হাইলাইটস:
- ‘সেবাশ্রয়’ স্বাস্থ্য শিবিরকে ঘিরে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে নতুন অভিযোগ দায়ের।
- বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাসের অভিযোগ, চিকিৎসক পরিচয়ে চিকিৎসা করানো হয়েছে মেডিক্যাল ছাত্রদের দিয়ে।
- অনুমোদন ছাড়াই এক্স-রে ও ইসিজি যন্ত্র ব্যবহার করার অভিযোগও উঠেছে।
- জাতীয় চিকিৎসা আইন ও রাজ্যের ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট আইনের একাধিক বিধি লঙ্ঘনের দাবি।
- এর আগে দায়ের হওয়া অভিযোগের ভিত্তিতে ইতিমধ্যেই এফআইআর নথিভুক্ত করেছে পুলিশ।
- বিরোধীদের দাবি, বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে যুক্ত হওয়ায় নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি।
বাংলাস্ফিয়ার: তৃণমূল কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে গত বছর শুরু হওয়া ‘সেবাশ্রয়’ স্বাস্থ্য শিবিরকে কেন্দ্র করে বিতর্ক আরও ঘনীভূত হল। শনিবার বিজেপি নেতা অভিজিৎ দাস দ্বিতীয়বারের মতো পুলিশের দ্বারস্থ হয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এই কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে বিস্তৃত অভিযোগ দায়ের করেন। তাঁর দাবি, এই স্বাস্থ্য শিবিরগুলিতে চিকিৎসা পরিষেবার নামে এমন একাধিক কাজ হয়েছে যা শুধু আইনবিরুদ্ধই নয়, সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।
অভিজিৎ দাস দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিষ্ণুপুর থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। এই এলাকা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লোকসভা কেন্দ্র ডায়মন্ড হারবারের অন্তর্গত। অভিযোগপত্রে তিনি দাবি করেছেন, শিবিরগুলিতে সরকারি মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের চিকিৎসক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে এবং রোগীদের কাছে তাঁদের পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরিবর্তে চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের দিয়ে রোগী দেখা এবং চিকিৎসা করানো দেশের প্রচলিত চিকিৎসা বিধির পরিপন্থী।
বিজেপি নেতার অভিযোগ এখানেই শেষ নয়। তিনি আরও দাবি করেছেন, স্বাস্থ্য শিবিরে এক্স-রে এবং ইসিজি-র মতো গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও আইনগত বিধি না মেনেই। বিশেষ করে বিকিরণ নির্গতকারী যন্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা বিধি, নিবন্ধন এবং প্রযুক্তিগত মান বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। সেই সমস্ত নিয়ম মানা হয়েছে কি না, তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, এসব যন্ত্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও জাতীয় স্তরের একাধিক বিধি লঙ্ঘন করা হয়েছে।
এর আগে গত ১ জুলাই ডায়মন্ড হারবার থানায় অভিজিৎ দাস প্রথম অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ একটি প্রথম তথ্য প্রতিবেদন বা এফআইআর নথিভুক্ত করে। সেই মামলায় ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারা ছাড়াও জাতীয় চিকিৎসা কমিশন আইন এবং পশ্চিমবঙ্গ ক্লিনিক্যাল এস্টাবলিশমেন্ট আইনের বিভিন্ন বিধি প্রয়োগ করা হয়েছে বলে জানা যায়। নতুন অভিযোগের ফলে এই বিতর্ক আরও বিস্তৃত আকার নিল।
বিজেপির বক্তব্য, স্বাস্থ্য পরিষেবার মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে কোনও ধরনের রাজনৈতিক প্রচার বা জনপ্রিয়তা অর্জনের উদ্দেশ্যে আইনি বিধি উপেক্ষা করা চলতে পারে না। তাঁদের দাবি, যদি অভিযোগগুলি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়, বরং চিকিৎসা নীতির গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। কারণ রোগীর জীবন ও নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনও আপসের সুযোগ নেই।
অভিজিৎ দাসের অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য শিবিরগুলিতে রোগীদের এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে যে তাঁরা নিবন্ধিত ও অভিজ্ঞ চিকিৎসকদের কাছ থেকে চিকিৎসা পাচ্ছেন। বাস্তবে সেখানে চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা হয়ে থাকলে তা প্রতারণার সামিল বলেই তাঁর দাবি। একই সঙ্গে রোগ নির্ণয়ের জন্য ব্যবহৃত যন্ত্রগুলির বৈধ অনুমোদন, রক্ষণাবেক্ষণ এবং পরিচালনাকারীদের যোগ্যতা সম্পর্কেও তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে তিনি অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেছেন।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, কোনও ব্যক্তি নিবন্ধিত চিকিৎসক না হলে তাঁর স্বাধীনভাবে রোগী দেখা বা চিকিৎসা করার অধিকার নেই। চিকিৎসা শিক্ষার্থীরা অবশ্য প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রোগী দেখার সুযোগ পেতে পারেন, তবে তা অবশ্যই নিবন্ধিত চিকিৎসকের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এবং আইনসিদ্ধ কাঠামোর মধ্যে। একইভাবে এক্স-রে যন্ত্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট লাইসেন্স, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং প্রশিক্ষিত কর্মীর উপস্থিতি অপরিহার্য। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।
অন্যদিকে রাজনৈতিক মহলের মতে, এই অভিযোগের সময়ও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। গত কয়েক মাস ধরেই ‘সেবাশ্রয়’ কর্মসূচিকে সামনে রেখে তৃণমূল মানুষের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে। বিরোধীদের অভিযোগ, এই কর্মসূচির মাধ্যমে রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার পাশাপাশি প্রশাসনিক বিধিনিষেধ অগ্রাহ্য করা হয়েছে। যদিও তৃণমূলের পক্ষ থেকে অতীতে দাবি করা হয়েছে, স্বাস্থ্য পরিষেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য এবং সমস্ত কাজ আইন মেনেই করা হয়েছে।
বর্তমানে এই অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ কী পদক্ষেপ করে, সেটাই এখন দেখার। নতুন অভিযোগ গ্রহণ করে তদন্ত শুরু হবে কি না, নাকি আগের এফআইআরের সঙ্গে বিষয়টি যুক্ত করে একত্রে তদন্ত চালানো হবে, সেই সিদ্ধান্ত তদন্তকারী সংস্থাকেই নিতে হবে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নথি, চিকিৎসকদের নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্য, শিবিরে ব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জামের অনুমোদনপত্র এবং উপস্থিত কর্মীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হতে পারে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছে চিকিৎসা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে সেই উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আইন, চিকিৎসা নৈতিকতা এবং রোগীর নিরাপত্তা—এই তিনটি বিষয় কোনও অবস্থাতেই উপেক্ষা করা যায় না। কারণ সামান্য অবহেলাও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হতে পারে।
এই ঘটনায় রাজনৈতিক চাপানউতোর আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বিজেপি ইতিমধ্যেই নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি তুলেছে। অন্যদিকে তৃণমূল অভিযোগগুলিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দেয় কি না, সেদিকেও নজর থাকবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—‘সেবাশ্রয়’ স্বাস্থ্য শিবিরকে ঘিরে আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই এখন নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে।
এখন তদন্তের অগ্রগতি, পুলিশের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং আদালতে এই অভিযোগগুলির ভবিষ্যৎ—সবকিছুর উপরই নির্ভর করবে এই বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়। অভিযোগগুলি এখনও তদন্তাধীন। আদালত বা তদন্তকারী সংস্থা অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করেনি। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না আসা পর্যন্ত সব পক্ষের বক্তব্য ও প্রমাণ বিচার করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারিত হবে।