Home দৃষ্টিভঙ্গিসুমন নামা ১২৫ ফুটের বাঙালি, ৫৯৭ ফুটের গুজরাতি

১২৫ ফুটের বাঙালি, ৫৯৭ ফুটের গুজরাতি

Authored By সুমন চট্টোপাধ্যায়
316 views 5 minutes read
A+A-
Reset

সুমন চট্টোপাধ‍্যায়: খবরটা পড়ে প্রথমে আমি ভেবেছিলাম নিশ্চয়ই কোথাও একটা শূন্য বাদ পড়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকার শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবর্ষ উপলক্ষে তাঁর ১২৫ ফুট উঁচু মূর্তি তৈরি করবে।আমি খবরটা দ্বিতীয়বার পড়লাম। তারপর তৃতীয়বার।

তারপর চশমা খুলে কাচ মুছলাম। না, ভুল পড়িনি। ১২৫ বছর, তাই ১২৫ ফুট।

অঙ্ক মিলে যাচ্ছে। কিন্তু রাজনীতি? আত্মমর্যাদা? প্রতীকী শক্তি? সেগুলো কোথায় গেল?

আমার আপত্তি শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি নিয়ে নয়। বাংলার ইতিহাসে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। শিক্ষাবিদ, রাজনীতিক, মন্ত্রী, বিরোধী কণ্ঠ—সব মিলিয়ে এক বিশাল ব্যক্তিত্ব। তাঁর স্মরণে মূর্তি হতেই পারে, স্মারক হতেই পারে, গবেষণা কেন্দ্র হতেই পারে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, যখন একটা ঐতিহাসিক সুযোগ সামনে এল, তখন বাঙালি আবার কেন বড় করে ভাবতে পারলনা?

বিশ্বের সর্বোচ্চ মূর্তির তালিকার দিকে একবার তাকান। সর্দার প্যাটেল ৫৯৭ ফুট। পাঁচশো সাতানব্বই, যার কেতাবী  নাম  ‘স্ট্যাচু অব ইউনিটি’, মানে ১৮২ মিটার। তার পরে রয়েছে চীনের Sস্প্রিং টেম্পল বুদ্ধ (১২৮ মিটার), জাপানের উশিকু দাইবৎসু (১২০ মিটার) প্রভৃতি। এদের পাশে ১২৫ ফিট মানে মাত্র ৩৭ মিটার কোনও হিসেবের মধ‍্যে পড়তে পারে? শ‍্যামাপ্রসাদকে কেমন বামন-বামন মনে হবেনা?

সর্দার প‍্যাটেলের মূর্তি এতটাই উঁচু যে নিচে দাঁড়ালে মানুষের নিজের রাজনৈতিক মতাদর্শও ছোট হয়ে যায়। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, গুজরাত নিজেই যেন উঠে দাঁড়িয়েছে।

গুজরাতিরা একটা বার্তা দিয়েছিল—ভারত রাষ্ট্রের কাহিনিতে আমরা আমাদের নায়ককে এই উচ্চতায় দেখতে চাই। আপনি পছন্দ করুন বা না করুন, বার্তাটা স্পষ্ট ছিল। ওটা শুধু পাথর, লোহা আর কংক্রিট ছিল না। ওটা ছিল রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের কংক্রিট রূপ।

আর আমরা? আমরা হিসাব করলাম—জন্মবার্ষিকী ১২৫, অতএব মূর্তিও ১২৫। অর্থাৎ কল্পনার দৌড় শেষ হয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অঙ্ক বইয়ের শেষ পাতায়।

আমি তো ভেবেছিলাম বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসে অন্তত একবার বলবেন—বাংলা কারও থেকে ছোট নয়। আমি ভেবেছিলাম মুখ্যমন্ত্রী একদিন সচিবালয়ে ঢুকে টেবিলে পাঞ্জা ঠুকে বলবেন, হাম কিসিসে কম নেহি! বলবেন, “দেখুন, গুজরাত ৫৯৭ করেছে? ঠিক আছে। আমরা ৬০১ করব। এক ফুট হলেও বেশি করব।”

রাজনীতিতে অনেক সময় এক ফুটই ইতিহাস বদলে দেয়। ক্রিকেটে এক রান। ফুটবলে এক গোল। নির্বাচনে এক আসন। আর স্মৃতিস্তম্ভের জগতে এক ফুট।

কিন্তু না।বাঙালি আবার ভদ্র রইল। বাঙালি আবার নম্র রইল। বাঙালি আবার প্রমাণ করল, সে প্রতিযোগিতায় নামলেও জেতার জন্য নামে না, অংশগ্রহণের জন্য নামে।

এই রোগ নতুন নয়। এ রোগের ইতিহাস দীর্ঘ। অনেকেই বলেন, বাঙালির রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসে প্রথম বড় ধাক্কা লেগেছিল ১৯৩৯ সালে। সুভাষচন্দ্র বসু কংগ্রেস সভাপতি নির্বাচিত হলেন। আবার বলি নির্বাচিত। কারও দয়ায় নয়। ভোটে জিতে। তারপর? এক’চতুর গুজরাতি বানিয়া’ এমন প‍্যাঁচ কষলেন, সুভাষ ওয়ার্কিং কমিটি গঠন করতে পারলেননা, আত্মসম্মান থাকছেনা দেখে কংগ্রেসটাই ছেড়ে দিলেন। সেবারও বাঙালিকে অন‍্যায় হার স্বীকার করতে হয়েছিল একজন স্বনামধন‍্য গুজরাতের কাছেই।

ইতিহাসবিদরা নানা ব্যাখ্যা দেন। আদর্শগত দ্বন্দ্ব। সাংগঠনিক বিরোধ।কৌশলগত মতভেদ।সব ঠিক। কিন্তু সাধারণ বাঙালির মনে যে অনুভূতি তৈরি হয়েছিল, তা অনেক সহজ। তাদের মনে হয়েছিল, দিল্লির রাজনীতিতে বাঙালির জয় বেশিক্ষণ সহ্য করা হয়নি।সেই ক্ষত আজও পুরো শুকোয়নি।

তারপর স্বাধীন ভারত। প্রধানমন্ত্রী উত্তরপ্রদেশ থেকে। শক্তির কেন্দ্র দিল্লি। অর্থনৈতিক শক্তি পশ্চিম ভারতে। শিল্পের নেতৃত্ব অন্যত্র।বাঙালি ধীরে ধীরে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরে গিয়ে পরিণত হল দর্শকে।

আমরা বক্তৃতা লিখলাম। অন্যরা ক্ষমতা চালাল। আমরা সম্পাদকীয় লিখলাম।অন্যরা বাজেট লিখল। আমরা বিতর্ক করলাম। অন্যরা সিদ্ধান্ত নিল।

এই দীর্ঘ ইতিহাসের পরে যদি কোনও সরকার বাংলার এক ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে কেন্দ্র করে বিশাল এক প্রতীক নির্মাণ করতে চাইত, তাহলে সেটাকে আমি স্বাভাবিক বলতাম। বরং দেরিতে হলেও প্রয়োজনীয় বলতাম।

তাই বলে ১২৫ ফুট?

এটা শুনে আমার মনে হল, বাঙালির আত্মসম্মানেরও যেন একটা সরকারি উচ্চতা নির্ধারিত হয়েছে। ১২৫ ফুটের বেশি নয়। তার বেশি গেলে নাকি অহঙ্কার হয়ে যাবে। গুজরাত করলে আত্মবিশ্বাস। বাংলা করলে অপচয়। গুজরাত করলে জাতীয় গর্ব।বাংলা করলে বাড়াবাড়ি।এই মানসিকতা থেকেই তো বাঙালির যাবতীয় সমস্যা।

ভাবুন তো, যদি ঘোষণা হত—গঙ্গার ধারে ৭০০ ফুটের শ্যামাপ্রসাদ। দেশজুড়ে কী হইচই পড়ে যেত! টেলিভিশনের পর্দা সেই গগন-ছোঁয়া মূর্তির দিক থেকে ক‍্যামেরা সরাতেই পারতনা।সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠত। বিরোধীরা সমালোচনা করত। সমর্থকেরা উল্লাস করত।অর্থনীতিবিদরা হিসাব কষতেন। স্থপতিরা নকশা আঁকতেন।অর্থাৎ আলোচনা হত।রাজনীতিতে দৃশ্যমানতা নিজেই এক ধরনের শক্তি। যে জাতি দৃশ্যমান নয়, সে ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায়।

গুজরাতিরা এটা বোঝে।তামিলরা বোঝে। মারাঠিরা বোঝে। পাঞ্জাবিরাও বোঝে। বাঙালি জেনেশুনে তবু ভুলে থাকে, দিবস কেটে যায় বৃথা হয়ে। আমরা এখনও মনে করি, যুক্তি দিলেই সবাই মেনে নেবে। বাস্তব পৃথিবী এত সরল নয়। বাস্তব পৃথিবীতে দৃশ্য, প্রতীক, আবেগ—সবকিছুরই দাম আছে।

