হাইলাইটস
- ইরান-আমেরিকা-ইজরায়েল সংঘাত উপসাগরীয় দেশগুলির দীর্ঘদিনের নিরাপত্তাবোধ ভেঙে দিয়েছে।
- উপসাগরের মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলিই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
- যুদ্ধের অভিঘাতে জ্বালানি রপ্তানি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগে বড় ধাক্কা লাগে।
- যুদ্ধবিরতি হলেও ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি; ইরানের সামরিক সক্ষমতা এখনও বড় চিন্তার কারণ।
- উপসাগরীয় দেশগুলি এখন প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো, বিকল্প বাণিজ্যপথ গড়া এবং ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংলাপের পথও খোলা রাখছে।
বাংলাস্ফিয়ার: দশকের পর দশক ধরে উপসাগরীয় ধনী আরব দেশগুলির মানুষ যুদ্ধকে দূর থেকে দেখেছে। ইয়েমেন, সিরিয়া, গাজা কিংবা ইরাকে যুদ্ধ হয়েছে, কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরিন, কুয়েত বা সৌদি আরব নিজেদের তুলনামূলক নিরাপদ বলেই মনে করত। সেই ধারণা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে সাম্প্রতিক আমেরিকা-ইজরায়েল-ইরান সংঘাত। প্রথমবারের মতো যুদ্ধের অভিঘাত সরাসরি এসে পৌঁছেছে উপসাগরের ঝাঁ-চকচকে শহরগুলিতে।
যুদ্ধ শেষ হয়েছে বলে আপাতত মনে হলেও উপসাগরের রাজনৈতিক ও কৌশলগত মানচিত্র আর আগের জায়গায় নেই। নিরাপত্তা, অর্থনীতি, জ্বালানি এবং কূটনীতি—প্রতিটি ক্ষেত্রেই নতুন হিসাব-নিকাশ শুরু হয়েছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে নিরাপত্তা ধারণায়। এতদিন উপসাগরীয় দেশগুলি বিশ্বাস করত, তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি সম্ভাব্য আক্রমণের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করবে। কিন্তু যুদ্ধ দেখিয়ে দিল, এই ঘাঁটিগুলিই ইরানের কাছে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠতে পারে। হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কা গোটা অঞ্চলকে আতঙ্কিত করে তোলে।
যুদ্ধ চলাকালীন দুবাই, দোহা ও অন্যান্য শহরে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা আগে অকল্পনীয় ছিল। মোবাইল ফোনে ক্ষেপণাস্ত্র সতর্কবার্তা বাজছে, পরিবারগুলি নিরাপদ আশ্রয়ে ছুটছে, বিলাসবহুল বহুতলের পাশে বিস্ফোরণের ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। বহু স্কুল সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হয় এবং বিদেশি ধনী বাসিন্দাদের একাংশ দেশ ছেড়ে চলে যান। অনেকের কাছে এই পরিস্থিতি ১৯৯০ সালে ইরাকের কুয়েত দখলের স্মৃতি ফিরিয়ে আনে।
যদিও অধিকাংশ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিরোধ করা সম্ভব হয়েছিল, তবুও প্রাণহানি ও সম্পত্তির ক্ষতি পুরো অঞ্চলকে নাড়া দেয়। যুদ্ধ দেখিয়ে দিয়েছে যে উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকলেও সম্পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না।
এই অভিজ্ঞতার পর উপসাগরীয় দেশগুলির অগ্রাধিকার বদলে যাচ্ছে। গত এক দশকে যেখানে ভবিষ্যতের নগর, পর্যটন, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকেন্দ্র গড়ার ওপর জোর ছিল, এখন সেখানে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো এবং সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। নিরাপত্তাকে আর কেবল মার্কিন ছাতার ওপর নির্ভর করে ছেড়ে রাখতে রাজি নয় তারা।
তবে যুদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলিকে এক মঞ্চে আনতে পারেনি। বরং প্রত্যেক দেশ নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী আলাদা কৌশল নিচ্ছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার পথেই হাঁটছে। কাতার আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয়। সৌদি আরব একদিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে, অন্যদিকে তেহরানের সঙ্গেও সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। ওমান আবার ইরানের সঙ্গে প্রণালী ব্যবহারের নানা বিষয়ে আলোচনা করে মার্কিন অসন্তোষের মুখে পড়েছে।
সবচেয়ে বড় কৌশলগত অভিঘাত এসেছে হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে। এই জলপথ দিয়েই বিশ্বের উল্লেখযোগ্য অংশের তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয়। যুদ্ধের সময় ইরান কার্যত এই পথ অচল করে দেওয়ার ক্ষমতা দেখিয়েছে। ফলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের পদক্ষেপের আশঙ্কা থেকে যাচ্ছে।
এই কারণেই উপসাগরীয় দেশগুলি বিকল্প ব্যবস্থা তৈরিতে নেমেছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত প্রণালীর বাইরে নতুন বন্দর, পাইপলাইন ও রেলপথ গড়ে তুলছে, যাতে হরমুজের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। অন্যদিকে আরব সাগরমুখী ওমান দ্রুত একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন ও সরবরাহকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে। স্থলপথে পণ্য পরিবহনের নতুন রুট তৈরির কাজও জোরদার হয়েছে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও যুদ্ধ গভীর প্রভাব ফেলেছে। উপসাগরের অর্থনীতি তেল-গ্যাস রপ্তানি, বৈদেশিক বিনিয়োগ, পর্যটন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। যুদ্ধের ফলে বাজারে অনিশ্চয়তা বেড়েছে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে এবং বিনিয়োগকারীদের আস্থা ধাক্কা খেয়েছে। ভবিষ্যতে সংঘাত আবার শুরু হলে এই ক্ষতি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
যুদ্ধ-পরবর্তী কূটনীতিও নতুন প্রশ্ন তুলেছে। উপসাগরীয় দেশগুলির অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যে সমঝোতা গড়ে উঠছে, সেখানে তাদের নিরাপত্তা উদ্বেগ যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। বিশেষ করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি, ড্রোন সক্ষমতা এবং আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলিকে সমর্থনের বিষয়গুলি আলোচনার কেন্দ্রে নেই।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী Marco Rubio কুয়েত, বাহরিন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সফর করে আশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র এমন কোনও চুক্তি করবে না যা তার মিত্রদের নিরাপত্তাকে দুর্বল করে। পাশাপাশি তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ইরান-সংক্রান্ত ভবিষ্যৎ আলোচনায় উপসাগরীয় দেশগুলির মতামত গুরুত্ব পাবে।
তবুও সংশয় কাটেনি। কারণ যুদ্ধের পর ইরানের সরকার টিকে গেছে এবং প্রমাণ করেছে যে, হরমুজ প্রণালীকে চাপের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সক্ষমতা তাদের রয়েছে। এই বাস্তবতা উপসাগরীয় দেশগুলিকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা কেবল বাইরের শক্তির ওপর নির্ভর করে নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। তাই উপসাগরীয় দেশগুলির একাংশ এখন ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ, এমনকি সম্ভাব্য অনাক্রমণ চুক্তির সম্ভাবনাও বিবেচনা করছে। সংঘাত এড়িয়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখাই তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠছে।
সর্বোপরি, এই যুদ্ধ উপসাগরীয় বিশ্বের মানসিকতায় এক স্থায়ী পরিবর্তন এনে দিয়েছে। একসময়ের নিরাপদ ও দূরবর্তী যুদ্ধদর্শক অঞ্চল এখন নিজেই সংঘাতের সম্ভাব্য কেন্দ্র। তাই উন্নয়নের পাশাপাশি নিরাপত্তা, বিকল্প বাণিজ্যপথ, সামরিক প্রস্তুতি এবং বহুমুখী কূটনীতিই আগামী দিনের উপসাগরীয় নীতির মূল ভিত্তি হয়ে উঠতে চলেছে। যুদ্ধ শেষ হলেও তার রেখে যাওয়া অনিশ্চয়তা ও সতর্কতার ছায়া দীর্ঘদিন ধরে এই অঞ্চলকে প্রভাবিত করবে।