বাংলাস্ফিয়ার: বাঁকিপুর বিধানসভা উপনির্বাচনে বিজেপির পরাজয়ের পিছনে যন্তর মন্তর কিংবা ঝাড়খণ্ডের তরুণ আন্দোলনের সরাসরি প্রভাব নেই। বিহারের এই আসনে বিজেপি হেরেছে মূলত স্থানীয় রাজনৈতিক সমীকরণ এবং মুখ্যমন্ত্রী সম্রাট চৌধুরীর গ্রহণযোগ্যতার অভাবে—এমনই দাবি জন সুরাজ পার্টির প্রতিষ্ঠাতা তথা নবনির্বাচিত বিধায়ক প্রশান্ত কিশোরের। তাঁর মতে, তিন দশকের বেশি সময় ধরে বিজেপির দখলে থাকা বাঁকিপুরের ফলকে যতটা অভূতপূর্ব বলে দেখানো হচ্ছে, বাস্তবে তা ততটা নয়। কারণ এ বার ভোটারদের সামনে বিশ্বাসযোগ্য একটি বিকল্প তৈরি হয়েছিল।

উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রথম বার বিধানসভায় প্রবেশ করতে চলেছেন প্রশান্ত। একই সঙ্গে এটি জন সুরাজ পার্টিরও প্রথম বিধানসভা আসন। তবে এই জয়ের ব্যাখ্যায় তিনি দেশজুড়ে তরুণদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভ এবং বাঁকিপুরের স্থানীয় রাজনীতিকে আলাদা করে দেখেছেন।

প্রশান্তের বক্তব্য, যন্তর মন্তর এবং ঝাড়খণ্ডের সাম্প্রতিক ছাত্র-চাকরিপ্রার্থী আন্দোলন পরস্পরের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না হলেও, দু’টি ঘটনাই একটি গভীরতর জাতীয় সঙ্কটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরকারি নিয়োগ পরীক্ষাকে কেন্দ্র করে প্রশ্নপত্র ফাঁস, কোচিং প্রতিষ্ঠানের প্রভাব এবং শিক্ষা ও নিয়োগ ব্যবস্থায় দুর্নীতি এখন তরুণ সমাজের অসন্তোষের বড় কারণ হয়ে উঠেছে।

তাঁর কথায়, আগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ছিল ব্যতিক্রম। এখন এমন কোনও বড় পরীক্ষা খুঁজে পাওয়া কঠিন, যার স্বচ্ছতা নিয়ে অভিযোগ ওঠে না। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনীতির স্থবিরতা, কৃষিক্ষেত্রের চাপ এবং নতুন কর্মসংস্থানের ঘাটতি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসার আবার তথাকথিত সাদা কলারের চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

প্রশান্তের মতে, অর্থনৈতিক চাপ, শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং ব্যাপক বেকারত্বের সম্মিলিত অভিঘাতে তরুণদের মধ্যে গভীর অস্থিরতা জমছে। যন্তর মন্তর ও ঝাড়খণ্ডে তারই বহিঃপ্রকাশ দেখা গিয়েছে। এই ক্ষোভকে পুলিশি ব্যবস্থা বা সাময়িক রাজনৈতিক আশ্বাস দিয়ে দীর্ঘদিন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কারণ সমস্যাটি কয়েকটি পরীক্ষা কিংবা কয়েকটি প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর শিকড় যুবসমাজের কাঠামোগত বঞ্চনার মধ্যে রয়েছে।

তবে বাঁকিপুরে বিজেপির পরাজয়কে তিনি এই বৃহত্তর ‘জেন জি’ অসন্তোষের ফল বলে মানতে রাজি নন। প্রশান্তের দাবি, এনডিএ এমন একজনকে মুখ্যমন্ত্রী করেছে, যাঁর সমাজের বিভিন্ন স্তরে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা নেই। সম্রাট চৌধুরীর রাজনৈতিক অতীত, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক এবং আরজেডি থেকে উঠে আসার ইতিহাস তাঁর বিশ্বাসযোগ্যতাকে দুর্বল করেছে। বাঁকিপুরে বিজেপির হারের একটি প্রধান কারণ বেছে নিতে হলে তিনি সম্রাটকেই দায়ী করবেন বলে জানিয়েছেন।

বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের ভূমিকা অবশ্য তুলনামূলক ভাবে কমিয়ে দেখেছেন প্রশান্ত। বাঁকিপুরে নীরজ কুমার সিন্‌হাকে প্রার্থী করার পিছনে নিতিনের ভূমিকা ছিল বলে মনে করা হলেও প্রশান্তের বক্তব্য, তিনি রাজ্য সরকারের অংশ নন এবং কেন্দ্রটির দৈনন্দিন রাজনীতিতেও সরাসরি যুক্ত ছিলেন না। সম্ভবত নিজের পুরনো আসন ধরে রাখার জন্য তিনি একজন অস্থায়ী বিকল্প বেছে নিয়েছিলেন। প্রশান্তের মতে, দলীয় সভাপতি হয়েও নিতিন চাইলে বিধায়ক থাকতে পারতেন; অতীতে অমিত শাহও দলীয় সভাপতি হওয়ার পর বিধায়ক পদে ছিলেন।

বিহারের রাজনৈতিক চরিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জন সুরাজের প্রতিষ্ঠাতা। দীর্ঘদিন ধরে একদল ভোটার বিজেপির ভয়ে আরজেডিকে এবং অন্য অংশ আরজেডি বা লালুপ্রসাদ যাদবের শাসন ফিরে আসার আশঙ্কায় বিজেপি-এনডিএকে ভোট দিয়েছেন। এই ‘ভয়ের ভোট’ বন্ধ করে ইতিবাচক বিকল্প নির্মাণ করাই তাঁর দলের লক্ষ্য। গত তিন বছর বিহারজুড়ে সাংগঠনিক কাজ না করলে বাঁকিপুরে জয় সম্ভব হত না বলেও স্বীকার করেছেন তিনি।

বাঁকিপুরের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন প্রশান্ত। তাঁর প্রথম লক্ষ্য, রেশন গ্রাহকদের প্রাপ্য পাঁচ কিলোগ্রাম খাদ্যশস্য সম্পূর্ণ ভাবে পৌঁছে দেওয়া এবং রেশন কার্ড তৈরির ক্ষেত্রে ঘুষ বন্ধ করা। দ্বিতীয়ত, এক বছরের মধ্যে সরকারি বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান না বাড়লে সংশ্লিষ্ট শিশুদের বেসরকারি বিদ্যালয়ে স্থানান্তরের খরচ জন সুরাজ বহন করবে।

এ ছাড়া প্রায় ১০ হাজার পরিবারের অন্তত একজন সদস্যের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। তবে স্পষ্ট করেছেন, তা সরকারি চাকরির প্রতিশ্রুতি নয়। প্রত্যেকের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অনুযায়ী উপযুক্ত কাজের সুযোগ তৈরি করাই তাঁর পরিকল্পনা। একজন বিধায়ক এই লক্ষ্য পূরণ করতে পারলে বিহারের বাকি ২৪২ জন বিধায়কের উপরও কাজের চাপ বাড়বে বলে তাঁর দাবি।

প্রশান্ত বলেছেন, বাঁকিপুরে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনতে ব্যর্থ হলে তিনি আর ভোট চাইবেন না। সফল হলে গোটা বিহারকে জাতপাত ও ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে জন সুরাজকে সমর্থনের আহ্বান জানাবেন। আপাতত বিজেপি কিংবা আরজেডির সঙ্গে কোনও সুবিধাবাদী জোটেও তিনি আগ্রহী নন। তাঁর লক্ষ্য এমন এক বিহার গড়া, যেখানে অন্য রাজ্যের মানুষও কাজ ও শিক্ষার সুযোগ খুঁজতে আসবেন। বাঁকিপুরের জয় সেই দীর্ঘ পথের প্রথম রাজনৈতিক পরীক্ষা।