বাংলাস্ফিয়ার: অন্ধ্রপ্রদেশের অনন্তপুর জেলার প্রায় পাঁচ একর জমি জুড়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে থিম্মাম্মা মার্রিমানু—পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্তৃত ছাতাবিশিষ্ট বটগাছ। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস-এর স্বীকৃতিপ্রাপ্ত এই প্রায় ৫৫০ বছরের প্রাচীন গাছটি এতটাই বিশাল যে প্রথমবার দেখলে অনেকেরই মনে হয় এটি যেন একটি গোটা বন।

আসলে যেটিকে শত শত আলাদা গাছ বলে মনে হয়, সেটি বাস্তবে একটি মাত্র জীবন্ত গাছ। এর বিশাল ছাতাকে ধরে রেখেছে এক হাজারেরও বেশি কাণ্ড, কিন্তু সব কাণ্ডই একই মূল গাছের অংশ। প্রশ্ন হল, একটি গাছ কীভাবে এত বিশাল আকার ধারণ করে?

দাবিত্যাগ: এই প্রতিবেদনটি জনসমক্ষে উপলব্ধ তথ্য এবং বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে তৈরি।

পরিবেশবিদ জসমিত সিং অরোরার কথায়, অধিকাংশ গাছ যেখানে মূলত ওপরের দিকে বাড়ে, বটগাছের বৃদ্ধি ঘটে আড়াআড়িভাবে।

তিনি বলেন, “এই বিশাল বটগাছটি শুধু ওপরে ওঠে না, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর জন্য গাছটি ব্যবহার করে বিশেষ ধরনের ঝুরি বা বায়বীয় শিকড়। ডালের অনেক উঁচু থেকে এই শিকড় নিচের দিকে নেমে আসে। মাটিতে পৌঁছানোর পর এগুলি ধীরে ধীরে মোটা হয়ে কাণ্ডের মতো শক্ত স্তম্ভে পরিণত হয়।”

অরোরার ব্যাখ্যা, এই নতুন কাণ্ডগুলি বিস্তৃত ডালপালাকে ভর দিয়ে ধরে রাখে। ফলে গাছটি ভেঙে না পড়েই ক্রমাগত আরও বিস্তৃত হতে পারে।

গত সাড়ে পাঁচশো বছর ধরে এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। তাঁর কথায়, “এইভাবেই ৫৫০ বছরে তৈরি হয়েছে এক হাজারেরও বেশি কাণ্ড। তাই বাইরে থেকে এটি একটি বন বলে মনে হলেও, বাস্তবে এটি একটি মাত্র অসাধারণ জীবন্ত গাছ।”

কেন বটগাছকে বলা হয় ‘কী-স্টোন প্রজাতি’?

শুধু আকারের জন্য নয়, একটি পরিণত বটগাছ গোটা বাস্তুতন্ত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অরোরা জানান, বটগাছকে ‘কী-স্টোন প্রজাতি’ বলা হয়, কারণ একটি বটগাছের অস্তিত্বের ওপর বহু প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবন নির্ভর করে।

তিনি বলেন, “এর ঘন ডালপালা ও অসংখ্য কাণ্ড পাখি, বাদুড় এবং বিভিন্ন পোকামাকড়ের নিরাপদ আশ্রয় ও বাসা তৈরির জায়গা হয়ে ওঠে।”

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল বটগাছের ফল ধরার স্বভাব।

অরোরা জানান, “বছরের প্রায় সব সময়ই বটগাছে ডুমুর জাতীয় ফল ধরে। ফলে অন্য অনেক গাছে যখন ফল থাকে না, তখনও এটি বন্যপ্রাণীদের জন্য নির্ভরযোগ্য খাদ্যের উৎস হয়ে থাকে।”

এই ধারাবাহিক খাদ্য সরবরাহের ফলে বিভিন্ন ঋতুতেই বহু প্রাণী টিকে থাকতে পারে। তাই শতবর্ষী বটগাছকে জীববৈচিত্র্যের অন্যতম আশ্রয়স্থল বলে মনে করা হয়।

প্রাচীন বটগাছ হারিয়ে গেলে কী হবে?

অরোরার সতর্কবার্তা, “একটি পরিণত বটগাছ নষ্ট হয়ে গেলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য দ্রুত কমে যায়। বহু প্রাণী তাদের খাদ্য ও আশ্রয় হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়, অথবা তাদের সংখ্যা কমে যায়।”

এর প্রভাব শুধু প্রাণীকুলেই সীমাবদ্ধ থাকে না।

যে পাখি ও বাদুড় বটের ফল খায়, তারাই বিভিন্ন জায়গায় বীজ ছড়িয়ে দেয়। ফলে নতুন গাছ জন্মানোর প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া বজায় থাকে।

তিনি বলেন, “যদি পাখি ও বাদুড় বীজ ছড়াতে না পারে, তবে নতুন উদ্ভিদের জন্ম কমে যায়। এতে ধীরে ধীরে পুরো স্থানীয় বাস্তুতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।”

জলবায়ু পরিবর্তনের মোকাবিলায়ও গুরুত্বপূর্ণ

অরোরা বলেন, “ঐতিহ্যবাহী বটগাছ সংরক্ষণ করলে আশপাশের পরিবেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় অনেক বেশি সক্ষম হয়ে ওঠে।”

তাঁর ব্যাখ্যায়, এই বিশাল গাছের ঘন ছাতা প্রাকৃতিক শীতলীকরণ ব্যবস্থার মতো কাজ করে।

“বিস্তৃত ছায়া মাটির তাপমাত্রা কমায় এবং মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে তাপপ্রবাহ ও খরার সময়েও আশপাশের এলাকা তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে।”

বটগাছের বিস্তৃত শিকড়ের জালও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

অরোরা বলেন, “এই বিশাল শিকড়ের জাল মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে। ফলে ভারী বৃষ্টিতে মাটি ক্ষয় কম হয়। একই সঙ্গে বৃষ্টির জল মাটির ভেতরে প্রবেশ করে ভূগর্ভস্থ জলভাণ্ডার পুনরায় পূরণ হতে সাহায্য করে।”

এছাড়া অন্যান্য বৃহৎ ও দীর্ঘজীবী গাছের মতোই প্রাচীন বটগাছ বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে নিজের মধ্যে সঞ্চয় করে রাখে।

অরোরার কথায়, “জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে এই ধরনের গাছ প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ। তাই ঐতিহ্যবাহী বটগাছ সংরক্ষণ করা মানে চরম আবহাওয়ার বিরুদ্ধে একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা গড়ে তোলা।”