Table of Contents
হাইলাইটস
- ফ্রান্সে রেকর্ড ৪৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, ১৯৪৭ সালের পর সর্বোচ্চ।
- ১৮ জুনের পর থেকে নজরদারিবিহীন জলাশয়ে সাঁতার কাটতে গিয়ে ৪০ জনের মৃত্যু।
- দেশের ৫৪টি বিভাগে জারি হয়েছে সর্বোচ্চ ‘রেড হিট অ্যালার্ট’।
- আইফেল টাওয়ার ও লুভর জাদুঘর তাপপ্রবাহের কারণে সময়ের আগেই বন্ধ।
- পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি চুল্লি নিরাপত্তার কারণে বন্ধ করতে হয়েছে।
- স্পেন, ইতালি, জার্মানি ও ব্রিটেনেও তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত।
ফ্রান্সে ইতিহাসের উষ্ণতম দিন
ফ্রান্সে তীব্র তাপপ্রবাহ নতুন রেকর্ড গড়েছে। মঙ্গলবার দেশটি ১৯৪৭ সালে আবহাওয়ার পরিমাপ শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে উষ্ণ দিন প্রত্যক্ষ করেছে। জাতীয় আবহাওয়া দপ্তর মেতেও-ফ্রান্স জানিয়েছে, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পিসো শহরে তাপমাত্রা পৌঁছেছে ৪৪.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। বোর্দো শহরেও রেকর্ড ৪২.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা নথিভুক্ত হয়েছে।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকোর্নু একে “ব্যতিক্রমী তীব্রতার আবহাওয়া-পর্ব” বলে বর্ণনা করেছেন। তাঁর কথায়, প্রতিদিন ও প্রতি রাতেই স্থানীয় ও জাতীয় তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যাচ্ছে।
ডুবে মৃত্যু ৪০ জনের
অসহনীয় গরম থেকে মুক্তি পেতে বহু মানুষ নদী, হ্রদ ও অন্যান্য জলাশয়ে নামছেন। কিন্তু নিরাপত্তাহীন ও নজরদারিবিহীন এলাকায় সাঁতার কাটতে গিয়ে ১৮ জুনের পর থেকে অন্তত ৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই তরুণ।
সরকার এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে উল্লেখ করেছে এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় জরুরি বৈঠক ডেকেছে।
রাজধানী প্যারিসেও চরম অবস্থা
তাপপ্রবাহের অভিঘাত পড়েছে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্রগুলিতেও। বিশ্বের অন্যতম দর্শনীয় স্থাপনা আইফেল টাওয়ার মঙ্গলবার বিকেল ৪টাতেই বন্ধ করে দেওয়া হয়, যা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় আট ঘণ্টারও বেশি আগে।
অন্যদিকে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীসমৃদ্ধ জাদুঘর লুভর ঘোষণা করেছে, বুধবার থেকে শনিবার পর্যন্ত প্রতিদিন নির্ধারিত সময়ের দুই ঘণ্টা আগে বন্ধ হবে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঐতিহাসিক ভবনটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।
পরিবহণ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চাপ
প্যারিস ও তার আশপাশের অঞ্চলে প্রশাসন নাগরিকদের যতটা সম্ভব বাড়ি থেকে কাজ করার পরামর্শ দিয়েছে। রেলপথেও যাত্রীদের অপ্রয়োজনীয় ভ্রমণ এড়িয়ে চলতে বলা হয়েছে।
ইল-দ্য-ফ্রঁস অঞ্চলের প্রধান ভ্যালেরি পেক্রেস জানিয়েছেন, ৫০ ডিগ্রির বেশি তাপমাত্রা রেললাইনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে দক্ষিণ-পশ্চিম ফ্রান্সের গলফেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে একটি চুল্লি বন্ধ করে দিতে হয়েছে। কারণ নিকটবর্তী নদী থেকে আনা শীতলীকরণ জল ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিরাপদ সীমা অতিক্রম করেছিল।
স্কুল বন্ধ, শিশু মৃত্যুর আশঙ্কা
প্রচণ্ড গরমের কারণে সোমবার প্রায় ১,৩৫০টি স্কুল বন্ধ রাখতে হয়েছিল। পাশাপাশি, দুটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও এই তাপপ্রবাহের সঙ্গে যুক্ত বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। তারা পারিবারিক গাড়ির ভিতরে আটকে ছিল বলে জানা গেছে।
আবহাওয়াবিদদের পূর্বাভাস, সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে। আরও কিছু জায়গায় বছরের যেকোনো সময়ের আগের সমস্ত তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে।
কেন এত গরম?
লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের জলবায়ুবিজ্ঞানী ক্লেয়ার বার্নসের মতে, সাহারা মরুভূমি থেকে উঠে আসা বিশাল উষ্ণ বায়ুস্তর ইউরোপের ওপর স্থির হয়ে রয়েছে। এর ফলে উত্তর আফ্রিকার গরম বাতাস সরাসরি ইউরোপে প্রবেশ করছে।
এই উষ্ণ বায়ুর স্তর খুব ধীরগতিতে সরে যাচ্ছে। ফলে বাতাস বা শীতল হাওয়ার প্রবাহ তৈরি হচ্ছে না, যা সাধারণত তাপপ্রবাহ থেকে কিছুটা স্বস্তি দেয়।
গোটা ইউরোপে তাপের থাবা
ফ্রান্সের পাশাপাশি ইতালি, স্পেন, জার্মানি ও ব্রিটেনও ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মুখে পড়েছে।
ইতালিতে মিলান ও রোম-সহ ১৫টি শহরে ‘রেড অ্যালার্ট’ জারি হয়েছে। অতিরিক্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ব্যবহারের কারণে মিলান ও তুরিনে বিদ্যুৎ বিভ্রাটও দেখা দিয়েছে। পারমার হাসপাতালগুলোতে তিন দিনে এক হাজারের বেশি মানুষ তাপজনিত সমস্যায় ভর্তি হয়েছেন।
জার্মানিতে সপ্তাহান্তে সাঁতার কাটতে গিয়ে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
স্পেনে প্রায় গোটা দেশই তাপপ্রবাহ সতর্কতার আওতায়। সোমবার দেশটির ৮২৮টি আবহাওয়া কেন্দ্রের মধ্যে ১০১টিতে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি বা তার বেশি রেকর্ড করা হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের আলমেরিয়ায় টানা তিন রাত তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রির নিচে নামেনি।
জলবায়ু সংকটের সতর্কবার্তা
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস লন্ডন ক্লাইমেট অ্যাকশন উইকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সতর্ক করে বলেন, জলবায়ু সংকট পৃথিবীকে আরও উচ্চ তাপমাত্রা ও বিপজ্জনক মোড়ের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। তাঁর মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো ছাড়া এই ধরনের চরম আবহাওয়ার ঘটনা ভবিষ্যতে আরও ঘন ঘন ও আরও ভয়াবহ হয়ে উঠবে।
উপসংহার
ইউরোপের বর্তমান তাপপ্রবাহ কেবল একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের এক স্পষ্ট উদাহরণ। ফ্রান্সে রেকর্ড তাপমাত্রা, ডুবে মৃত্যুর মিছিল, পর্যটনকেন্দ্র ও অবকাঠামোর ওপর চাপ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে ভবিষ্যতের ইউরোপকে আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র গরমের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।