আন্তর্জাতিক

গ্রিনল্যান্ডে ট্রাম্প-ঘনিষ্ঠ মার্কিন তেল সংস্থার খনন স্থগিত

এক নজরে

যা জানা জরুরি

  • বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকা একটি মার্কিন তেল সংস্থাকে খননকাজ পিছিয়ে দিতে বাধ্য করল গ্রিনল্যান্ড সরকার।
  • প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়ার আগেই সংস্থাটি তেল অনুসন্ধানের সরঞ্জাম উপকূলে নামিয়ে ফেলেছিল।
  • সেই ঘটনায় আগেই কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছিল গ্রিনল্যান্ডের প্রশাসন।

বিস্তারিত প্রতিবেদন

বাংলাস্ফিয়ার: ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকা একটি মার্কিন তেল সংস্থাকে খননকাজ পিছিয়ে দিতে বাধ্য করল গ্রিনল্যান্ড সরকার। প্রয়োজনীয় অনুমতি পাওয়ার আগেই সংস্থাটি তেল অনুসন্ধানের সরঞ্জাম উপকূলে নামিয়ে ফেলেছিল। সেই ঘটনায় আগেই কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছিল গ্রিনল্যান্ডের প্রশাসন। এবার স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, পরিবেশ ও স্থানীয় সমাজের উপর প্রকল্পটির সম্ভাব্য প্রভাব যথাযথ ভাবে যাচাই না করে কোনও কূপ খননের অনুমতি দেওয়া হবে না।

‘গ্রিনল্যান্ড এনার্জি’ নামে মার্কিন সংস্থাটি চলতি বছরের অক্টোবরেই পূর্ব গ্রিনল্যান্ডের প্রত্যন্ত জেমসন ল্যান্ড অঞ্চলে প্রথম অনুসন্ধানমূলক কূপ খননের পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ের মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে গ্রিনল্যান্ড সরকার জানিয়েছে, এত অল্প সময়ে প্রয়োজনীয় নিয়ন্ত্রণমূলক প্রক্রিয়া শেষ করা সম্ভব নয়। ফলে খননের জন্য আবশ্যিক অনুমতিও পাওয়া যাবে না।

সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সংস্থাটির সঙ্গে আলোচনার সময় প্রশাসনিক কর্তারা প্রকল্পের সময়সূচি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, তেল অনুসন্ধানের পরিবেশগত ও সামাজিক অভিঘাত বিচার করার জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখা হয়নি। এখন সব প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে এগোলেও ২০২৭ সালের শীতের আগে খননকাজ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

প্রস্তাবিত খননস্থলটি একটি সুরক্ষিত জলাভূমির মধ্যে। সেখানে বিভিন্ন বিরল প্রজাতির পাখির বাস। পাশাপাশি রয়েছে মাস্ক-অক্স বা কস্তুরী বলদের বিচরণক্ষেত্র। স্থানীয় শিকারিদের জীবিকা অনেকাংশে এই প্রাণীর উপর নির্ভরশীল। ফলে তেল অনুসন্ধানের অনুমতি দেওয়ার আগে জীববৈচিত্র্য, জলাভূমির চরিত্র এবং স্থানীয় মানুষের জীবনযাত্রার উপর সম্ভাব্য ক্ষতির মূল্যায়ন করতে হবে গ্রিনল্যান্ড সরকারকে।

এই সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত জেফ ল্যান্ড্রির দাবির বিপরীত। ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ এবং লুইজিয়ানার কট্টরপন্থী গভর্নর ল্যান্ড্রি গত মে মাসে গ্রিনল্যান্ড সফরের পরে বলেছিলেন, সেখানে তেল পাওয়া গেলে মাত্র দশ মাসের মধ্যেই উৎপাদন শুরু করা সম্ভব। ইরানে মার্কিন হামলার ফলে তৈরি জ্বালানিসঙ্কট মোকাবিলায় গ্রিনল্যান্ডের কথিত তেলভান্ডার কাজে আসতে পারে বলেও দাবি করেছিলেন তিনি।

ল্যান্ড্রির ঘোষিত লক্ষ্য, গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার অংশে পরিণত করা। অন্যদিকে ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়া, কোনও চুক্তির মাধ্যমে তার নিয়ন্ত্রণ অর্জন করা, এমনকি সামরিক শক্তি প্রয়োগের সম্ভাবনার কথাও বলেছেন। এই কারণে মার্কিন সংস্থার তেল অনুসন্ধানকে ঘিরে স্থানীয় মানুষের একাংশের মধ্যে রাজনৈতিক সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

গ্রিনল্যান্ড এনার্জির প্রধান নির্বাহী রবার্ট প্রাইসের দাবি, জেমসন ল্যান্ডের নীচে প্রায় এক লক্ষ কোটি ডলার মূল্যের তেল থাকতে পারে। খনন পিছিয়ে যাওয়ার পরে তিনি বলেছেন, গ্রিনল্যান্ডের নিয়ন্ত্রণমূলক বিধি মেনে দায়িত্বশীল ভাবে তেল অনুসন্ধান এগিয়ে নিতে তাঁর সংস্থা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বিলম্বের সময়টিকে পরিকল্পনা সংশোধন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী, সহযোগী সংস্থা ও প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক নিবিড় করার কাজে ব্যবহার করা হবে।

কিন্তু অনুমতি পাওয়ার আগেই সংস্থার তৎপরতা প্রশ্ন তুলেছে। জুলাই মাসে খননের কিছু সরঞ্জাম গ্রিনল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে নামানো হয়েছিল। অথচ স্থানীয় প্রশাসনের অনুমোদন তখনও মেলেনি। প্রাইস একটি জনসভায় দাবি করেছিলেন, সরঞ্জাম নামানোর অনুমতি পাওয়া গিয়েছে। গ্রিনল্যান্ড সরকার সেই বক্তব্যকে অসত্য বলে জানায় এবং সংস্থাটিকে ‘কড়া সতর্কবার্তা’ দেয়।

প্রাইসের আগের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ৩০০টি আধার ভর্তি খননসরঞ্জাম নিয়ে একটি জাহাজ সেপ্টেম্বরে কানাডা থেকে গ্রিনল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। অক্টোবরেই প্রথম কূপ খোঁড়ার প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছিল। গ্রিনল্যান্ড এনার্জির ব্রিটিশ সহযোগী সংস্থা ‘৮০ মাইল’ বিনিয়োগকারীদের জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণমূলক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করতেই প্রকল্প পিছিয়েছে।

৮০ মাইলের হাতে এমন কয়েকটি অনুসন্ধান-অনুমতিপত্র রয়েছে, যেগুলি ২০২১ সালের আগে দেওয়া হয়েছিল। জলবায়ু সঙ্কটের কথা উল্লেখ করে ওই বছর থেকেই গ্রিনল্যান্ড সরকার নতুন তেল অনুসন্ধান-অনুমতি দেওয়া বন্ধ করে দেয়। গত বছর তৈরি গ্রিনল্যান্ড এনার্জি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ছয় কোটি ডলার সংগ্রহ করে প্রকল্পটির সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশীদার হওয়ার পরিকল্পনা করেছে।

সংস্থাটি দাবি করেছে, তাদের তেল প্রকল্পের সঙ্গে গ্রিনল্যান্ডকে আমেরিকার অন্তর্ভুক্ত করার প্রচেষ্টার কোনও সম্পর্ক নেই। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে তার একাধিক যোগাযোগ সামনে এসেছে। ‘ডক্টর ফিল’ নামে পরিচিত মার্কিন সঞ্চালক ফিল ম্যাকগ্র তেল অনুসন্ধান অভিযান নিয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের চুক্তি করেছেন। তিনি ট্রাম্পের ধর্মীয় স্বাধীনতা কমিশনের সদস্য ছিলেন এবং সম্প্রতি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ওভাল দপ্তরেও উপস্থিত হন।

এ ছাড়া ট্রাম্পের ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা প্রকল্পে যুক্ত এক প্রাক্তন মার্কিন নৌসেনা আধিকারিক গ্রিনল্যান্ড এনার্জির পরিচালন পর্ষদে রয়েছেন। ট্রাম্পের দ্বিতীয় অভিষেক অনুষ্ঠানে দশ লক্ষ ডলার দান করা ধনকুবের কেনেথ গ্রিফিন গত এপ্রিলে সংস্থাটির ৯ শতাংশ শেয়ার কিনেছেন।

বিনিয়োগকারীরা আশা করেছিলেন, ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থন সংস্থাটির শেয়ারের দাম দ্রুত বাড়াবে। কিন্তু খনন পিছিয়ে যাওয়ার খবর প্রকাশের পরেই নিউ ইয়র্কে নথিভুক্ত সংস্থাটির শেয়ারের দাম এক দিনে এক-তৃতীয়াংশের বেশি পড়ে যায়। আপাতত রাজনৈতিক প্রভাব নয়, গ্রিনল্যান্ডের আইন, পরিবেশরক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের স্বার্থই তেল প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

সূত্র ও সম্পাদকীয় নোট

প্রতিবেদনের তথ্য প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট উৎস ও প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়েছে। নতুন তথ্য পাওয়া গেলে প্রতিবেদনটি আপডেট করা হতে পারে।

লেখক / সম্পাদকীয় ডেস্ক

বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক

বিশ্বস্ত উৎস যাচাই করে পাঠকের জন্য সংবাদ ও ব্যাখ্যা প্রস্তুত করে বাংলাSphere সম্পাদকীয় দল।

আরও লেখা →
সকালের খবর, একসঙ্গে

দিন শুরু হোক বাংলাSphere-এর সঙ্গে

বাছাই করা গুরুত্বপূর্ণ খবর সরাসরি আপনার ইনবক্সে পেতে আমাদের নিউজলেটারে যুক্ত হন।

ইমেলে সাবস্ক্রাইব করুন →
বাংলাস্ফিয়ার

বাংলাস্ফিয়ার একটি স্বাধীন বাংলা সংবাদ ও মতামতভিত্তিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। দেশ, বিশ্ব, রাজনীতি, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি ও সমাজের গুরুত্বপূর্ণ খবর ও বিশ্লেষণ পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

Edtior's Picks

Latest Articles