বাংলাস্ফিয়ার: মঙ্গলবার রাতে কানসাস সিটির স্টেডিয়ামটি যেন রূপ নিয়েছিল আর্জেন্টিনার এক টুকরো ফুটবল মন্দিরে। চারদিকে সাদা-আকাশি রঙের ঢেউ, প্রায় ৭০ হাজার সমর্থকের গর্জন, আর সেই গর্জনের কেন্দ্রে একটাই নাম—লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনা মাঠে নামতেই স্টেডিয়াম পরিণত হয়েছিল উৎসবের মঞ্চে।

সমর্থকদের উল্লাসের যথেষ্ট কারণও ছিল। নিজের ২০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচে নেমে মেসি করলেন দুর্দান্ত হ্যাটট্রিক। তাঁর তিন গোলের সৌজন্যে আর্জেন্টিনা ৩-০ ব্যবধানে হারাল আলজেরিয়াকে। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে মোট ১৬ গোল করে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোজের সর্বকালের গোলরেকর্ডও স্পর্শ করলেন তিনি।

এই ম্যাচে নেমেই মেসি আরেকটি ইতিহাস গড়েন। তিনি বিশ্বের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ছয়টি বিশ্বকাপে মাঠে নামলেন। চোটের কারণে তাঁকে নিয়ে কিছুটা অনিশ্চয়তা ছিল, কিন্তু আর্জেন্টিনার প্রথম একাদশে তাঁর নাম ঘোষণার পর সেই সংশয় দ্রুত মিলিয়ে যায়।

ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ছিল আর্জেন্টিনা। পঞ্চম মিনিটে মেসি গোলও করে ফেলেছিলেন, কিন্তু অল্পের জন্য অফসাইড ধরা পড়ে। দু’মিনিট পরে আলজেরিয়ার ফারেস শাইবিও একই কারণে গোলবঞ্চিত হন।

১৭ মিনিটে অবশেষে গোলের খাতা খোলেন মেসি। মাঝমাঠ থেকে রদ্রিগো দে পলের পাস পেয়ে তিনি কয়েক কদম এগিয়ে বক্সের বাইরে থেকে জোরালো শট নেন। আলজেরিয়ার গোলরক্ষক লুকা জিদান বল স্পর্শ করলেও তা জালে জড়িয়ে যায়।

তবে প্রথমার্ধে একটি বিতর্কও তৈরি হয়। আলজেরিয়ার ডিফেন্ডার আইসা মান্দির পায়ে বিপজ্জনক ট্যাকল করেছিলেন মেসি। অনেকের মতে, সেখানে হলুদ কার্ড তো বটেই, লাল কার্ডও দেখানো যেত। কিন্তু রেফারি কোনও শাস্তি দেননি এবং ঘটনাটি মাঠে পুনর্বিবেচনাও করা হয়নি।

দ্বিতীয় গোল আসে আরও সহজভাবে। অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের দূরপাল্লার শট জিদান ঠেকালেও বল সরাসরি চলে আসে মেসির সামনে। সুযোগ হাতছাড়া না করে কাছ থেকে বল জালে পাঠিয়ে ব্যবধান বাড়ান তিনি।

আলজেরিয়ার রক্ষণভাগ বারবার ভেঙে পড়ছিল। অন্যদিকে আর্জেন্টিনার ডিফেন্স ছিল অত্যন্ত সংগঠিত। আলজেরিয়া কিছু আক্রমণ গড়লেও গোলমুখে কার্যকর হতে পারেনি।

৭৭ মিনিটে আসে ম্যাচের সেরা মুহূর্ত। তিনজন ডিফেন্ডারের মাঝখান দিয়ে নিখুঁত শটে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন মেসি। এরপর কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁকে তুলে নেন কোচ লিওনেল স্কালোনি। স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় ফুটবলের এই মহাতারকাকে।

ম্যাচের আগে থেকেই কানসাস সিটি ও আশপাশের এলাকায় দুই দলের সমর্থকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সোমবার রাতে হাজার হাজার আর্জেন্টাইন সমর্থক শহরের এক পার্কে জড়ো হয়ে গান, নাচ আর পতাকা মিছিল করেন। সেই উন্মাদনা ম্যাচের দিন স্টেডিয়ামে গিয়েও অব্যাহত থাকে।

আলজেরিয়ার সমর্থকেরাও কম উৎসাহী ছিলেন না। যদিও সংখ্যায় তারা অনেক কম ছিল, তবু সবুজ পতাকা আর স্লোগানে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিয়েছেন। দীর্ঘ ১২ বছর পর বিশ্বকাপে ফিরে আসা আলজেরিয়া কোচ ভ্লাদিমির পেতকোভিচের অধীনে নতুন আশার স্বপ্ন দেখছিল। কিন্তু মাঠে সেই স্বপ্নের প্রতিফলন দেখা গেল না।

পরিসংখ্যান বলছে, বলের দখলে আলজেরিয়া ছিল সামান্য এগিয়ে—৫১ শতাংশ। কিন্তু গোলমুখে তারা একটি শটও লক্ষ্যে রাখতে পারেনি। আর্জেন্টিনা ছয়টি অন-টার্গেট শটের মধ্যে তিনটিকেই গোলে পরিণত করে।

ম্যাচের আগে স্কালোনি বলেছিলেন, উদ্বোধনী ম্যাচে জয় পাওয়া অত্যাবশ্যক নয়। ২০২২ সালে সৌদি আরবের কাছে হার দিয়ে বিশ্বকাপ শুরু করেও তাঁর দল শেষ পর্যন্ত চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল। তবু এই জয় তাঁকে নিশ্চয়ই স্বস্তি দেবে।

এই তিন পয়েন্ট আর্জেন্টিনাকে নকআউট পর্বের দিকে অনেকটাই এগিয়ে দিল। পরবর্তী ম্যাচে টেক্সাসের আরলিংটনে তাদের মুখোমুখি হবে অস্ট্রিয়া। আর সেই ম্যাচেও চোখ থাকবে মেসির দিকে—কারণ তিনি মাঠে নামলেই যেন নতুন কোনও ইতিহাস অপেক্ষা করে থাকে।