হাইলাইটস
- রবিবার, ২১ জুন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে পুনঃনির্ধারিত NEET-UG পরীক্ষা।
- প্রশ্নফাঁস কাণ্ডে ৩ মে-র পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর নতুন করে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত।
- কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের বিশেষ বার্তা— “নির্ভয়ে পরীক্ষা দিন, সিস্টেমের ওপর আস্থা রাখুন।”
- নিরাপত্তার জন্য মোতায়েন ১,৩৮,৫৬০টি সিসিটিভি ক্যামেরা, যা এআই (AI) প্রযুক্তির মাধ্যমে মনিটর করা হবে।
- ইলেকট্রনিক যোগাযোগ রুখতে পরীক্ষাকেন্দ্রে থাকছে ৫১,৩১১টি জ্যামার।
- ফেস অথেন্টিকেশন ও বায়োমেট্রিকের কড়া ব্যবস্থা, মোতায়েন হাজার হাজার অতিরিক্ত কর্মী ও পর্যবেক্ষক।
- ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির দাবি, এবার পরীক্ষা হবে “স্বচ্ছ, নিরাপদ ও পরীক্ষার্থী-বান্ধব”।
দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশিকা পরীক্ষা NEET-UG-কে ঘিরে গত দেড় মাস ধরে যে বিতর্ক, উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল, তার অবসান ঘটতে চলেছে রবিবার। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগে ৩ মে অনুষ্ঠিত পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকার এবং ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) প্রবল চাপের মুখে পড়ে। লক্ষ লক্ষ ছাত্রছাত্রী, অভিভাবক এবং শিক্ষকদের ক্ষোভের মুখে অবশেষে পুনরায় পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই পুনঃপরীক্ষাকে ঘিরে এবার কোনও ঝুঁকি নিতে রাজি নয় প্রশাসন। তাই দেশের পরীক্ষার ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে বলে দাবি এনটিএ-র।
শিক্ষামন্ত্রীর আশ্বাস ও কড়া বার্তা
পরীক্ষার আগে দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভ এবং বিতর্কের মধ্যে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পরীক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করে বিশেষ বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, “প্রায় ২২ লক্ষ শিক্ষার্থী NEET পরীক্ষায় অংশ নিতে চলেছেন। আপনারা নির্ভয়ে ও দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে পরীক্ষায় বসুন; নিশ্চয়ই ভালো ফলাফল করবেন।” পাশাপাশি, এনটিএ ও দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর তাঁর পূর্ণ আস্থার কথা জানিয়ে কড়া বার্তা দিয়েছেন, “দয়া করে ভারতের নতুন প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে বিপন্ন করবেন না। কেউ যেন একে নিয়ে উপহাস না করে। আমরা যেন এমন কিছু না করি যা পড়ুয়াদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে।”
সিসিটিভির নজরে প্রতিটি মুহূর্ত এবং এআই (AI) ট্র্যাকিং
এবারের পরীক্ষায় প্রায় প্রতিটি কেন্দ্রের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ নজরদারির আওতায় আনা হয়েছে। গোটা দেশের ৯৫ হাজারেরও বেশি পরীক্ষা কক্ষে বসানো হয়েছে ১,৩৮,৫৬০টি সিসিটিভি ক্যামেরা। শুধু ক্যামেরা বসিয়েই দায়িত্ব শেষ নয়, এই ফিডগুলো আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) টুলের সাহায্যে জাতীয় ও রাজ্য স্তরে রিয়েল-টাইম মনিটর করা হচ্ছে, যাতে কোনও অস্বাভাবিক কার্যকলাপ বা অনিয়ম ঘটলে সঙ্গে সঙ্গে তা ধরা পড়ে।
৫১ হাজারের বেশি জ্যামার: প্রযুক্তিনির্ভর নকল রুখতে
গত কয়েক বছরে পরীক্ষায় নকলের কৌশলও প্রযুক্তিনির্ভর হয়েছে। ব্লুটুথ ডিভাইস, স্মার্টওয়াচ, ক্ষুদ্র ইয়ারপিস, এনক্রিপ্টেড মেসেজিং অ্যাপ— নানা উপায়ে প্রশ্ন আদানপ্রদানের ঘটনা সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে পরীক্ষাকেন্দ্রগুলিতে ৫১,৩১১টি জ্যামার বসানো হয়েছে। জ্যামারগুলি নির্দিষ্ট ব্যাসার্ধের মধ্যে মোবাইল নেটওয়ার্ক, ওয়াই-ফাই এবং অন্যান্য বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কার্যত অচল করে দেবে।
ফেস অথেন্টিকেশন, বায়োমেট্রিক ও বিশাল কর্মী বাহিনী
এনটিএ জানিয়েছে, শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে মানবসম্পদও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। ‘স্টুডেন্ট-ফার্স্ট’ পদ্ধতি মেনে এবার ফেস অথেন্টিকেশন (Face Authentication) ও পরীক্ষার্থীদের পরিচয় যাচাই করার জন্য ৪৮,৪৪৮ জন বায়োমেট্রিক কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। এছাড়াও থাকছেন প্রায় ৩৮ হাজার চেকিং (Frisking) স্টাফ এবং ৬,৭০০ জন পর্যবেক্ষক।
তবে এনটিএ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, সার্ভার বা হার্ডওয়্যারের ত্রুটির কারণে বায়োমেট্রিক কাজ না করলেও আন্ডারটেকিং দিয়ে পরীক্ষা দেওয়া যাবে। পরীক্ষা চলাকালীন (দুপুর ২টো থেকে বিকেল ৫টা ১৫) বায়োমেট্রিকের জন্য কোনও পরীক্ষার্থীকে বিরক্ত করা হবে না। বিভিন্ন রাজ্যে আকস্মিক পরিদর্শনের জন্য বিশেষ উড়ন্ত নজরদারি দলও গঠন করা হয়েছে।
প্রশ্নপত্র পরিবহণেও বিশেষ সতর্কতা
প্রশ্নপত্র ছাপানো থেকে পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়ায় বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে। পুলিশ ও আধা-সামরিক বাহিনীর কড়া পাহারায় জিপিএস-ট্র্যাকিং (GPS) যুক্ত গাড়ির মাধ্যমে প্রশ্নপত্র পরিবহণ করা হচ্ছে। প্রশ্নপত্র খোলার সময়ও ভিডিও রেকর্ডিংয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে সূত্রের খবর।
পরীক্ষার্থীদের জন্য নির্দেশিকা
এনটিএ পরীক্ষার্থীদের সময়ের অনেক আগেই কেন্দ্রে পৌঁছানোর পরামর্শ দিয়েছে। পরিচয়পত্র, অ্যাডমিট কার্ড এবং নির্ধারিত পোশাকবিধি মেনে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মোবাইল ফোন, স্মার্টওয়াচ, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট বা অন্য কোনও নিষিদ্ধ সামগ্রী নিয়ে কেন্দ্রে প্রবেশের অনুমতি থাকবে না। নিয়ম ভাঙলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চাপের মুখে এনটিএ
এই পরীক্ষা শুধু ছাত্রছাত্রীদের জন্য নয়, এনটিএ-র জন্যও এক ধরনের অগ্নিপরীক্ষা। গত কয়েক মাসে সংস্থাটির কার্যকারিতা নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন উঠেছে। তাই রবিবারের পরীক্ষা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করা গেলে তা সংস্থার ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। অন্যদিকে, সামান্য কোনও অনিয়মও নতুন করে বিতর্ক উসকে দিতে পারে। ফলে প্রশাসন, নিরাপত্তা সংস্থা এবং এনটিএ— সকলের নজর এখন রবিবারের দিকে।
লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী এই পরীক্ষাকে ঘিরে তাই এবার বার্তা একটাই— প্রশ্নফাঁসের কলঙ্ক মুছে বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।