হাইলাইটস:

  • দুই দশক পর গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব ছাড়ার ঘোষণা দিল হামাস।
  • মার্কিন-সমর্থিত অন্তর্বর্তী প্রশাসন ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-র হাতে শাসনভার তুলে দিতে চায় সংগঠনটি।
  • তবে ইজরায়েল ও আমেরিকার দাবি সত্ত্বেও একতরফাভাবে অস্ত্র সমর্পণের প্রতিশ্রুতি দেয়নি হামাস।
  • বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি-আলোচনা পুনরুজ্জীবিত করা এবং গাজা পুনর্গঠনের পথ খুলতেই এই কূটনৈতিক পদক্ষেপ।

বাংলাস্ফিয়ার: দুই দশক ধরে গাজা উপত্যকার শাসনভার সামলানোর পর ক্ষমতা ছাড়ার অভিপ্রায় ঘোষণা করেছে হামাস। সোমবার সংগঠনটি জানায়, তারা গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব মার্কিন-সমর্থিত অন্তর্বর্তী সংস্থা ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব গাজা (এনসিএজি)-র হাতে তুলে দিতে প্রস্তুত। হামাসের দাবি, এই পদক্ষেপের উদ্দেশ্য গাজায় রাজনৈতিক অচলাবস্থা কাটানো, পুনর্গঠন শুরু করা এবং মানবিক ত্রাণ কার্যক্রমের পথ সুগম করা।

তবে এই ঘোষণার পরও যুদ্ধবিরতি আরও মজবুত হবে কি না, কিংবা দীর্ঘদিনের অবরোধ ও মানবিক সংকটে জর্জরিত গাজার পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই গেছে। কারণ হামাস স্পষ্ট জানিয়েছে, তারা একতরফাভাবে অস্ত্র সমর্পণ করবে না। ইজরায়েল ও আমেরিকা দীর্ঘদিন ধরেই হামাসের নিরস্ত্রীকরণকে যে কোনও রাজনৈতিক সমাধানের পূর্বশর্ত হিসেবে তুলে ধরছে।

হামাস প্রশাসনের প্রধান মোহাম্মদ আল-ফাররা নিজের পদত্যাগপত্রে জানান, গাজার সরকারি কাঠামো হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সেই কারণে তিনি প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন। তবে সরকারি কর্মচারী ও অন্যান্য বেসামরিক কর্মীরা অন্তর্বর্তী প্রশাসন দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করে যাবেন।

হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম বলেন, গাজার শাসনভার ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সংগঠনটি ইজরায়েলের সব অজুহাত দূর করতে চায়। তাঁর অভিযোগ, ইজরায়েল এখনও সামরিক অভিযান ও ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে এবং সেই পরিস্থিতির অবসান ঘটাতেই হামাস রাজনৈতিক ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হয়েছে।

তবে বাস্তবে এই ক্ষমতা হস্তান্তর কতটা সম্ভব, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ জানুয়ারিতে যুদ্ধবিরতির অংশ হিসেবে গঠিত এনসিএজি-র ১৩ সদস্য এখনও গাজায় প্রবেশের অনুমতি পাননি। ইজরায়েল তাঁদের প্রবেশে বাধা দেওয়ায় তাঁরা কায়রোতেই অবস্থান করছেন। ফলে প্রশাসনিক রদবদল আপাতত কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ।

এনসিএজি-র চেয়ারম্যান আলি শা’আত জানিয়েছেন, প্রয়োজনীয় সম্পদ ও সুযোগ-সুবিধা মিললেই তাঁদের কমিটি গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব গ্রহণে সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

অন্যদিকে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া এক প্রতিবেদনে গাজার জন্য মার্কিন নিযুক্ত উচ্চ প্রতিনিধি নিকোলাই ম্লাদেনভ শান্তি-প্রক্রিয়া স্থবির হওয়ার জন্য হামাসকেই দায়ী করেছিলেন। তবে তাঁর এই অবস্থানকে পক্ষপাতদুষ্ট বলে সমালোচনা করেছেন বহু পর্যবেক্ষক। তাঁদের অভিযোগ, ইজরায়েলের যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন, লাগাতার বিমান হামলা এবং গাজার আরও ভূখণ্ড দখলের প্রচেষ্টা নিয়ে তিনি কার্যত নীরব থেকেছেন।

মার্কিন-সমর্থিত বোর্ড অব পিস, যার অধীনে এনসিএজি কাজ করে, হামাসের ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় জানায়, তারা বিষয়টি “নোট” করেছে। তবে ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন হবে প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে নয়, বাস্তব পদক্ষেপের ওপর। একই সঙ্গে বোর্ডের বক্তব্য, গাজায় “এক কর্তৃত্ব, এক আইন এবং এক অস্ত্র” নীতি কার্যকর করতে হবে। অর্থাৎ সমস্ত অস্ত্র এনসিএজি-র নিয়ন্ত্রণে আনাই তাদের লক্ষ্য।

আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষক ম্যাক্স রোডেনবেকের মতে, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, মানবিক বিপর্যয় এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে হামাস বুঝতে পেরেছে যে, অন্তত রাজনৈতিক ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিয়ে আলোচনার পথ খুলে দেওয়া প্রয়োজন। যদিও সংগঠনটি এখনও মনে করে, ইজরায়েল গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে রাখা এবং নিয়মিত সামরিক অভিযান চালানোর পরিস্থিতিতে অস্ত্র সমর্পণ করা সম্ভব নয়।

ইউরোপীয় পররাষ্ট্র সম্পর্ক পরিষদের গবেষক মুহাম্মদ শেহাদা বলেন, হামাস আশঙ্কা করছে যে, যদি এনসিএজি কেবল ইজরায়েল-নিয়ন্ত্রিত তথাকথিত “নিউ রাফাহ” এলাকায় প্রশাসন চালায়, তবে তা কার্যত বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট ভূখণ্ডের শাসক হিসেবে চিহ্নিত হবে এবং তাদের বৈধতা প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই বৃহত্তর গাজাজুড়ে পুনর্গঠন ও প্রশাসনিক পরিবর্তনের দাবিকে সামনে রেখেই হামাস এই রাজনৈতিক পদক্ষেপ নিয়েছে।

তাঁর মতে, হামাস একতরফাভাবে নিরস্ত্রীকরণে রাজি হলেও ইজরায়েলের বর্তমান সরকার নির্বাচন না হওয়া পর্যন্ত গাজার সর্বত্র পুনর্গঠনের অনুমতি দেবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। ফলে হামাসের এই ঘোষণার পরও গাজার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং শান্তি-প্রক্রিয়ার ভাগ্য এখনও অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।