বাংলাস্ফিয়ার: বাংলা সমাজে নামেরও একটা আলাদা ইতিহাস আছে। একসময় সন্তান জন্মালেই বাবা-মা ভাবতেন, এ তো আমাদের নয়, এ ঈশ্বরের দান। তাই কেউ হল শিবপদ, কেউ রামপ্রসাদ, কেউ কৃষ্ণদাস, কেউ দুর্গাচরণ। আর যদি ছেলেটিকে মা কালীর চরণে সমর্পণ করতে চান, তবে নাম রাখা হল—কালিচরণ। অর্থাৎ, যে মা কালীর চরণে নিবেদিত, যে সারাজীবন দেবীর পদতলে মাথা নত করে থাকবে।

কী অপূর্ব ভাবনা! নামের মধ্যেই বিনয়, আত্মসমর্পণ আর ভক্তির সুগন্ধ। মনে হয়, এই ছেলেটি বড় হয়ে মন্দিরে ঘণ্টা বাজাবে, পাড়ার বিপদে সবার আগে ছুটে যাবে, বৃদ্ধাকে রাস্তা পার করাবে, গরিবের পাশে দাঁড়াবে। অন্তত নামটা তো তাই বলে।

কিন্তু বাংলা সমাজের এক অদ্ভুত প্রতিভা আছে। এখানে নাম আর কাজের মধ্যে এমন দূরত্ব তৈরি করা যায় যে, কলকাতা থেকে কন্যাকুমারীও লজ্জা পায়। নাম কালিচরণ, অথচ চরণ পড়ে থাকে ক্ষমতার বারান্দায়। মা কালীর পদতলে নয়, মন্ত্রীবাবুর দোরগোড়ায়। দেবীর পায়ে ফুল নয়, প্রভাবশালীর জুতোর ধুলো সংগ্রহ করাই যেন জীবনের একমাত্র সাধনা।

ছোটবেলায় নিশ্চয়ই মা বলেছিলেন, “বাবা, তোমাকে মা কালীর চরণে সঁপে দিলাম।” কিন্তু বড় হয়ে দেখা গেল, মা কালী অপেক্ষা করছেন, আর ছেলে ব্যস্ত কোন দপ্তরের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে। দেবীর প্রসাদ পরে হবে, আগে দরকার ক্ষমতার প্রসাদ। কারণ এই প্রসাদে গাড়ি আসে, বাড়ি আসে, প্রভাব আসে, আর সবথেকে বড় কথা—অদৃশ্য হওয়ার আশ্চর্য ক্ষমতা আসে। কোনও কাগজে নাম নেই, কিন্তু সব কাগজের খবর আছে। কোনও পদ নেই, কিন্তু সব পদে প্রভাব আছে। এ এক অলৌকিক সিদ্ধি।

বাংলা প্রশাসনের ইতিহাসে এমন বহু কালিচরণ জন্মেছেন, যাঁরা দেবীর চরণ ছেড়ে ক্ষমতার চরণে আশ্রয় নিয়েছেন। তাঁরা এমনভাবে মাথা নোয়ান যে, যোগব্যায়ামের শিক্ষকরাও অবাক হয়ে যান। মেরুদণ্ডের এত নমনীয়তা চিকিৎসাবিজ্ঞানের বইয়ে লেখা নেই। সকালবেলা যে নেতার জয়ধ্বনি, বিকেলে প্রয়োজনে তাঁর বিরোধীর প্রতিও একই নিষ্ঠা। চরণ বদলায়, কিন্তু চরণবন্দনা বদলায় না।

নামের সঙ্গে মানুষের চরিত্রের কোনও সম্পর্ক নেই—এ কথা সমাজ বহুবার প্রমাণ করেছে। শান্তিলাল রাগী হতে পারেন, সত্যরঞ্জন মিথ্যার কারখানা খুলতে পারেন, সুধাংশু বিষাক্ত মন্তব্য করতে পারেন। কিন্তু কালিচরণের মধ্যে একটা বাড়তি ট্র্যাজেডি আছে। কারণ এই নাম শুনলেই মনে পড়ে ভক্তির কথা। অথচ বাস্তব কখনও কখনও এমন নাটক মঞ্চস্থ করে যে, মনে হয় নামের অভিধান নতুন করে লেখা দরকার।

আজকাল নাম রাখারও এক অদ্ভুত ব্যবসা হয়েছে। কেউ ভাবেন, নাম বড় হলেই মানুষও বড় হবে। কেউ ভাবেন, দেবতার নাম রাখলে চরিত্রও দেবতার মতো হবে। বাস্তব বলছে, নামের দায় নামই বহন করে, মানুষ নয়। তাই সমাজে যত গোপাল, সবাই গরু চরায় না; যত শিবপদ, সবাই ত্যাগী নয়; আর যত কালিচরণ, সবাই যে মা কালীর চরণে মাথা রাখবেন, এমন নিশ্চয়তা কোনও পুরোহিতও দিতে পারবেন না।

আসলে মানুষের জীবনে সবচেয়ে বিপজ্জনক নেশা ক্ষমতা। মদ মানুষকে টলায়, টাকা মানুষকে বদলায়, কিন্তু ক্ষমতা মানুষকে এমনভাবে রূপান্তরিত করে যে, সে নিজের নামটাও ভুলে যায়। তখন কালিচরণ আর কালিচরণ থাকে না। তখন সে হয়ে ওঠে ‘স্যারের লোক’, ‘বিশেষ মানুষ’, ‘খুব ঘনিষ্ঠ’, ‘সব ব্যবস্থা করে দেবে’—এইসব অলৌকিক উপাধির ধারক। দেবীর আশীর্বাদের চেয়ে তখন বড় হয়ে ওঠে কোনও প্রভাবশালীর একটি ফোন।

বাংলা সমাজে আবার চরণধোয়া জলেরও এক ঐতিহ্য আছে। আগে মানুষ দেবতার চরণামৃত খেত। এখন অনেকেই ক্ষমতাবানের প্রশংসামৃত পান করেন। পার্থক্য শুধু এতটুকু—আগে মানুষ পুণ্যের আশায় মাথা নোয়াত, এখন সুবিধার আশায়। আগে ভক্তি ছিল আধ্যাত্মিক, এখন ভক্তি প্রশাসনিক। আগে প্রসাদে মিষ্টি মিলত, এখন প্রসাদে টেন্ডার, অনুমোদন, পদোন্নতি কিংবা নিরাপদ দূরত্ব।

অবশ্য সব কালিচরণ এক রকম নন। এখনও এমন বহু মানুষ আছেন, যাঁদের নামের সঙ্গে তাঁদের জীবনও মিলে যায়। তাঁরা সত্যিই বিশ্বাস করেন, মানুষের সেবা মানেই ঈশ্বরের সেবা। তাঁরা প্রচার চান না, পরিচিতি চান না, আলো চান না। তাঁদের দেখে বোঝা যায়, নাম কেবল উচ্চারণ নয়, এক ধরনের প্রতিজ্ঞাও হতে পারে। সমস্যা হল, এই মানুষগুলো খবরের কাগজের প্রথম পাতায় আসেন না। আলো পায় অন্যরা। তাই আমাদের ধারণাও বদলে যায়।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে চরিত্রের চেয়ে পরিচয় বড়, নীতির চেয়ে নেটওয়ার্ক বড়, যোগ্যতার চেয়ে যোগসূত্র বড়। ফলে কালিচরণ নামটি শুনলে অনেকের মনে প্রথমেই ভক্তির ছবি ভেসে ওঠে না। বরং মনে হয়—এই ভদ্রলোক কার চরণে আছেন? দেবীর, না ক্ষমতার? প্রশ্নটাই আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গ।

শেষ পর্যন্ত দোষ অবশ্য নামের নয়। ‘কালিচরণ’ নামটি আজও সমান পবিত্র। অপবিত্র হয় মানুষের লোভ, মানুষের উচ্চাকাঙ্ক্ষা, মানুষের বিবেকহীনতা। মা কালীর চরণে নিজেকে সমর্পণ করা কঠিন; কারণ সেখানে সত্য বলতে হয়, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়, নিজের লোভকে হত্যা করতে হয়। কিন্তু ক্ষমতার চরণে আত্মসমর্পণ করা অনেক সহজ। সেখানে শুধু মাথা নোয়াতে হয়। কখনও কখনও বিবেকটাকেও।

তাই ভবিষ্যতে কোনও বাবা যদি সন্তানের নাম কালিচরণ রাখেন, তাঁর কাছে একটি বিনীত অনুরোধ থাকবে। নাম রাখার আগে ছেলেটিকে একবার মন্দিরে নিয়ে যান। দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে বলুন, “মা, নাম শুধু যেন অভিধানে না থাকে। এই ছেলেটি যেন সত্যিই তোমার চরণে থাকে, কোনও ক্ষণস্থায়ী ক্ষমতার পায়ের কাছে নয়।” কারণ ইতিহাস বলে, ক্ষমতার চরণ ক্ষয়ে যায়, সিংহাসন বদলে যায়, পতাকা পাল্টায়, প্রভাব মুছে যায়। কিন্তু মা কালীর চরণে যে মাথা নোয়ায়, তার পরিচয় কোনও তদন্ত, কোনও মামলা, কোনও সময়ই মুছে দিতে পারে না।

এই কারণেই কালিচরণ নামটি এখনও সুন্দর। শুধু প্রার্থনা একটাই—নামের অর্থ যেন একদিন মানুষের জীবনেও ফিরে আসে। কারণ পৃথিবীতে চরণবন্দনার অভাব নেই; অভাব শুধু সঠিক চরণ চিনে নেওয়ার।