি অবস্থা ছাড়া বিধানসভার পাঁচ বছরের মেয়াদ সাধারণ ভাবে বাড়ানো যায় না। সেই তুলনায় মুখ্যমন্ত্রীর পরামর্শে বিধানসভা আগেভাগে ভেঙে দেওয়া তুলনামূলক সহজ।

পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে তাই প্রস্তাবটি কার্যকর হলে ২০২৬-এর নির্বাচিত বিধানসভার মেয়াদও পূর্ণ পাঁচ বছর নাও হতে পারে।

কী বলেছিল কোবিন্দ কমিটি?

প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি রামনাথ কোবিন্দের নেতৃত্বাধীন উচ্চপর্যায়ের কমিটি প্রথম ধাপে লোকসভা ও বিধানসভার নির্বাচন একসঙ্গে করার সুপারিশ করেছিল। দ্বিতীয় ধাপে, তার ১০০ দিনের মধ্যে পুরসভা ও পঞ্চায়েত নির্বাচন করানোর প্রস্তাব ছিল। স্থানীয় নির্বাচনকে এই চক্রে আনতে অন্তত অর্ধেক রাজ্যের অনুমোদন প্রয়োজন।

কমিটির আর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ ছিল—সমন্বিত নির্বাচনী চক্র চালু হওয়ার পর কোনও লোকসভা বা বিধানসভা মাঝপথে ভেঙে গেলে নতুন সরকারের মেয়াদ পূর্ণ পাঁচ বছর হবে না। তাকে বাকি মেয়াদটুকুই ক্ষমতায় থাকতে হবে।

সরকারের যুক্তি বনাম বিরোধীদের আপত্তি

ঘনঘন নির্বাচনের খরচ কমানো, প্রশাসন ও নিরাপত্তাবাহিনীকে বারবার ভোটের কাজে ব্যস্ত না রাখা এবং আদর্শ আচরণবিধির কারণে সরকারি সিদ্ধান্তে তৈরি হওয়া বাধা কমানো—এই যুক্তিতেই ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’-এর পক্ষে সওয়াল করে সরকার।

পি পি চৌধুরীর দাবি, পৃথক পৃথক নির্বাচনের কারণে অর্থনীতিতে প্রায় সাত লক্ষ কোটি টাকার ক্ষতি হয়। বারবার ভোটের কাজে স্কুলশিক্ষকদের নিয়োগ করায় পড়াশোনাও ব্যাহত হয় বলে তাঁর বক্তব্য। সংসদীয় কমিটিও ২০২৯-এর মধ্যে প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি শেষ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন রাজ্যে বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে।

বিরোধীদের আপত্তি অবশ্য আরও গভীর। তাঁদের আশঙ্কা, লোকসভা নির্বাচনের প্রবল জাতীয় প্রচারের মধ্যে রাজ্যের নিজস্ব ইস্যু চাপা পড়বে। আঞ্চলিক দলগুলি তুলনায় দুর্বল অবস্থানে চলে যেতে পারে। বিধানসভার মেয়াদ রাজনৈতিক প্রয়োজন অনুযায়ী কমিয়ে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোরও পরিপন্থী বলে তাঁদের অভিযোগ।

তার সঙ্গে রয়েছে আরও বড় প্রশ্ন—মাঝপথে কোনও সরকার পড়ে গেলে কী হবে? অনাস্থা, জোটভঙ্গ কিংবা ঝুলন্ত বিধানসভা তৈরি হলে কী ভাবে সমন্বিত নির্বাচনী চক্র বজায় থাকবে?

‘এক দেশ, এক নির্বাচন’ নয়, আপাতত ‘এক জোট, এক ভোট’?

সবশেষে রয়েছে সংসদের অঙ্ক। সংবিধান সংশোধনী পাশ করাতে উপস্থিত ও ভোটদানকারী সদস্যদের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন প্রয়োজন। ফলে ২২টি এনডিএ-শাসিত রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ২০২৯ সালে একসঙ্গে ভোট করানো রাজনৈতিক ভাবে সম্ভব হলেও, সেটিকে স্থায়ী জাতীয় ব্যবস্থায় পরিণত করতে বিরোধীদের অন্তত একাংশের সমর্থন প্রয়োজন।

তাই আপাতত ২০৩৪-এর ‘এক দেশ, এক নির্বাচন’-এর আগে ২০২৯-কে দেখা হচ্ছে এক ধরনের রাজনৈতিক ড্রেস রিহার্সাল হিসেবে।

আর সেই মহড়ায় বাংলা থাকলে, ২০২৬-এর ভোট শেষ হওয়ার মাত্র তিন বছর পরেই ফের বাজতে পারে ভোটের ঘণ্টা।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles