হাইলাইটস:
- জাল স্বাক্ষর মামলার তদন্তে নতুন মোড়।
- সিআইডি তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায় বলে দাবি করলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
- বিষয়টি নিয়ে বার অ্যাসোসিয়েশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন তিনি।
- তদন্তকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে ইঙ্গিত তৃণমূলের।
- বিরোধী শিবিরের দাবি, আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলছে।
বাংলাস্ফিয়ার: জাল স্বাক্ষর-কাণ্ড ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে উত্তেজনা ক্রমশ বাড়ছে। এই মামলায় ইতিমধ্যেই তৃণমূল কংগ্রেসের একাধিক নেতা ও পদাধিকারী তদন্তের মুখোমুখি হয়েছেন। এবার সেই তালিকায় নিজের নামও যুক্ত হতে চলেছে বলে দাবি করলেন তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়।
বৃহস্পতিবার তিনি জানান, রাজ্য সিআইডি তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে তিনি সংশ্লিষ্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের কাছেও বিষয়টি তুলে ধরেছেন। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তদন্তের পরিধি ক্রমাগত বাড়ানো হচ্ছে এবং বিরোধী রাজনৈতিক নেতৃত্বকে চাপে রাখার চেষ্টা চলছে।
সম্প্রতি বিধানসভায় বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের প্রশ্নে যে জাল স্বাক্ষর বিতর্ক সামনে আসে, তা থেকেই এই মামলার সূত্রপাত। অভিযোগ ওঠে, কয়েকজন বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সিদ্ধান্তকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত শুরু করে সিআইডি। তদন্তের স্বার্থে ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন তৃণমূল নেতা ও সংগঠককে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।
কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছেন, তাঁর কাছে এমন তথ্য এসেছে যে তদন্তকারী সংস্থা খুব শীঘ্রই তাঁকেও ডেকে পাঠাতে পারে। একজন আইনজীবী এবং সাংসদ হিসেবে তিনি বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাঁর বক্তব্য, যদি কোনও নির্দিষ্ট অভিযোগ থাকে, তবে আইনের পথে তা মোকাবিলা করবেন। কিন্তু শুধুমাত্র রাজনৈতিক কারণে কাউকে হেনস্তা করার চেষ্টা হলে তার বিরুদ্ধে তিনি আইনি ও সাংগঠনিক দুই স্তরেই লড়াই করবেন।
এই কারণেই তিনি আইনজীবীদের সংগঠনের কাছে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, একজন আইনজীবীর পেশাগত স্বাধীনতা ও মর্যাদার প্রশ্নও এখানে জড়িত। তদন্তের নামে অযথা চাপ সৃষ্টি করা হলে তা শুধু ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বৃহত্তর আইনি পরিসরেও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
তৃণমূল কংগ্রেসের শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও পর্যন্ত এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া না দিলেও দলের একাংশের বক্তব্য, রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর থেকে বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের সংখ্যা বেড়েছে। তাদের দাবি, রাজনৈতিক মতভেদকে অপরাধমূলক মামলার সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়ার প্রবণতা গণতান্ত্রিক পরিবেশের পক্ষে শুভ নয়।
অন্যদিকে, বিজেপি শিবিরের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাদের দাবি, তদন্তকারী সংস্থাগুলি নিজেদের কাজ করছে। যদি কোনও অভিযোগের সূত্রে কোনও ব্যক্তির নাম উঠে আসে, তবে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই পারে তদন্তকারী সংস্থা। রাজনৈতিক পরিচয় তদন্ত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার ঢাল হতে পারে না।
আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা মানেই কাউকে অভিযুক্ত করা নয়। কোনও মামলার বিভিন্ন দিক যাচাই করতে তদন্তকারী সংস্থা বহু ব্যক্তির বক্তব্য রেকর্ড করে থাকে। ফলে সিআইডি যদি কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডেকেও থাকে বা ভবিষ্যতে ডাকে, সেটিকে আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই দেখা উচিত।
তবে রাজনৈতিক বাস্তবতা বলছে, জাল স্বাক্ষর মামলাটি এখন আর শুধুমাত্র একটি ফৌজদারি তদন্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক সংঘাতের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। বিরোধী দলনেতা পদ, বিধানসভার সংখ্যার অঙ্ক, দলভাঙন, বিদ্রোহী বিধায়ক ও সাংসদদের ভূমিকা—সবকিছুই এই মামলার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে।
ফলে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই নতুন দাবি তদন্তকে আরও আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এল। আগামী দিনে সিআইডি সত্যিই তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকে কি না, এবং ডেকেও থাকলে সেই জেরা থেকে নতুন কোনও তথ্য সামনে আসে কি না, সেদিকেই এখন নজর রাজনৈতিক মহলের। জাল স্বাক্ষর-কাণ্ডের তদন্ত যত এগোচ্ছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে এর অভিঘাত শুধু আদালত বা তদন্ত দফতরে সীমাবদ্ধ থাকবে না; তার প্রভাব পড়বে রাজ্যের বৃহত্তর রাজনৈতিক সমীকরণেও।