হাইলাইটস:

  • খীর ভবানী মন্দিরে বার্ষিক মেলায় যোগ দিতে বিপুল সংখ্যায় কাশ্মীরি পণ্ডিতদের সমাগম
  • স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের পক্ষ থেকে উষ্ণ অভ্যর্থনা ও সহায়তা
  • বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক নেতাদের উপস্থিতিতে সম্প্রীতির বার্তা
  • উপত্যকায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি ও পুনর্মিলনের প্রতীক হয়ে উঠল এই উৎসব
  • বাস্তুচ্যুত পণ্ডিত সম্প্রদায়ের অনেকেই ফেরার আশা ও আবেগের কথা জানালেন

বাংলাস্ফিয়ার: কাশ্মীরের ইতিহাসে খীর ভবানী মেলা শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, বরং এটি স্মৃতি, বেদনা, বিচ্ছেদ এবং পুনর্মিলনের এক গভীর প্রতীক। এ বছরের মেলায় সেই আবেগ আরও একবার স্পষ্ট হয়ে উঠল, যখন বহু কাশ্মীরি পণ্ডিত দীর্ঘদিন পর উপত্যকায় ফিরে এসে খীর ভবানী দেবীর আরাধনায় অংশ নিলেন। তাঁদের স্বাগত জানাতে এগিয়ে এলেন স্থানীয় বাসিন্দারা, রাজনৈতিক নেতারা এবং প্রশাসনের প্রতিনিধিরা। ফলে এই মেলা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ থাকল না; এটি কাশ্মীরে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের এক গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করল।

গান্দেরবলের তুলমূল্লা এলাকায় অবস্থিত খীর ভবানী মন্দির কাশ্মীরি পণ্ডিতদের অন্যতম শ্রদ্ধার তীর্থস্থান। দেবী রাগন্যার উদ্দেশে নিবেদিত এই মন্দিরে প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ অষ্টমীতে বিশেষ মেলার আয়োজন হয়। কাশ্মীরি পণ্ডিতদের বিশ্বাস, দেবী তাঁদের রক্ষা করেন এবং সমাজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংকেত দেন। তাই এই মেলাকে ঘিরে তাঁদের আবেগ ও ধর্মীয় গুরুত্ব অত্যন্ত গভীর।

১৯৯০-এর দশকে সন্ত্রাসবাদ এবং অশান্তির কারণে লক্ষাধিক কাশ্মীরি পণ্ডিত উপত্যকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। সেই সময় থেকে খীর ভবানী মেলা তাঁদের কাছে হারিয়ে যাওয়া বাড়ি, শৈশব ও পরিচয়ের স্মৃতি বহন করে। ফলে প্রতিবছর এই মেলায় যোগ দেওয়া অনেকের কাছে শুধুমাত্র ধর্মীয় কর্তব্য নয়, বরং নিজের শিকড়ের সঙ্গে পুনরায় সংযোগ স্থাপনের এক সুযোগ।

এবারও জম্মু, দিল্লি, পুনে, মুম্বইসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু কাশ্মীরি পণ্ডিত উপত্যকায় পৌঁছান। মন্দির প্রাঙ্গণে তাঁদের মধ্যে ছিল আবেগঘন পুনর্মিলনের দৃশ্য। অনেকে বহু বছর পর নিজেদের পুরনো প্রতিবেশী বা পরিচিতদের সঙ্গে দেখা করেন। কারও চোখে জল, কারও মুখে হাসি—সব মিলিয়ে এক বিশেষ আবহ তৈরি হয়।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল স্থানীয় মুসলিম বাসিন্দাদের অংশগ্রহণ। বহু এলাকায় তাঁরা আগত তীর্থযাত্রীদের স্বাগত জানান, তাঁদের জন্য জল, খাবার ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করেন। স্থানীয়দের বক্তব্য, কাশ্মীরের সংস্কৃতি বহু শতাব্দী ধরে সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাই কাশ্মীরি পণ্ডিতদের আগমন তাঁদের কাছেও আনন্দের বিষয়।

রাজনৈতিক নেতৃত্বও এই উপলক্ষকে সম্প্রীতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিভিন্ন দলের নেতারা মন্দিরে উপস্থিত হয়ে শান্তি, ভ্রাতৃত্ব এবং কাশ্মীরের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করান। তাঁদের মতে, কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ এমন এক সমাজ গঠনের মধ্যেই নিহিত, যেখানে সব সম্প্রদায় নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারে।

প্রশাসনের পক্ষ থেকেও ব্যাপক নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। হাজার হাজার ভক্তের উপস্থিতি সত্ত্বেও মেলা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হয়েছে। যাত্রীদের যাতায়াত, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এর ফলে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

তবে উৎসবের আবহের মধ্যেও বাস্তুচ্যুত কাশ্মীরি পণ্ডিতদের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ ও দাবি সামনে এসেছে। তাঁদের অনেকেই বলেছেন, শুধুমাত্র উৎসবের সময় নয়, সারা বছর নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কর্মসংস্থান, আবাসন এবং নিরাপত্তার মতো বিষয়গুলির স্থায়ী সমাধান ছাড়া বৃহৎ আকারে প্রত্যাবর্তন সম্ভব নয়।

তবুও খীর ভবানী মেলার দৃশ্য অনেকের কাছে আশাবাদের কারণ। কারণ কয়েক দশকের বিচ্ছেদ ও অবিশ্বাসের পরও মানুষ যদি একে অপরকে স্বাগত জানাতে পারে, তবে পুনর্মিলনের সম্ভাবনাও উজ্জ্বল থাকে। মন্দির প্রাঙ্গণে ভক্তদের প্রার্থনা, স্থানীয়দের আন্তরিকতা এবং নেতাদের সম্প্রীতির বার্তা যেন সেই সম্ভাবনাকেই আরও শক্তিশালী করেছে।

কাশ্মীরের জটিল রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে খীর ভবানী মেলা আবারও প্রমাণ করল যে ধর্মীয় উৎসব কখনও কখনও সমাজকে একত্রিত করার শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে। বহু কাশ্মীরি পণ্ডিতের কাছে এই সফর ছিল অতীতের ক্ষতকে স্মরণ করার পাশাপাশি ভবিষ্যতের আশাকে বাঁচিয়ে রাখার এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। আর সেই কারণেই এ বছরের খীর ভবানী মেলা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং কাশ্মীরের পুনর্মিলনের গল্পে এক তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।