হাইলাইটস:

  • ২০২৫ সালে ভারতে ভোক্তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত ডিজিটাল লেনদেনের ৭.১% জালিয়াতির সন্দেহে চিহ্নিত হয়েছে।
  • বিশ্ব গড় যেখানে ৩.৮%, সেখানে ভারতের হার প্রায় দ্বিগুণ।
  • ভারতে সবচেয়ে বেশি জালিয়াতির ঝুঁকি এখন অ্যাকাউন্ট লগইন পর্যায়ে।
  • লজিস্টিকস খাতে জালিয়াতির হার সর্বোচ্চ, ১৬.৩%।
  • টেলিকম খাতে এক বছরে সন্দেহজনক জালিয়াতির পরিমাণ বেড়েছে ৩০৮%।
  • পরিচয় চুরি, অ্যাকাউন্ট দখল এবং সিন্থেটিক আইডেন্টিটি এখন বড় উদ্বেগ।

বাংলাস্ফিয়ার: ভারতে ডিজিটাল অর্থনীতি যত দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে, ততই বাড়ছে সাইবার জালিয়াতির ঝুঁকি। ট্রান্সইউনিয়নের ‘এইচ১ ২০২৬ টপ ফ্রড ট্রেন্ডস রিপোর্ট’-এ দেখা গেছে, ২০২৫ সালে ভারতে ভোক্তাদের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্ত ডিজিটাল লেনদেনের ৭.১ শতাংশকে সম্ভাব্য জালিয়াতির চেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই হার বিশ্ব গড় ৩.৮ শতাংশের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

অর্থাৎ, প্রতি ১৪টি ডিজিটাল লেনদেনের মধ্যে প্রায় একটি লেনদেনে প্রতারণার ইঙ্গিত মিলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, জালিয়াতরা এখন আর শুধু সাধারণ প্রতারণার ফাঁদে নির্ভর করছে না; বরং চুরি হওয়া পরিচয়পত্র, লগইন তথ্য এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে বৈধ গ্রাহকের ছদ্মবেশে প্রতারণা চালাচ্ছে।

ট্রান্সইউনিয়ন ইন্ডিয়া ডেটা অ্যানালিটিক্স সলিউশন্স (ইন্ডাস)-এর প্রধান নটরাজন রমণী বলেন, প্রতারকরা এখন মানুষের আস্থা এবং নতুন প্রযুক্তি—দুটিকেই অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। জালিয়াতির কৌশল যত উন্নত হচ্ছে, তত দ্রুত বদলে যাচ্ছে ঝুঁকির চরিত্রও। তাই শুধুমাত্র প্রচলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়; পরিচয়ভিত্তিক সুরক্ষা, উন্নত বিশ্লেষণ এবং বহুস্তরীয় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

লগইন পর্যায়েই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকি

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার পর্যায়কে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হলেও ভারতের চিত্র কিছুটা আলাদা। এখানে সবচেয়ে বেশি জালিয়াতির আশঙ্কা দেখা গেছে অ্যাকাউন্টে লগইন করার সময়।

রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে ৩.৯ শতাংশ লগইন প্রচেষ্টা সন্দেহজনক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নতুন অ্যাকাউন্ট তৈরির ক্ষেত্রে এই হার ৩.১ শতাংশ এবং আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে ১.২ শতাংশ।

এর অর্থ, জালিয়াতরা এখন ভুয়ো পরিচয় তৈরি করার চেয়ে বৈধ ব্যবহারকারীদের অ্যাকাউন্ট দখলের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। একবার কোনও গ্রাহকের লগইন তথ্য হাতে পেয়ে গেলে প্রতারকরা সহজেই তার পরিচয়ে বিভিন্ন আর্থিক বা বাণিজ্যিক কাজ করতে পারছে।

ইন্ডাস-এর প্রতারণা সমাধান বিভাগের প্রধান অনুরাগ আনন্দ বলেন, প্রতারকরা এখন আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু বদলে ফেলেছে। তারা অ্যাকাউন্ট তৈরির সময় এবং লগইন পর্যায়ে দুর্বলতাকে কাজে লাগাচ্ছে, যাতে পরিচয় বিকৃতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরা না পড়ে।

