হাইলাইটস:
- প্রায় দুই দশক পর কলকাতায় ফেরার পথে নির্বাসিত লেখিকা তসলিমা নাসরিন।
- বিশেষ সরকারি অনুমতিতে সীমিত সময়ের জন্য তাঁর সফর হতে পারে।
- ২০০৭ সালের বিতর্ক ও সহিংসতার পর তাঁকে কলকাতা ছাড়তে হয়েছিল।
- বাংলা সাহিত্য ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে শুরু হয়েছে আলোচনা।
- নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কারণে সফর ঘিরে কড়া নজর প্রশাসনের।
বাংলাস্ফিয়ার: প্রায় ১৯ বছর পর কলকাতায় ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বিতর্কিত ও নির্বাসিত বাংলাদেশি লেখিকা তসলিমা নাসরিন। দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিভিন্ন শহরে বসবাস করলেও রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে তাঁর কলকাতায় ফেরা সম্ভব হয়নি। এবার বিশেষ সরকারি অনুমতির ভিত্তিতে সীমিত সময়ের জন্য তাঁর কলকাতা সফরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গিয়েছে।
তসলিমা নাসরিনের সঙ্গে কলকাতার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে বাংলাদেশ ছাড়ার পর তিনি কলকাতাকে নিজের সাংস্কৃতিক আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। বাংলা ভাষা, সাহিত্য এবং পাঠকসমাজের সঙ্গে তাঁর গভীর যোগাযোগ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২০০৭ সালের নভেম্বরে তাঁর উপস্থিতি ঘিরে শহরে ব্যাপক বিক্ষোভ, সহিংসতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে। সেই পরিস্থিতির জেরে তাঁকে কলকাতা ছাড়তে হয়। এরপর থেকে দিল্লিসহ ভারতের অন্যত্র থাকলেও পশ্চিমবঙ্গে তাঁর প্রবেশ কার্যত বন্ধ ছিল।
এই দীর্ঘ ব্যবধানের পর তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন শুধু একটি ব্যক্তিগত সফর নয়, বরং সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। কারণ তসলিমা নাসরিনের নাম উচ্চারিত হলেই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ধর্মীয় মৌলবাদ, নারী অধিকার এবং রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক নতুন করে সামনে আসে।
তাঁর লেখালেখি দীর্ঘদিন ধরেই প্রবল বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। বিশেষ করে ‘লজ্জা’ প্রকাশের পর বাংলাদেশে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যাপক প্রতিবাদ শুরু হয়। পরে একাধিক ধর্মীয় গোষ্ঠীর হুমকির মুখে তাঁকে দেশ ছাড়তে হয়। এরপর ইউরোপ, আমেরিকা ও ভারত—বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিলেও কলকাতাকেই তিনি বহুবার নিজের ‘প্রিয় শহর’ বলে উল্লেখ করেছেন।
তাঁর সম্ভাব্য সফর ঘিরে প্রশাসনও সতর্ক। অতীতের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে নিরাপত্তার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাচ্ছে। সফরের সময়সূচি, কোথায় থাকবেন, কোন অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন—এসব বিষয়ে এখনও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। নিরাপত্তার স্বার্থেই অনেক তথ্য গোপন রাখা হচ্ছে বলে জানা যাচ্ছে।
এই সফরকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। একাংশের মতে, একজন লেখকের অবাধ যাতায়াত এবং মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত হওয়া উচিত। অন্যদিকে বিরোধী মতের গোষ্ঠীগুলি এখনও তাঁর লেখাকে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতকারী বলে দাবি করছে। ফলে সফরকে কেন্দ্র করে নতুন বিতর্কের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বাংলা সাহিত্যজগতেও এই খবর আগ্রহের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। অনেক সাহিত্যিক মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর তসলিমার কলকাতায় ফেরা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে ঘিরে নতুন আলোচনা তৈরি করবে। আবার কেউ কেউ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, একজন লেখকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তসলিমা নাসরিন নিজেও অতীতে বহুবার বলেছেন, কলকাতা তাঁর কাছে শুধু একটি শহর নয়, আবেগের জায়গা। বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। তাই এই প্রত্যাবর্তন তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের এক আবেগঘন মুহূর্ত হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে প্রায় দুই দশকের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবার কলকাতার মাটিতে পা রাখবেন তসলিমা নাসরিন। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন শুধুমাত্র এক লেখিকার সফর নয়; এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সাহিত্য এবং সমাজ-রাজনীতির জটিল সম্পর্ক নিয়ে নতুন বিতর্ক ও আলোচনারও সূচনা করতে পারে।