হাইলাইটস

  • সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা (ম্যামে) দফতরের বরাদ্দ ৬২ শতাংশ কমাল রাজ্য সরকার।
  • ২০২৬-২৭ বাজেটে বরাদ্দ ৫,৭১৩.৬১ কোটি টাকা থেকে কমে হয়েছে ২,১৭৫.৪৩ কোটি টাকা।
  • ঐক্যশ্রী বৃত্তি প্রকল্পে বরাদ্দ ৭৪১ কোটি টাকা থেকে কমে ২৫০ কোটি টাকা।
  • সংখ্যালঘু মহিলাদের আবাসন প্রকল্পে এবার কোনও বরাদ্দ রাখা হয়নি।
  • বিরোধীদের অভিযোগ, সংখ্যালঘু উন্নয়নকে উপেক্ষা করছে সরকার; বিজেপির দাবি, প্রকৃত শিক্ষার উপর জোর দেওয়াই লক্ষ্য।

বাংলাস্ফিয়ার: রাজ্যের ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের পূর্ণাঙ্গ বাজেটে সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা (ম্যামে) দফতরের বরাদ্দে বড়সড় কাটছাঁট করা হয়েছে। চলতি অর্থবর্ষে এই দফতরের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ২,১৭৫.৪৩ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের অন্তর্বর্তী বাজেটে নির্ধারিত ৫,৭১৩.৬১ কোটি টাকার তুলনায় প্রায় ৬২ শতাংশ কম। এর ফলে সংখ্যালঘু উন্নয়ন সংক্রান্ত একাধিক প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে, কয়েকটি প্রকল্পে আবার কোনও বরাদ্দই রাখা হয়নি।

বাজেট নথি অনুযায়ী, অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা সংখ্যালঘু পড়ুয়াদের জন্য চালু ঐক্যশ্রী বৃত্তি প্রকল্পে বরাদ্দ অর্ধেকেরও বেশি কমানো হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে যেখানে এই প্রকল্পে ৭৪১ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল, সেখানে নতুন বাজেটে তা নেমে এসেছে ২৫০ কোটিতে। ২০২৪-২৫ সালেও এই প্রকল্পে ৬০০ কোটি টাকা বরাদ্দ ছিল।

একইভাবে, দুস্থ সংখ্যালঘু মহিলাদের আবাসন নির্মাণ প্রকল্পে গত বাজেটে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও এবারের বাজেটে সেই খাতে কোনও অর্থই বরাদ্দ করা হয়নি। সংখ্যালঘুদের কল্যাণ ও উন্নয়নমূলক বিভিন্ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দও ১০৩ কোটি টাকা থেকে কমে ২১ কোটিতে নেমে এসেছে। ২০২৪-২৫ সালে এই খাতে বরাদ্দ ছিল ৮৫ কোটি টাকা।

ম্যামে দফতর দীর্ঘদিন ধরেই পূর্বতন সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দফতর ছিল। ২০২৩-২৪ সালে এই দফতরের জন্য বরাদ্দ ছিল ৫,১৬৬.৯৯ কোটি টাকা। ২০২৪-২৫ সালে তা বেড়ে হয় ৫,৫৩০.৬৬ কোটি, ২০২৫-২৬ সালে ৫,৬০২.২৯ কোটি এবং চলতি বছরের অন্তর্বর্তী বাজেটে তা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ৫,৭১৩.৬১ কোটি টাকায়। সেই ধারাবাহিকতার সম্পূর্ণ বিপরীত ছবি দেখা গেল এবারের পূর্ণাঙ্গ বাজেটে।

এই বাজেট এমন এক সময়ে এসেছে, যখন গত মাসেই রাজ্য সরকার অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) তালিকা থেকে একাধিক মুসলিম সম্প্রদায়কে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। ফলে সংখ্যালঘু নীতি নিয়ে সরকারের অবস্থান নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

মঙ্গলবার বিধানসভায় রাজ্যপালের ভাষণের ওপর আলোচনার জবাবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আগের সরকার সংখ্যালঘুদের ভুল পথে চালিত করেছে। সন্তানদের শুধু মাদ্রাসায় পাঠালেই হবে না, তাদের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সুযোগ করে দিতে হবে।” সরকারের দাবি, বরাদ্দ কমানো মানেই সংখ্যালঘুদের বঞ্চিত করা নয়; বরং উন্নয়নের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছে।

অন্যদিকে বিরোধীরা এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, বিধানসভার ভিতরে ও বাইরে এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তাঁরা জোরালো আন্দোলন করবেন। তৃণমূলের বিধায়ক কুণাল ঘোষ বলেন, বাজেটের খুঁটিনাটি বিশ্লেষণ করেই তাঁরা মন্তব্য করছেন এবং সংখ্যালঘু উন্নয়নের বরাদ্দ কমানো কোনওভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

ইন্ডিয়ান সেকুলার ফ্রন্ট-এর বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি অভিযোগ করেন, বিজেপি সরকার ধারাবাহিকভাবে সংখ্যালঘুদের প্রান্তিক করার চেষ্টা করছে। তাঁর বক্তব্য, মুসলিমদের পাশাপাশি জৈন, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ—সব সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ই এই সিদ্ধান্তের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি সরকারের কাছে এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।

আম জনতা উন্নয়ন পার্টি-র বিধায়ক হুমায়ুন কবীর বলেন, সংখ্যালঘু উন্নয়নের বরাদ্দ কমানো সমাজের সামগ্রিক অগ্রগতিকে ব্যাহত করবে এবং সরকারের ভাবমূর্তির উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সংখ্যালঘু বিষয়ক দফতরের বরাদ্দে এই ব্যাপক কাটছাঁট আগামী দিনে রাজ্যের রাজনীতিতে অন্যতম বিতর্কিত ইস্যু হয়ে উঠবে বলেই রাজনৈতিক মহলের ধারণা। একদিকে সরকার উন্নয়নের অগ্রাধিকার বদলের যুক্তি তুলে ধরছে, অন্যদিকে বিরোধীরা এটিকে সংখ্যালঘু কল্যাণে প্রত্যক্ষ আঘাত বলে দাবি করছে। ফলে বাজেট অধিবেশনের বাকি সময় এই ইস্যুতে উত্তপ্ত বিতর্ক চলার সম্ভাবনা প্রবল।