লজিস্টিকস খাতে সবচেয়ে বেশি জালিয়াতি

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভারতে লজিস্টিকস বা পণ্য পরিবহণ ও সরবরাহ পরিষেবা খাতেই জালিয়াতির হার সবচেয়ে বেশি। এই খাতে ১৬.৩ শতাংশ ডিজিটাল লেনদেনে প্রতারণার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, প্রতি ছয়টি লেনদেনের মধ্যে প্রায় একটি সন্দেহজনক।

এর পরে রয়েছে টেলিকম খাত (১৪.৭ শতাংশ) এবং বিমা খাত (১১.৫ শতাংশ)।

২০২৫ সালে খাতভিত্তিক সন্দেহজনক জালিয়াতির হার:

  • লজিস্টিকস: ১৬.৩%
  • টেলিকম: ১৪.৭%
  • বিমা: ১১.৫%
  • অনলাইন গেমিং: ৯.৬%
  • অনলাইন কমিউনিটি ও ফোরাম: ৪.৭%
  • আর্থিক পরিষেবা: ২.৬%
  • খুচরো ব্যবসা: ২.৫%
  • ভ্রমণ ও অবকাশ: ০.৫%

বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব খাতে দ্রুতগতির লেনদেন, বিস্তৃত নেটওয়ার্ক এবং তাৎক্ষণিক ডিজিটাল যোগাযোগের প্রয়োজন হয়, সেসব ক্ষেত্রেই জালিয়াতির সুযোগ বেশি তৈরি হয়।

টেলিকম খাতে বিস্ফোরক বৃদ্ধি

জালিয়াতির হার সর্বোচ্চ না হলেও, টেলিকম খাতে প্রতারণার বৃদ্ধির গতি সবচেয়ে উদ্বেগজনক। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে এই খাতে সন্দেহজনক জালিয়াতির পরিমাণ বেড়েছে ৩০৮ শতাংশ।

একই সময়ে বিমা খাতে বৃদ্ধি হয়েছে ১৪৫ শতাংশ এবং লজিস্টিকস খাতে ৩১ শতাংশ।

অন্যদিকে কিছু খাতে জালিয়াতির পরিমাণ কমেছে:

  • খুচরো ব্যবসা: ৯৯% হ্রাস
  • ভ্রমণ ও অবকাশ: ৬৮% হ্রাস
  • আর্থিক পরিষেবা: ৬৫% হ্রাস
  • অনলাইন গেমিং: ৩৬% হ্রাস
  • অনলাইন কমিউনিটি: ২১% হ্রাস

এই প্রবণতা ইঙ্গিত করছে যে প্রতারকরা এখন সেইসব শিল্পক্ষেত্রকে বেশি লক্ষ্য করছে, যেখানে পরিচয় যাচাই জটিল এবং ডিজিটাল ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে।

পরিচয়ভিত্তিক প্রতারণাই নতুন চ্যালেঞ্জ

রিপোর্টের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হল, ডিজিটাল জালিয়াতি ক্রমশ পরিচয়কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। চুরি হওয়া পাসওয়ার্ড, ফাঁস হওয়া ব্যক্তিগত তথ্য, কৃত্রিমভাবে তৈরি পরিচয় এবং অ্যাকাউন্ট দখলের কৌশল ব্যবহার করে প্রতারকরা এমনভাবে হামলা চালাচ্ছে, যা অনেক সময় বৈধ গ্রাহকের স্বাভাবিক আচরণ বলে মনে হয়।

ফলে প্রচলিত নিয়মভিত্তিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা দিয়ে এসব প্রতারণা শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

ভারতের ডিজিটাল পেমেন্ট, ই-কমার্স এবং অনলাইন পরিষেবা খাত দ্রুত সম্প্রসারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলিকে আরও উন্নত পরিচয় যাচাই ব্যবস্থা, আচরণভিত্তিক বিশ্লেষণ এবং অভিযোজিত প্রমাণীকরণ প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। অন্যথায় ডিজিটাল অর্থনীতির বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে প্রতারণার ঝুঁকিও সমানতালে বাড়তে থাকবে।