তাই আমি অবাক হই। একটা বিজেপি সরকার, যারা প্রতীকী রাজনীতির গুরুত্ব সবচেয়ে ভালো বোঝে, তারাই কেন এমন নিরাপদ সিদ্ধান্ত নিল? নাকি তারাও ভেবেছে, বাঙালিকে খুব বেশি বড় স্বপ্ন দেখানো ঠিক নয়?কারণ বাঙালি বড় স্বপ্ন দেখতে শুরু করলে সে প্রশ্নও করতে শুরু করে। তখন সে জানতে চাইবে, কেন তার ইংরেজ বিদেশ নেওয়ার পরে কেন দেশের রাজধানী কলকাতাতেই ফিরিয়ে আনা হোলনা?  কেন সে শিল্প হারা হোল? কেন তার জনসংখ্যার তুলনায় প্রভাব এতটা কমে গেল? কেন তার নায়কদের জাতীয় স্মৃতিতে প্রাপ্য জায়গা নেই?

এই প্রশ্নগুলো অস্বস্তিকর।তাই হয়তো ১২৫ ফুটই নিরাপদ। এতে সবাই খুশি। সরকার বলবে, আমরা সম্মান জানিয়েছি। বিরোধীরা বলবে, অপচয় হয়েছে।সংবাদমাধ্যম দু’দিন আলোচনা করবে।তারপর নতুন খবর চলে আসবে।

কিন্তু যদি সত্যিই বিশাল কিছু হতো? তাহলে সেটি ইতিহাসের অংশ হয়ে যেত। আজ আমরা স্ট্যাচু অব ইউনিটির উচ্চতা জানি। কারণ সেটি শুধু মূর্তি নয়, একটি রাজনৈতিক ঘোষণা। পঞ্চাশ বছর পরে কেউ কি ১২৫ ফুটের শ্যামাপ্রসাদের উচ্চতা মনে রাখবে? ঘোরতর সন্দেহ আছে।  ৭০০ ফুট হলে?সবাই মনে রাখত।

রাজনীতির নিষ্ঠুর নিয়ম হল—যা বিশাল, সেটাই স্মৃতিতে বেঁচে থাকে। যা মাঝারি, তা প্রায়শই ফাইলের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়ে। অবশ্য বাঙালির একটা বিশেষ প্রতিভা আছে। আমরা ছোট জিনিসকে বড় করে আলোচনা করতে পারি। এবং বড় সুযোগকে ছোট করেও ফেলতে পারি।এই দুই ক্ষেত্রেই আমাদের দক্ষতা অসাধারণ।

তাই হয়তো শেষ পর্যন্ত ১২৫ ফুটই হবে। উদ্বোধন হবে। মালা পড়বে। ভাষণ হবে।আতশবাজি ফুটবে। স্মারক ডাকটিকিট বেরোবে। কয়েকটি গবেষণা সেমিনার হবে।তারপর ধীরে ধীরে মূর্তির তলায় দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলতে হবে যা কবুতর যা।

আর আমি দূরে দাঁড়িয়ে ভাবব আহা, কী সুযোগটাই না ছিল! একবারের জন্য বাংলা বলতে পারত, “দেখো, আমরা এখনও ছোট হইনি।” কিন্তু আমরা আবারও ভদ্র হলাম।আবারও সংযত হলাম। আবারও পরিমিত হলাম।আর ইতিহাস সাক্ষী, বাঙালি যখনই অতিরিক্ত পরিমিত হয়েছে, তখনই অন্য কেউ এসে তার হয়ে উচ্চতার মাপ ঠিক করে দিয়েছে।

এই কারণেই আমার দুঃখ মূর্তির উচ্চতা নিয়ে নয়। আমার দুঃখ কল্পনার উচ্চতা নিয়ে।শ্যামাপ্রসাদের মূর্তি ১২৫ ফুট হোক, ২৫০ ফুট হোক বা ৭০০ ফুট—সেটা শেষ পর্যন্ত প্রকৌশলের বিষয়। কিন্তু বাংলার রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাস যদি এখনও ১২৫ ফুটেই আটকে থাকে, সেটাই আসল চিন্তার বিষয়।

কারণ জাতির উচ্চতা শেষ পর্যন্ত মূর্তির উচ্চতায় নয়, নিজের সম্পর্কে তার ধারণার উচ্চতায় মাপা হয়।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles