Home খবর ‘ক্যাচার’-এর ৭৫: হোল্ডেনের বিদ্রোহে বেদান্তের ছায়া?

‘ক্যাচার’-এর ৭৫: হোল্ডেনের বিদ্রোহে বেদান্তের ছায়া?

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
26 views 6 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

  • ১৯৫১ সালের ১৬ জুলাই প্রকাশিত হয় ‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’
  • বিতর্ক, নিষেধাজ্ঞা পেরিয়েও বইটি আজ বিশ্বসাহিত্যের ক্লাসিক।
  • যুদ্ধের পর রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ সেন্টারের সঙ্গে যুক্ত হন জে. ডি. স্যালিঞ্জার।
  • ভগবদ্গীতা নিয়মিত পড়তেন বলে নিজেই লিখেছিলেন লেখক।
  • গবেষকদের মতে, উপন্যাসে সূক্ষ্মভাবে ফুটে উঠেছে বেদান্ত ও জেন বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব।

১৯৫১ সালের ১৬ জুলাই প্রকাশিত হয়েছিল জে. ডি. স্যালিঞ্জারের একমাত্র পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস ‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’। প্রকাশের ৭৫ বছর পরও বইটি নিয়ে বিতর্ক যেমন থামেনি, তেমনই কমেনি তার জনপ্রিয়তাও। এক বিদ্রোহী কিশোরের চোখে সমাজকে দেখার এই গল্প শুধু আমেরিকান সাহিত্যের ক্লাসিকই নয়, বহু গবেষকের মতে এটি এক গভীর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানেরও দলিল।

উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে ১৬ বছরের হোল্ডেন কফিল্ড—রাগী, একাকী এবং সমাজের তথাকথিত ‘ভণ্ড’ মানুষদের প্রতি প্রবল বিরক্ত এক কিশোর। চতুর্থ বোর্ডিং স্কুল থেকেও বহিষ্কৃত হওয়ার পর বাড়ি না ফিরে সে একা নিউ ইয়র্ক শহরে তিন দিন-দু’রাত ঘুরে বেড়ায়। সেই যাত্রায় তার চোখে ধরা পড়ে এমন এক পৃথিবী, যেখানে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া মানেই যেন আপস, অভিনয় আর ভণ্ডামিকে মেনে নেওয়া।

কিন্তু হোল্ডেনের এই বিদ্রোহের নেপথ্যে রয়েছে গভীর ব্যক্তিগত শোক। ছোট ভাই অ্যালি-র অকালমৃত্যু তাকে ভেঙে দেয়। ভাইয়ের মৃত্যু শুধু একজন প্রিয় মানুষকে হারানোর যন্ত্রণা নয়, তার নিজের শৈশব হারানোর প্রতীকও হয়ে ওঠে। তাই হোল্ডেনের ক্ষোভ আসলে বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে ফেরার এক মরিয়া চেষ্টা।

যুদ্ধের ক্ষত থেকে ভারতীয় দর্শনের পথে

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন সেনাবাহিনীতে কর্মরত ছিলেন জে. ডি. স্যালিঞ্জার। যুদ্ধের নির্মম অভিজ্ঞতা তাঁর মানসিক জীবনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। যুদ্ধ শেষে তিনি নিউ ইয়র্কের রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ সেন্টার-এ নিয়মিত যাতায়াত শুরু করেন এবং কেন্দ্রটির প্রতিষ্ঠাতা স্বামী নিখিলানন্দ-এর সঙ্গে দীর্ঘদিন যোগাযোগ বজায় রাখেন।

একটি ব্যক্তিগত চিঠিতে স্যালিঞ্জার লিখেছিলেন, প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তিনি ভগবদ্গীতার কয়েকটি অংশ পড়তেন। তাঁর জীবনীকার কেনেথ স্লাওয়েনস্কি-র মতে, ১৯৫২ সালের পর থেকে বেদান্ত দর্শন স্যালিঞ্জারের সাহিত্যচিন্তার অন্যতম ভিত্তি হয়ে ওঠে। তবে তিনি কখনও সরাসরি ধর্মীয় ভাষণ দিতে চাননি; বরং সেই দর্শনকে গল্পের ভেতর সূক্ষ্মভাবে মিশিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

বেদান্ত ও বৌদ্ধ দর্শনের প্রতিধ্বনি

উপন্যাসে কোথাও প্রকাশ্যে বেদান্ত বা বৌদ্ধধর্মের উল্লেখ নেই। তবু সাহিত্য-গবেষকদের মতে, এর অন্তর্নিহিত ভাবনায় ভারতীয় দর্শনের প্রভাব স্পষ্ট।

বিংহ্যামটন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হুমায়ুন আলি মির্জা ১৯৭৬ সালের এক গবেষণাপত্রে লিখেছিলেন, হোল্ডেন পৃথিবীকে দুই ভাগে ভাগ করে দেখে—‘আসল’ এবং ‘ভণ্ড’। এই দ্বৈততা অনেকটাই বেদান্তের ‘ব্রহ্ম’‘মায়া’ ধারণার প্রতিধ্বনি বলে মনে হয়।

আবার বৌদ্ধ দর্শনের সঙ্গেও মিল খুঁজে পান গবেষকেরা। যেমন, রাজপুত্র সিদ্ধার্থ গৌতম জীবনের দুঃখ ও মৃত্যুর মুখোমুখি হয়ে সত্যের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েছিলেন, তেমনই ভাইয়ের মৃত্যুর পর হোল্ডেনও জীবনের অর্থ খুঁজতে শুরু করে।

১৯৭৭ সালে প্রকাশিত ‘A Retrospective Look at the Catcher in the Rye’ প্রবন্ধে গবেষক জেরাল্ড রোজেন লিখেছিলেন, বৌদ্ধধর্ম মানুষকে নিজের ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে সত্যকে গ্রহণ করতে শেখায়। তাঁর মতে, হোল্ডেনের মানসিক যাত্রাও সেই উপলব্ধির দিকেই এগোয়।

পরিবর্তনকে অস্বীকার করার যন্ত্রণা

বেদান্ত ও বৌদ্ধ—দুই দর্শনই বলে, পরিবর্তন অনিবার্য এবং ক্ষণস্থায়ী জগতকে আঁকড়ে ধরার মধ্যেই মানুষের দুঃখের সূত্র।

হোল্ডেন যেন ঠিক সেই কাজটিই করে। সে মৃত ভাই অ্যালির বেসবল গ্লাভস যত্ন করে রেখে দেয়। ভাঙা রেকর্ডও ফেলতে পারে না। নিউ ইয়র্কের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়াম তার প্রিয় জায়গা, কারণ সেখানে সবকিছু একই রকম থাকে—কিছুই বদলায় না।

কিন্তু বাস্তবের পৃথিবী থেমে থাকে না। সময় এগিয়ে চলে, মানুষ বদলায়। আর সেই পরিবর্তন মেনে নিতে না পারার যন্ত্রণাই হোল্ডেনের সবচেয়ে বড় সংকট।

শিরোনামের আড়ালে কী অর্থ?

উপন্যাসের সবচেয়ে বিখ্যাত অংশগুলির একটি হল হোল্ডেনের সেই কল্পনা, যেখানে সে নিজেকে একটি বিশাল রাইয়ের ক্ষেতে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ হিসেবে দেখে। অসংখ্য শিশু খেলছে, আর মাঠের শেষে রয়েছে গভীর খাদ। তার একমাত্র কাজ—কোনও শিশু যাতে পড়ে না যায়, তাদের ধরে ফেলা।

জেরাল্ড রোজেনের মতে, এটি এমন এক নিষ্পাপ জগতের স্বপ্ন, যেখানে সময়, হিংসা বা পতনের ভয় নেই। আবার অনেক গবেষক এই প্রতীককে বোধিসত্ত্বের ধারণার সঙ্গে তুলনা করেছেন—যিনি নিজের মুক্তির আগে অন্যদের রক্ষা করার চেষ্টা করেন।

কৈশোরের গল্প, নাকি আত্ম-অনুসন্ধানের উপন্যাস?

‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’ নিঃসন্দেহে এক কিশোরের বেড়ে ওঠা, একাকিত্ব, শোক এবং সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতার গল্প। কিন্তু স্যালিঞ্জারের ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক যাত্রা, বেদান্তের প্রতি তাঁর আকর্ষণ এবং গীতাপাঠের অভ্যাস জানলে উপন্যাসটি যেন আরও এক স্তর উন্মোচন করে।

হোল্ডেন কফিল্ডের ভণ্ডামিবিরোধী ক্ষোভ, সত্যের খোঁজ, শৈশবকে আঁকড়ে ধরে রাখার আকাঙ্ক্ষা এবং পরিবর্তনের সামনে অসহায়তা—সব মিলিয়ে ‘দ্য ক্যাচার ইন দ্য রাই’ শুধু একটি কালজয়ী কৈশোরের উপন্যাস নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব, শোক এবং আত্ম-অনুসন্ধানেরও এক গভীর সাহিত্যিক দলিল।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles