হাইলাইটস:
- ২০২২ সালে অ্যাফাসিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কথা প্রকাশ করেন ব্রুস উইলিসের পরিবার।
- ২০২৩ সালে তাঁর রোগ নির্ণয় হয় ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া (FTD) হিসেবে।
- স্ত্রী এমা হেমিং উইলিস জানান, অভিনেতার মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা দ্রুত ক্ষয় হচ্ছে।
- সাম্প্রতিক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, উইলিস নিজের রোগ সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নন।
- পরিবারের সদস্যরা নিয়মিত তাঁর শারীরিক ও মানসিক অবস্থার খোঁজখবর দিচ্ছেন।
হলিউডের অ্যাকশন ছবির ইতিহাসে অন্যতম উজ্জ্বল নাম ব্রুস উইলিস। ‘ডাই হার্ড’, ‘দ্য সিক্সথ সেন্স’, ‘পাল্প ফিকশন’ কিংবা ‘আর্মাগেডন’-এর মতো জনপ্রিয় ছবির নায়ক একসময় ছিলেন বিশ্বজুড়ে কোটি দর্শকের প্রিয় মুখ। কিন্তু গত চার বছর ধরে তিনি জনজীবন থেকে কার্যত সম্পূর্ণ সরে গিয়েছেন। কারণ, এক জটিল স্নায়বিক রোগ ধীরে ধীরে কেড়ে নিচ্ছে তাঁর ভাষা, স্মৃতি এবং বাস্তবতা বোঝার ক্ষমতা।
বর্তমানে ৭১ বছর বয়সী ব্রুস উইলিসের অসুস্থতা প্রথম প্রকাশ্যে আসে ২০২২ সালে। সে সময় তাঁর পরিবার জানায় যে তিনি অ্যাফাসিয়া নামে একটি রোগে আক্রান্ত। এই রোগ মানুষের ভাষা বোঝা, কথা বলা, পড়া কিংবা লেখার ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। ফলে উইলিস অভিনয় থেকে অবসর নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
তবে কয়েক মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ২০২৩ সালে চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেন যে তিনি ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া বা এফটিডি-তে আক্রান্ত। এটি ডিমেনশিয়ার এমন একটি ধরন, যা মস্তিষ্কের সামনের এবং পাশের অংশকে আক্রমণ করে। এর ফলে শুধু স্মৃতিশক্তিই নয়, আচরণ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা, ব্যক্তিত্ব এবং ভাষাগত দক্ষতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
গত বছর একটি সাক্ষাৎকারে ব্রুস উইলিসের স্ত্রী এমা হেমিং উইলিস বলেছিলেন, “তাঁর মস্তিষ্ক আর আগের মতো কাজ করছে না।” এই মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর ভক্তদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। কারণ, ‘মস্তিষ্ক ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে’—এই কথার অর্থ কী, তা নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়।
পরে এমা আরও বিস্তারিতভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ‘কনভারসেশনস উইথ ক্যাম’ পডকাস্টে তিনি জানান, ব্রুস উইলিস এখন আর নিজের রোগ সম্পর্কে সম্পূর্ণ সচেতন নন। এফটিডি-র অনেক রোগীর ক্ষেত্রেই এমনটি দেখা যায়। রোগটি মস্তিষ্কের যে অংশে আঘাত হানে, তার ফলে আক্রান্ত ব্যক্তি নিজের অবস্থার গুরুত্ব বুঝতে পারেন না বা রোগের অস্তিত্বই উপলব্ধি করতে পারেন না।
চিকিৎসকদের মতে, ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়া সাধারণত ৪৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সীদের মধ্যে বেশি দেখা যায়। এটি আলঝাইমারের মতো স্মৃতিভিত্তিক রোগ নয়; বরং প্রথম দিকে আচরণগত পরিবর্তন এবং ভাষাগত সমস্যাই বেশি চোখে পড়ে। রোগ যত এগোয়, আক্রান্ত ব্যক্তি পরিবার, বন্ধু বা পরিচিত মানুষদের চিনতে সমস্যায় পড়তে পারেন। দৈনন্দিন কাজকর্মও ক্রমশ কঠিন হয়ে ওঠে।
ব্রুস উইলিসের পরিবারের সদস্যরা শুরু থেকেই তাঁর চিকিৎসা ও পরিচর্যার বিষয়ে খোলামেলা অবস্থান নিয়েছেন। স্ত্রী এমা হেমিং, সাবেক স্ত্রী Demi Moore এবং তাঁদের সন্তানরা নিয়মিত তাঁর অবস্থা সম্পর্কে জনসাধারণকে অবহিত করছেন। পরিবার জানিয়েছে, তাঁরা রোগের সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি এফটিডি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির কাজেও যুক্ত রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিমেনশিয়ার এই ধরন রোগীর পাশাপাশি পরিবারের জন্যও অত্যন্ত কঠিন। কারণ, প্রিয় মানুষটিকে ধীরে ধীরে বদলে যেতে দেখা মানসিকভাবে ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক। রোগী হয়তো শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকেন, কিন্তু তাঁর ব্যক্তিত্ব, স্মৃতি বা যোগাযোগের ক্ষমতা আগের মতো থাকে না।
ব্রুস উইলিসের ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতাই সামনে এসেছে। একসময়ের প্রাণবন্ত, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিদীপ্ত অভিনেতা এখন পরিবারের নিবিড় পরিচর্যার ওপর নির্ভরশীল। যদিও তাঁর পরিবার এখনও আশাবাদী এবং তাঁকে ঘিরে ভালোবাসার পরিবেশ বজায় রাখার চেষ্টা করছে।
হলিউডের এই কিংবদন্তির অসুস্থতা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে ফ্রন্টোটেম্পোরাল ডিমেনশিয়ার মতো অপেক্ষাকৃত কম পরিচিত রোগ সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী সচেতনতা বাড়ানোর ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতি সত্ত্বেও এই রোগের এখনও নির্দিষ্ট কোনও নিরাময় নেই। তাই রোগীর জীবনমান বজায় রাখা এবং পরিবারের মানসিক সহায়তাই বর্তমানে সবচেয়ে বড় ভরসা।
ব্রুস উইলিসের জীবনের এই অধ্যায় তাঁর অসংখ্য ভক্তের কাছে বেদনাদায়ক হলেও, একই সঙ্গে এটি মানবিক সাহস, পারিবারিক ভালোবাসা এবং কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হওয়ার এক গভীর গল্প।