হাইলাইটস:

  • সৌদি আরবের বন্দর ব্যবহারকারী তেলবাহী জাহাজে হামলার হুমকি হুথিদের।
  • বাব এল-মান্দেবে নতুন অবরোধ কার্যকর করার চেষ্টা শুরু।
  • সৌদি তেল বোঝাই অন্তত দুটি ট্যাঙ্কার মাঝপথ থেকে রুট বদলেছে।
  • হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব—দুটি কৌশলগত জলপথেই একযোগে চাপ।
  • বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও এশিয়ার তেল আমদানিতে নতুন অনিশ্চয়তা।

বাংলাস্ফিয়ার: ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা এবার সরাসরি সৌদি আরবের তেল রপ্তানিকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে। তারা জানিয়েছে, যে কোনও তেলবাহী জাহাজ যদি সৌদি আরবের লোহিত সাগর-সংলগ্ন বন্দর থেকে তেল বোঝাই করে বা সেখানে পণ্য ওঠানামা করে, তবে সেই জাহাজ বিশ্বের যে কোনও স্থানে তাদের হামলার আওতায় পড়তে পারে।

এই সতর্কবার্তা এমন সময়ে এল, যখন অপরদিকে ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে আরব উপদ্বীপের দুই প্রান্তের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ—হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব—একসঙ্গে অস্থির হয়ে উঠেছে। বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি সরবরাহের জন্য এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক পরিস্থিতি।

সৌদি তেলবাহী জাহাজের পথ পরিবর্তন

হুথিদের হুমকির গুরুত্ব বোঝা যায় একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনার মাধ্যমে। সৌদি আরব থেকে চীন ও ভারতের উদ্দেশে রওনা হওয়া অন্তত দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার মঙ্গলবার বাব এল-মান্দেবের দিকে না গিয়ে মাঝপথেই ঘুরে সুয়েজ খালের দিকে চলে যায়। হুথিদের দাবি, মোট ছয়টি জাহাজ তাদের ঘোষণার পর পথ পরিবর্তন করেছে।

এটি ইঙ্গিত করছে যে আন্তর্জাতিক শিপিং সংস্থাগুলি হুমকিকে হালকাভাবে নিচ্ছে না।

জাহাজ সংস্থাগুলিকে সরাসরি বার্তা

হুথিরা সোমবার একাধিক আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিকে ই-মেল পাঠিয়ে জানায়, সৌদি আরবের বন্দরে পণ্য ওঠানামা করা বা তেল পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সংশ্লিষ্ট জাহাজকে “যে কোনও স্থানে” লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।

তাদের বক্তব্য, কোম্পানিগুলিকে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে এবং সৌদি বন্দর ব্যবহারের আগে ঝুঁকি বিবেচনা করতে হবে।

যদিও হুথিরা আনুষ্ঠানিকভাবে বাব এল-মান্দেব প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করেনি, এই হুমকিই কার্যত ওই জলপথকে বিপজ্জনক করে তুলছে।

কেন এত গুরুত্বপূর্ণ বাব এল-মান্দেব?

বাব এল-মান্দেব প্রণালী লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৭ শতাংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে চলাচল করে। ইউরোপ-এশিয়া বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান রুট এটি।

হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ যায়। অন্যদিকে বাব এল-মান্দেব সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার। দুটি পথ একসঙ্গে বিপদের মুখে পড়লে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব মিলিয়ে বিশ্বে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-চতুর্থাংশ এই দুই প্রণালী অতিক্রম করে।

চীন ও ভারতের ওপর প্রভাব

সৌদি আরব থেকে রপ্তানি হওয়া তেলের বড় অংশই এশিয়ায়, বিশেষ করে চীন ও ভারতের বাজারে যায়। ফলে হুথিদের এই নতুন কৌশল দুই বৃহৎ আমদানিকারক দেশকেও সমস্যায় ফেলতে পারে।

অতীতে হুথিরা চীন ও রাশিয়ার কিছু জাহাজকে ছাড় দিলেও, এবার সৌদি তেল বহনকারী জাহাজের ক্ষেত্রে সেই নীতি বহাল থাকবে কি না, তা স্পষ্ট নয়।

ট্রাম্পের কড়া বার্তা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুথিদের হুমকির জবাবে বলেছেন, যদি তারা এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে, তাহলে আমেরিকা “প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা” নেবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, অতীতেও হুথিদের বিরুদ্ধে আমেরিকা সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছিল।

একই সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বলেছেন, ওয়াশিংটন এখনও ইরানের সঙ্গে আলোচনার জন্য প্রস্তুত, তবে সেই আলোচনা হতে হবে “বাস্তবসম্মত”।

যুদ্ধ চললেও কূটনৈতিক চেষ্টা

পর্দার আড়ালে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন একদিকে সামরিক অভিযান আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা বিবেচনা করছে, অন্যদিকে নতুন আলোচনার সুযোগ তৈরির জন্য ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির বিকল্পও খতিয়ে দেখছে।

এরই মধ্যে ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাকিস্তর সফরে গিয়েছেন। পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা করছে।

পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত

মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা ইরানের সামরিক সদর দপ্তর, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, নৌ সক্ষমতা এবং আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় নতুন হামলা চালিয়েছে।

অন্যদিকে ইরান জর্ডনের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে বলে জর্ডনের সেনাবাহিনী দাবি করেছে। কুয়েতও অভিযোগ করেছে, তাদের বিদ্যুৎ ও লবণমুক্তকরণ কেন্দ্র টানা চতুর্থ দিনের মতো হামলার মুখে পড়েছে।

বিশ্ব অর্থনীতির সামনে নতুন ঝুঁকি

২০২৩ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে হুথিরা ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র ও দ্রুতগতির নৌকা ব্যবহার করে একশোরও বেশি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতার কারণে এবারও শিপিং সংস্থাগুলি ঝুঁকি নিতে চাইছে না।

যদি হরমুজ ও বাব এল-মান্দেব—দুই প্রণালীতেই দীর্ঘ সময় ধরে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়, তবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে। এতে পরিবহন ব্যয়, মুদ্রাস্ফীতি এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নতুন করে চাপের মুখে পড়বে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়বে সেই দেশগুলির ওপর, যাদের অর্থনীতি আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।