হাইলাইটস
- দিল্লির যন্তর মন্তরে সিজেপি বা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-র দ্বিতীয় বড় বিক্ষোভ ঘিরে উত্তেজনা।
- বিকেল ৫টার নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পর আন্দোলনকে “বেআইনি” ঘোষণা করে নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ।
- সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে ঘোষণা করেন, অনুমতি না পেলেও তিনি ও তাঁর সমর্থকেরা রাতভর অবস্থান করবেন।
- শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভকারীদের জড়ো হওয়ার আহ্বান।
- সমর্থকদের থালা-বাসন ও চামচ নিয়ে আসতে বলা হয়েছিল, যা কোভিড-পর্বে নরেন্দ্র মোদীর ‘থালি বাজাও’ কর্মসূচির স্মৃতি উসকে দেয়।
দিল্লির রাজনৈতিক কেন্দ্রস্থল যন্তর মন্তর শনিবার আবারও এক বিতর্কিত বিক্ষোভের সাক্ষী থাকল। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি)-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত আন্দোলন নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রম করার পর প্রশাসনের সঙ্গে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। বিকেল ৫টার পর নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট জানিয়ে দেয় যে বিক্ষোভের অনুমোদিত সময় শেষ হয়েছে এবং এরপর আর জমায়েত চালিয়ে যাওয়া আইনসম্মত নয়।
কিন্তু তাতেও পিছিয়ে যাননি দীপকে। তিনি ঘোষণা করেন, আন্দোলনকারীরা যন্তর মন্তর ছেড়ে যাবেন না এবং প্রয়োজনে রাতভর অবস্থান করবেন। তাঁর দাবি, দেশের ছাত্রসমাজ এবং অভিভাবকদের ক্ষোভকে প্রশাসনিক নির্দেশ দিয়ে থামিয়ে রাখা যাবে না।
দুপুর ১টায় শুরু হওয়া এই কর্মসূচিতে দিল্লি ছাড়াও হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ এবং রাজস্থানের বিভিন্ন এলাকা থেকে ছাত্রছাত্রী ও যুবকদের উপস্থিতি দেখা যায়। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ। সাম্প্রতিক শিক্ষানীতি, পরীক্ষাব্যবস্থা এবং বিভিন্ন শিক্ষাগত অনিয়মের অভিযোগ তুলে সরকারের বিরুদ্ধে সরব হয় সিজেপি।
বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলনের ভিড় কিছুটা বাড়তে থাকে। সেই সময় অভিজিৎ দীপকে সামাজিক মাধ্যমে বার্তা দিয়ে সমর্থকদের সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে যন্তর মন্তরে পৌঁছানোর আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, “এটি শুধু একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়, এটি দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকদের আন্দোলন।”
তবে প্রশাসন সেই আহ্বানকে ভালো চোখে দেখেনি। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা জানিয়ে দেন, নির্দিষ্ট সময়ের পর নতুন করে জনসমাগম ঘটানো হলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। ফলে সন্ধ্যার পর আন্দোলনকারীদের স্থান খালি করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
এদিনের বিক্ষোভের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল প্রতীকী প্রতিবাদের অভিনব পদ্ধতি। শুক্রবারই দীপকে তাঁর সমর্থকদের থালা এবং চামচ নিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আন্দোলনস্থলে অনেককেই সেই সামগ্রী নিয়ে উপস্থিত হতে দেখা যায়। নির্দিষ্ট সময়ে থালা-বাসন বাজিয়ে তাঁরা সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের মতে, এই কর্মসূচি নিঃসন্দেহে ২০২০ সালের কোভিড মহামারির সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আহ্বানে দেশজুড়ে থালা-বাসন বাজানোর ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে দীপকের সমর্থকেরা দাবি করেন, তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল সরকারের প্রতি প্রতীকী সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়া।
যন্তর মন্তরে আন্দোলন ঘিরে পুলিশের অবস্থান ছিল কড়া। অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়, গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অধিকারকে সম্মান করা হলেও অনুমতির শর্ত ভঙ্গ করার সুযোগ দেওয়া হবে না।
সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি কিছুটা উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন আন্দোলনকারীদের একাংশ স্থান ত্যাগ করতে অস্বীকার করেন। যদিও বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি, তবুও পুলিশ এবং বিক্ষোভকারীদের মধ্যে একাধিকবার বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে।
অভিজিৎ দীপকে তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন, “আমাদের কণ্ঠস্বরকে দমন করার চেষ্টা চলছে। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করছি। যদি প্রয়োজন হয়, আমরা রাতভর এখানে থাকব।”
অন্যদিকে প্রশাসনের বক্তব্য, যন্তর মন্তরে প্রতিবাদের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম রয়েছে এবং সব সংগঠনকেই সেই নিয়ম মেনে চলতে হয়। কোনও সংগঠনকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া সম্ভব নয়।
এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলেও আলোচনা শুরু হয়েছে। বিরোধী শিবিরের কিছু নেতা আন্দোলনকারীদের বক্তব্য শোনার পক্ষে মত দিলেও, অন্যরা মনে করছেন অনুমতির সীমা অতিক্রম করে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়া গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের নৈতিক শক্তিকেই দুর্বল করতে পারে।
সব মিলিয়ে যন্তর মন্তরের এই বিক্ষোভ আবারও দেখিয়ে দিল যে শিক্ষা, পরীক্ষা এবং যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ এখনো দেশের রাজনীতিতে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নজর ছিল একটাই প্রশ্নে—অভিজিৎ দীপকে ও তাঁর সমর্থকেরা কি সত্যিই রাতভর অবস্থান চালিয়ে যেতে পারবেন, নাকি প্রশাসনের কঠোর অবস্থানের সামনে শেষ পর্যন্ত আন্দোলন গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবেন?