খবর

হরমুজে জট, তেলে ধাক্কা

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • হরমুজ প্রণালী ঘিরে দীর্ঘায়িত সামরিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা বিশ্ব তেলের বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর আশাকে ফের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
  • জুলাইয়ের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহণ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার যে ক্ষীণ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, নতুন করে সংঘর্ষ এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে তা…
  • আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বা আইইএর আশঙ্কা, সরবরাহ সংকট যেমন জ্বালানির দাম চড়া রাখবে, তেমনই বিশ্বজুড়ে তেলের ব্যবহারও প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত কমিয়ে দেবে।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

হরমুজ প্রণালী ঘিরে দীর্ঘায়িত সামরিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা বিশ্ব তেলের বাজারের ঘুরে দাঁড়ানোর আশাকে ফের অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। জুলাইয়ের শুরুতে মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল পরিবহণ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হওয়ার যে ক্ষীণ সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল, নতুন করে সংঘর্ষ এবং বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে তা কার্যত ভেস্তে গেছে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা বা আইইএর আশঙ্কা, সরবরাহ সংকট যেমন জ্বালানির দাম চড়া রাখবে, তেমনই বিশ্বজুড়ে তেলের ব্যবহারও প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত কমিয়ে দেবে।

আইইএর আগস্টের তেলবাজার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্বে দৈনিক তেলের চাহিদা গড়ে ১৬ লক্ষ ব্যারেল কমতে পারে। মাত্র এক মাস আগেও সংস্থাটির পূর্বাভাস ছিল, এই পতন হবে ১০ লক্ষ ব্যারেলের কিছু বেশি। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে সম্ভাব্য চাহিদা সংকোচনের হিসাব আরও প্রায় ৫ লক্ষ ১০ হাজার ব্যারেল বাড়ানো হয়েছে।

চলতি বছরের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকেই বিশ্বব্যাপী দৈনিক তেলের ব্যবহার আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৯ লক্ষ ব্যারেল কমেছে। তৃতীয় ত্রৈমাসিকে পতনের গতি কিছুটা কমলেও দৈনিক চাহিদা প্রায় ২৮ লক্ষ ব্যারেল কমতে পারে বলে মনে করছে আইইএ। বছরের শেষ তিন মাসে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়ে চাহিদা দৈনিক প্রায় ৫ লক্ষ ৮০ হাজার ব্যারেল বাড়তে পারে। তবে সেই আশাও অনেকটাই নির্ভর করছে হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব প্রণালী দিয়ে নিরাপদে এবং বাধাহীনভাবে জাহাজ চলাচল ফেরার উপর।

সরবরাহের ছবিও স্বস্তিদায়ক নয়। আইইএর হিসাব অনুযায়ী, জুলাইয়ে বিশ্ব তেল উৎপাদন দৈনিক ২৪ লক্ষ ব্যারেল বেড়ে ১০ কোটি ১৫ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছেছিল। কিন্তু গত বছরের জুলাইয়ের তুলনায় উৎপাদন এখনও দৈনিক ৬৩ লক্ষ ব্যারেল কম। উপসাগরীয় দেশগুলির প্রায় ৮৩ লক্ষ ব্যারেল দৈনিক উৎপাদন এখনও আন্তর্জাতিক বাজারের বাইরে পড়ে রয়েছে।

জুলাই এবং আগস্টের গোড়ায় নতুন করে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ায় তৃতীয় ত্রৈমাসিকে সম্ভাব্য সরবরাহের পূর্বাভাসও কমিয়েছে আইইএ। আগের হিসাবের তুলনায় দৈনিক আরও ১৭ লক্ষ ব্যারেল সরবরাহ কম হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

পুরো ২০২৬ সালের হিসাবে বিশ্বে তেল সরবরাহ দৈনিক গড়ে ৪৩ লক্ষ ব্যারেল কমে প্রায় ১০ কোটি ২০ লক্ষ ব্যারেলে নেমে আসতে পারে। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার উৎপাদন দৈনিক প্রায় ১৪ লক্ষ ব্যারেল বাড়লেও মধ্যপ্রাচ্য এবং রাশিয়ার বিপুল ঘাটতি পূরণ করার মতো তা যথেষ্ট নয়। ফলে সরবরাহের তুলনায় চাহিদা দৈনিক প্রায় ১২ লক্ষ ৭০ হাজার ব্যারেল বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বিশ্বজুড়ে জমিয়ে রাখা তেলের ভাণ্ডারে—মজুত দ্রুত কমতে থাকার সম্ভাবনাই এখন বেশি।

সংকটের কেন্দ্রবিন্দু হরমুজ প্রণালী। স্বাভাবিক সময়ে এই সরু জলপথ দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবহণ হয়। অর্থাৎ বিশ্বের মোট তেল ব্যবহারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশই এই পথের উপর নির্ভরশীল।

তাই হরমুজে জাহাজ চলাচল বন্ধ বা সীমিত হয়ে গেলে তার ধাক্কা সরাসরি গিয়ে পড়ে সৌদি আরব, ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, কুয়েত ও কাতারের উপর। এই দেশগুলির বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছনোর অন্যতম প্রধান পথ এটি। বিকল্প পাইপলাইন থাকলেও সেগুলির ধারণক্ষমতা হরমুজের সম্ভাব্য ঘাটতি সামাল দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়।

তবে সমস্যা শুধু অপরিশোধিত তেল নিয়ে নয়। মধ্যপ্রাচ্য থেকে পরিশোধিত জ্বালানি রফতানি ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার একাধিক তেল শোধনাগারের উৎপাদনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জুলাইয়ে বিশ্বজুড়ে শোধনাগারগুলিতে দৈনিক প্রায় ৮ কোটি ৯ লক্ষ ব্যারেল তেল প্রক্রিয়াকরণ হয়েছে—এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ৫০ লক্ষ ব্যারেল কম। পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে তৃতীয় ত্রৈমাসিকে বিশ্বব্যাপী শোধনমাত্রার পূর্বাভাসও দৈনিক আরও ৩ লক্ষ ৭০ হাজার ব্যারেল কমিয়েছে আইইএ।

এর সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে ডিজেল, জেট জ্বালানি এবং অন্যান্য মাঝারি পাতনের জ্বালানির বাজারে। আটলান্টিক অঞ্চলে তেল শোধনের লাভের হার ইতিমধ্যেই রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ তেল শোধনাগারগুলির লাভ বাড়লেও তার খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসাকে।

পরিবহণ খরচ বাড়ছে, বিমান সংস্থার জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে, কৃষি ও শিল্পে উৎপাদন খরচ চড়ছে। শেষ পর্যন্ত সেই বাড়তি খরচ গিয়ে পড়ছে পণ্য ও পরিষেবার দামে। মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমছে না, মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও কমছে। আর এখানেই তৈরি হচ্ছে এক অদ্ভুত চক্র—তেলের দাম বাড়ছে, অথচ সেই কারণেই তেলের চাহিদা আরও কমছে।

আইইএ অবশ্য ২০২৭ সাল নিয়ে কিছুটা আশার ছবি দেখছে। সংঘর্ষ কমে বাণিজ্যপথ খুলে গেলে বিশ্ব তেল সরবরাহ দৈনিক ৮৩ লক্ষ ব্যারেল বেড়ে ১১ কোটি ৩ লক্ষ ব্যারেলে পৌঁছতে পারে। একই সময়ে তেলের চাহিদা বাড়তে পারে দৈনিক প্রায় ২৪ লক্ষ ব্যারেল।

অর্থাৎ যুদ্ধ ও অবরোধের পরিস্থিতি বদলালে আগামী বছর বাজারে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত তৈরি হতে পারে। সেই সুযোগে দ্রুত কমে যাওয়া তেলের ভাণ্ডারও ফের ভরতে শুরু করতে পারে।

কিন্তু আপাতত সেই স্বস্তি অনেক দূরের বিষয়। হরমুজে রাজনৈতিক সমঝোতা হবে কি না, বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল ফিরবে কি না এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদন ফের স্বাভাবিক হবে কি না—এই তিন প্রশ্নের উত্তরেই নির্ভর করছে বিশ্ব তেলের বাজারের পরবর্তী অধ্যায়।

হরমুজে জট যত দীর্ঘ হবে, তেলের বাজারে ধাক্কাও তত গভীর হওয়ার আশঙ্কা। আর সবচেয়ে বড় বিদ্রূপ—তেলের সংকট যত বাড়ছে, চড়া দামের চাপে বিশ্ব তেলের চাহিদাই তত দ্রুত শুকিয়ে যাচ্ছে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

বিষয়:
লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles