Table of Contents
মস্কো: টেলিগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী পাভেল দুরভকে ‘সন্ত্রাসবাদী ও চরমপন্থী’ ব্যক্তিদের সরকারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করল রাশিয়া। বৃহস্পতিবার দেশটির আর্থিক নজরদারি সংস্থা রসফিনমনিটরিং প্রকাশিত তালিকায় দুরভের নাম যোগ করা হয়েছে।
এর মাত্র এক দিন আগে রাশিয়ার ফেডারেল সিকিউরিটি সার্ভিস (এফএসবি) জানিয়েছিল, ইউক্রেনীয় গোয়েন্দাদের টেলিগ্রাম ব্যবহার করতে দেওয়ার অভিযোগে দুরভের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্তরে গ্রেফতারি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে।
৪১ বছর বয়সি দুরভ বহু বছর ধরেই রাশিয়ার বাইরে বসবাস করছেন। তাঁর কাছে ফ্রান্স ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির নাগরিকত্ব রয়েছে। ইন্টারনেট ও অনলাইন যোগাযোগের উপর ক্রেমলিনের নিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর নীতির বিরোধিতা করায় রুশ প্রশাসনের সঙ্গে তাঁর সংঘাতও নতুন নয়।
টেলিগ্রাম নিয়ে মস্কোর ক্ষোভ
রাশিয়ায় টেলিগ্রাম অন্যতম জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যম। ব্যবহারকারীদের তথ্য সরকারের হাতে তুলে দেওয়া এবং রাষ্ট্র-সমর্থিত বিকল্প প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে মস্কো অতীতেও একাধিকবার টেলিগ্রামকে বন্ধ বা সীমিত করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সেই উদ্যোগ কার্যত সফল হয়নি।
এবার এফএসবির অভিযোগ আরও গুরুতর। রুশ গোয়েন্দাদের দাবি, টেলিগ্রাম একটি জনপ্রিয় ‘ডেটিং বট’ সরাতে ব্যর্থ হয়েছে। ওই বট ব্যবহার করে ইউক্রেনের বিশেষ বাহিনী তরুণ রুশ নাগরিকদের নাশকতা ও সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে প্ররোচিত করছে বলে অভিযোগ মস্কোর।
টেলিগ্রামের পক্ষ থেকে অবশ্য এই অভিযোগের কোনও বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
‘কালো তালিকা’র অর্থ কী?
রসফিনমনিটরিংয়ের ‘সন্ত্রাসবাদী ও চরমপন্থী’ তালিকায় দুরভের নাম ওঠার ফলে রাশিয়ার ভিতরে তাঁর আর্থিক লেনদেন কার্যত কঠিন হয়ে পড়বে। তাঁর সম্পত্তি বা অর্থের উপরও বিধিনিষেধ আরোপ হতে পারে।
তবে এই পদক্ষেপকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রশ্নও উঠেছে। সমালোচকদের অভিযোগ, রুশ প্রশাসন অতীতে সরকারের সমালোচক এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসবাদ’ ও ‘চরমপন্থা’-সংক্রান্ত আইনি অভিযোগ ব্যবহার করেছে।
এএফপির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে দুরভের আইনজীবীরা বুধবার কোনও মন্তব্য করতে চাননি। টেলিগ্রামের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, “এই মুহূর্তে পাভেল দুরভ এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে চান না।”
রাশিয়ার বাইরেও আইনি ঝামেলা
দুরভের আইনি জটিলতা অবশ্য শুধু রাশিয়ায় সীমাবদ্ধ নয়। ২০২৪ সালে ফ্রান্সে অবৈধ বিষয়বস্তু ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। পরে জামিনে মুক্তি পান। ভ্রমণ-নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পর ফ্রান্স ছেড়ে চলে যান তিনি।
সেন্ট পিটার্সবার্গে জন্ম দুরভের। প্রথমে তিনি ‘ভিকনতাকতে’ বা ভিকে নামে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরি করেন, যাকে অনেক সময় ‘রাশিয়ার ফেসবুক’ বলা হয়। রুশ সরকারের সঙ্গে মতবিরোধের জেরে সেই সংস্থা ছেড়ে দেওয়ার পরই টেলিগ্রাম তৈরির পথে এগোন তিনি।
‘ম্যাক্স’ নিয়েও দুরভ বনাম মস্কো
টেলিগ্রামকে ঘিরে চাপের মধ্যেই রুশ সরকার সম্প্রতি ব্যবহারকারীদের ‘ম্যাক্স’ নামে একটি রাষ্ট্র-সমর্থিত মেসেজিং প্ল্যাটফর্মে চলে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
দুরভ অবশ্য সেই প্ল্যাটফর্মের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তাঁর অভিযোগ, ‘ম্যাক্স’ মূলত নজরদারি ও রাজনৈতিক সেন্সরশিপের কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি।
ফলে টেলিগ্রাম প্রধানের বিরুদ্ধে রাশিয়ার সর্বশেষ পদক্ষেপকে শুধুমাত্র একটি আইনি ব্যবস্থা হিসেবে দেখছেন না পর্যবেক্ষকদের একাংশ। তাঁদের মতে, এটি মস্কোর নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা একটি জনপ্রিয় যোগাযোগমাধ্যম এবং তার প্রতিষ্ঠাতার সঙ্গে রুশ রাষ্ট্রের দীর্ঘ সংঘাতেরই নতুন অধ্যায়।
টেলিগ্রামকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি রাশিয়া—এবার কি দুরভকেই চাপে ফেলার পথে হাঁটছে মস্কো?