হাইলাইটস:

  • সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের জন্য ২০ শতাংশ ডিএ বৃদ্ধি
  • অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ₹৩৬,০০০ কোটি বরাদ্দ
  • উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান কর্মসূচিতে ₹৪০,০০০ কোটি টাকার বিশেষ প্যাকেজ
  • শিল্পায়ন, অবকাঠামো ও বিনিয়োগে জোর
  • উত্তরবঙ্গের জন্য বিশেষ উন্নয়ন পরিকল্পনা
  • নতুন নিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির রূপরেখা
  • ঋণের বোঝা কমানো ও রাজস্ব বৃদ্ধিতে গুরুত্ব

বাংলাস্ফিয়ার: পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকারের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট রবিবার বিধানসভায় পেশ করলেন অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাজ্যের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আর্থিক নীতিপত্র হিসেবে এই বাজেটের দিকে নজর ছিল প্রশাসন, শিল্পমহল, সরকারি কর্মচারী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের। বাজেট বক্তৃতায় সরকার স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—কল্যাণমূলক কর্মসূচি বজায় রেখেই শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়নের পথে এগোতে চায় তারা।

সবচেয়ে বেশি আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে সরকারি কর্মচারীদের জন্য ২০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) বৃদ্ধির ঘোষণা। দীর্ঘদিন ধরে ডিএ নিয়ে আন্দোলন, আদালত-পর্ব এবং রাজনৈতিক বিতর্কের পর এই ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যের লক্ষাধিক কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের কাছে বড় স্বস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। সরকারের দাবি, কেন্দ্রীয় হারের সঙ্গে ব্যবধান কমানোর লক্ষ্যে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির ক্ষেত্রেও বড় ঘোষণা এসেছে। অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ₹৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই প্রকল্পকে তাদের অন্যতম প্রধান জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি হিসেবে তুলে ধরেছিল। মহিলাদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্যেই এই প্রকল্প চালু করা হয়। বাজেটে বিপুল বরাদ্দের মাধ্যমে সরকার স্পষ্ট করেছে যে নারী ভোটব্যাঙ্কের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, সামাজিক সুরক্ষা ও আর্থিক উন্নয়নকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাই একদিকে যেমন মহিলাদের আর্থিক ক্ষমতায়নের জন্য বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে, অন্যদিকে শিল্প ও কর্মসংস্থানেও জোর দেওয়া হয়েছে।

সেই লক্ষ্যেই ₹৪০ হাজার কোটির একটি বিশেষ উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। সরকারের দাবি, আগামী কয়েক বছরে এই অর্থ ব্যবহার করা হবে শিল্পাঞ্চল সম্প্রসারণ, নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির কাজে। দীর্ঘদিন ধরে শিল্পে পিছিয়ে পড়া পশ্চিমবঙ্গকে নতুন করে বিনিয়োগের মানচিত্রে ফিরিয়ে আনাই এই কর্মসূচির অন্যতম উদ্দেশ্য।

বাজেটে শিল্পায়নের প্রসঙ্গে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে উৎপাদন শিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাত। সরকার জানিয়েছে, শিল্প স্থাপনের অনুমোদন প্রক্রিয়া আরও সহজ করা হবে। জমি, বিদ্যুৎ ও পরিবহণ সংক্রান্ত সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। দেশি ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে নতুন শিল্পনীতি ঘোষণারও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।

কর্মসংস্থান প্রসঙ্গেও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে শূন্যপদ পূরণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে বাজেটে। পাশাপাশি বেসরকারি শিল্পে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির সম্প্রসারণের কথাও বলা হয়েছে। সরকারের দাবি, আগামী কয়েক বছরে লক্ষাধিক নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে।

উত্তরবঙ্গকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টিও বাজেটের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। চা শিল্প, পর্যটন, সড়ক যোগাযোগ এবং সীমান্তবর্তী এলাকার উন্নয়নের জন্য পৃথক কর্মসূচির ঘোষণা করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গের দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত ঘাটতি দূর করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে সরকার। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উত্তরবঙ্গে বিজেপির শক্ত ঘাঁটি আরও সুদৃঢ় করার কৌশলও এর পিছনে কাজ করছে।

অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রেও বড় পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। নতুন সড়ক নির্মাণ, গ্রামীণ রাস্তার উন্নয়ন, সেচ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। রাজ্যে নতুন তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের পরিকল্পনার কথাও বাজেটে উঠে এসেছে। শিল্প বিনিয়োগ টানতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

অর্থমন্ত্রী রাজ্যের আর্থিক অবস্থার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিপুল ঋণের বোঝা থাকা সত্ত্বেও সরকার উন্নয়নমূলক ব্যয় কমাতে চায় না। বরং রাজস্ব আয় বাড়িয়ে এবং ব্যয়ের পুনর্বিন্যাসের মাধ্যমে আর্থিক ভারসাম্য আনার চেষ্টা করা হবে। কর আদায় ব্যবস্থার আধুনিকীকরণ, সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার উন্নতি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে রাজস্ব বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাজেট বক্তৃতায় কৃষির কথাও গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসে। কৃষকদের জন্য সেচ, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়নে অতিরিক্ত বরাদ্দের কথা ঘোষণা করা হয়েছে। কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজন এবং কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তোলার ওপরও জোর দেওয়া হয়েছে। সরকারের মতে, কৃষি ও শিল্প—দুই ক্ষেত্রের সমন্বিত উন্নয়ন ছাড়া রাজ্যের অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হবে না।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষাক্ষেত্রেও বরাদ্দ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। জেলা হাসপাতালগুলির পরিকাঠামো উন্নয়ন, নতুন চিকিৎসাকেন্দ্র নির্মাণ এবং চিকিৎসক নিয়োগের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষাক্ষেত্রে স্কুল ও কলেজের আধুনিকীকরণ, প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা এবং কারিগরি প্রশিক্ষণ সম্প্রসারণের কথা বলা হয়েছে।

রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও এই বাজেট অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ এটি শুধু একটি অর্থবর্ষের আয়-ব্যয়ের হিসাব নয়, বরং নতুন সরকারের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের প্রতিফলন। তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের বিভিন্ন প্রকল্পের পরিবর্তে বিজেপি সরকার কোন পথে এগোতে চায়, তার একটি স্পষ্ট রূপরেখা এই বাজেটে পাওয়া গেছে।

বিরোধীদের একাংশ অবশ্য অভিযোগ করেছে যে বাজেটে ঘোষণার সংখ্যা বেশি হলেও বাস্তবায়নের রূপরেখা এখনও স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্প বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সরকারকে ফল দেখাতে হবে বলে তাদের দাবি। তবে সরকারপক্ষের বক্তব্য, মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে প্রশাসনিক কাঠামো পুনর্গঠন করে তারা যে উন্নয়নের রূপরেখা তৈরি করেছে, এই বাজেট তারই প্রতিফলন।

সব মিলিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের পশ্চিমবঙ্গ বাজেট তিনটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে—নারীকল্যাণে জোর, সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক স্বস্তি এবং শিল্পায়ন-কর্মসংস্থানের মাধ্যমে অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার চেষ্টা। আগামী মাস ও বছরে এই ঘোষণাগুলির বাস্তবায়ন কতটা সফল হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে নতুন সরকারের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সাফল্যের মূল্যায়ন।