হাইলাইটস:

  • জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করল কেন্দ্র।
  • আমেরিকার সম্ভাব্য অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের আশঙ্কার মধ্যেই এই সিদ্ধান্ত।
  • তদন্তে জোরপূর্বক শ্রমের প্রমাণ মিললে সংশ্লিষ্ট পণ্যের আমদানি বন্ধ হবে।
  • আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিদেশ বাণিজ্য নীতিতে সংশোধন।

বাংলাস্ফিয়ার: আমেরিকার সম্ভাব্য নতুন শুল্ক নীতির চাপের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিল ভারত সরকার। জোরপূর্বক শ্রম (Forced Labour) ব্যবহার করে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে উৎপাদিত কোনও পণ্য ভারতে আমদানি করা যাবে না বলে বিদেশ বাণিজ্য নীতিতে (Foreign Trade Policy) সংশোধন করেছে কেন্দ্র। বাণিজ্য মন্ত্রকের অধীন ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড (ডিজিএফটি) এই সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে। নতুন বিধান সরকারি গেজেটে প্রকাশের ৩০ দিন পরে কার্যকর হবে।

এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল, যখন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দফতর (ইউএসটিআর) অভিযোগ করেছে যে ভারত-সহ একাধিক দেশ জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্যের আমদানি কার্যকরভাবে রোধ করতে ব্যর্থ হয়েছে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে আমেরিকা ভারতের পণ্যের উপর অতিরিক্ত ১২.৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের প্রস্তাব বিবেচনা করছে।

ডিজিএফটির বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনও ব্যক্তি যদি স্বেচ্ছায় নয়, বরং শাস্তির ভয় দেখিয়ে কাজ করতে বাধ্য হন, তবে তাকে জোরপূর্বক শ্রম হিসেবে গণ্য করা হবে। সেই ধরনের শ্রম ব্যবহার করে উৎপাদিত পণ্য ভারতে আমদানি নিষিদ্ধ করা হবে।

নতুন ব্যবস্থায় সরকারকে সন্দেহভাজন পণ্যের উৎস ও উৎপাদন প্রক্রিয়া তদন্তের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। বিদেশ বাণিজ্য সংক্রান্ত কর্তৃপক্ষ অভিযোগ বা তথ্যের ভিত্তিতে তদন্ত করবে। যদি পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায় যে কোনও পণ্য জোরপূর্বক শ্রম ব্যবহার করে তৈরি হয়েছে, তাহলে সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে পরামর্শের পর কেন্দ্রীয় সরকার সেই পণ্যের আমদানি নিষিদ্ধ করার বিজ্ঞপ্তি জারি করতে পারবে।

বাণিজ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি অবিলম্বে সব ধরনের আমদানির উপর নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং একটি আইনি কাঠামো তৈরি করা হয়েছে। ভবিষ্যতে তদন্ত, প্রমাণ এবং সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই নির্দিষ্ট পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ফলে এই নীতির কার্যকারিতা নির্ভর করবে তদন্তের মান, প্রমাণ সংগ্রহের প্রক্রিয়া এবং সরকারের প্রয়োগের উপর।

ভারতের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার সংক্রান্ত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ শৃঙ্খলে জোরপূর্বক শ্রমের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। বিশেষ করে কিছু অঞ্চলের উৎপাদিত পণ্য নিয়ে বিভিন্ন দেশে প্রশ্ন উঠেছে। ফলে ভারতও এখন স্পষ্ট আইনি অবস্থান গ্রহণ করল।

বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের আর একটি বড় উদ্দেশ্য হল ভারতকে দায়িত্বশীল বাণিজ্য অংশীদার হিসেবে তুলে ধরা। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য আলোচনা এবং সম্ভাব্য শুল্ক সংক্রান্ত বিরোধের প্রেক্ষাপটে এই পদক্ষেপ ভারতের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করতে পারে। এর মাধ্যমে নয়াদিল্লি দেখাতে চাইছে যে, জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য রোধে তারা প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

তবে মার্কিন প্রশাসন শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করবে কি না, তা এখনও চূড়ান্ত নয়। ইউএসটিআরের তদন্ত ও পর্যালোচনার ভিত্তিতেই সেই সিদ্ধান্ত হবে। ভারত ইতিমধ্যেই মার্কিন অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় বলে জানিয়েছে এবং বাণিজ্য আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টির সমাধান চায়।

সব মিলিয়ে, জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা ভারতের বাণিজ্য নীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন। একদিকে এটি আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ডের প্রতি ভারতের প্রতিশ্রুতি তুলে ধরছে, অন্যদিকে মার্কিন সম্ভাব্য শুল্কের ঝুঁকি মোকাবিলায় কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।