ব্রিটেনের উইল্টশায়ারে বিখ্যাত Stonehenge-এর কাছেই প্রত্নতত্ত্ববিদেরা একটি ৫,০০০ বছরের পুরনো সৌর-সংক্রান্ত স্মৃতিস্তম্ভের সন্ধান পেয়েছেন। তাঁদের ধারণা, এটি হয়তো পরে নির্মিত স্টোনহেঞ্জের সূর্য-সংক্রান্ত বিন্যাসের এক ধরনের পূর্বসূরি বা ‘প্রোটোটাইপ’।
নতুন আবিষ্কৃত এই স্থাপনাটি বুলফোর্ড এলাকায়, স্টোনহেঞ্জ থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে। কার্বন ডেটিং পরীক্ষায় জানা গেছে, এটি খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ সালের কাছাকাছি সময়ে নির্মিত হয়েছিল। অর্থাৎ স্টোনহেঞ্জের প্রথম পর্যায়ের নির্মাণের সমসাময়িক, কিন্তু স্টোনহেঞ্জের বিশাল পাথরগুলো সূর্যের সঙ্গে নিখুঁতভাবে সারিবদ্ধ করে বসানোর অন্তত ৫০০ বছর আগে।
প্রত্নতত্ত্ববিদদের মতে, এটি উইল্টশায়ার অঞ্চলে এখন পর্যন্ত পাওয়া সবচেয়ে প্রাচীন অয়নান্ত-সংলগ্ন (solstice-aligned) স্থাপনা এবং সমগ্র ব্রিটেনেরও অন্যতম প্রাচীন উদাহরণ।
এই খননকার্যের নেতৃত্ব দেন প্রত্নতত্ত্ববিদ Phil Harding। তিনি বলেন, এটি তাঁর কর্মজীবনের অন্যতম বড় আবিষ্কার।
মজার বিষয় হলো, প্রথমে তাঁরা বুঝতেই পারেননি কী খুঁজে পেয়েছেন। স্টোনহেঞ্জের মতো বিশাল পাথরের বদলে এখানে ছিল মাত্র দুটি কাঠের খুঁটি। হাজার হাজার বছর আগে সেই খুঁটিগুলি নষ্ট হয়ে গেছে। মাটির নিচে শুধু তাদের বসানোর জন্য খোঁড়া দুটি বড় গর্তের চিহ্ন রয়ে গিয়েছিল।
পরে সাইটের মানচিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে হার্ডিং দুটি বড় গর্তকে একটি সরলরেখায় যুক্ত করেন। তখনই তাঁর নজরে আসে যে রেখাটি উত্তর দিক থেকে প্রায় ৫০ ডিগ্রি কোণে রয়েছে, যা গ্রীষ্মকালীন অয়নান্তের সূর্যোদয়ের দিকের সঙ্গে মিলে যায়।
তিনি বলেন, “এটা বুঝতে পারার পর আমি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়েছিলাম।”
এরপর আকাশ-ভিত্তিক প্রত্নতত্ত্বের বিশেষজ্ঞ Fabio Silva আরও বিশদ বিশ্লেষণ করেন। তিনি নিশ্চিত করেন যে খ্রিস্টপূর্ব ২৯৫০ সালে এই দুটি কাঠের খুঁটি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে গ্রীষ্মকালীন সূর্যোদয় এবং শীতকালীন সূর্যাস্তের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।
গবেষকদের ধারণা, খুঁটিগুলির উচ্চতা ছিল ৩ থেকে ৪ মিটার। দুটি খুঁটি এমনভাবে দাঁড় করানো ছিল যে মাঝখানের ফাঁক দিয়ে তাকালে অয়নান্তের সূর্যোদয় বা সূর্যাস্ত দেখা যেত।
এলাকায় আরও একটি ছোট গর্তে একটি বিরল চাকতির মতো চকমকি পাথরের ছুরি পাওয়া গেছে। প্রত্নতত্ত্ববিদদের ধারণা, সেটি সম্ভবত সূর্যের প্রতীক হিসেবেই তৈরি করা হয়েছিল।
Wessex Archaeology-এর গবেষণা পরিচালক ম্যাট লেইভার্সের মতে, এই আবিষ্কার প্রমাণ করে যে প্রস্তরযুগের মানুষ সূর্যের গতিবিধিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিত। তারা বারবার একই অঞ্চলে ফিরে এসে সূর্য ও ঋতু পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোকে চিহ্নিত করার জন্য নতুন নতুন স্থাপনা তৈরি করত।
তিনি বলেন, “আমরা জানি না সূর্য তাদের কাছে দেবতা ছিল কি না। কিন্তু সূর্যের চলনকে চিহ্নিত করার জন্য যে বিপুল শ্রম তারা দিয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে এটি তাদের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক জীবনের কেন্দ্রীয় অংশ ছিল।”
লেইভার্সের ধারণা, বুলফোর্ড ও স্টোনহেঞ্জে অয়নান্ত উদ্যাপনকারী মানুষরা হয়তো একই সম্প্রদায়ের সদস্য ছিলেন। এমনও হতে পারে, বুলফোর্ডের এই এলাকা ছিল স্টোনহেঞ্জের প্রথম পর্যায়ের নির্মাতাদের অস্থায়ী শিবির।
ফিল হার্ডিংয়ের কথায়, “এ ধরনের আবিষ্কার জীবনে একবারই আসে, কখনও কখনও তাও আসে না। স্টোনহেঞ্জের নাম পৃথিবীর প্রায় সবাই জানে। সেই ইতিহাস সম্পর্কে নতুন তথ্য যোগ করতে পারা এক বিরাট সৌভাগ্যের বিষয়।”