হাইলাইটস:

  • তৃণমূল ছেড়ে এনসিপিআইতে যোগ দেওয়া ২০ বিদ্রোহী সাংসদ নতুন দলেও পুরনো সাংগঠনিক কাঠামো বজায় রাখতে চলেছেন।
  • বিদ্রোহী শিবিরের মুখ কাকলি ঘোষ দস্তিদার এনসিপিআইয়ের চিফ হুইপ হওয়ার পথে।
  • প্রাক্তন তৃণমূল লোকসভা দলনেতা সুদীপ বন্দোপাধ্যায় হতে পারেন এনসিপিআইয়ের ফ্লোর লিডার।
  • ডেপুটি লিডারের দায়িত্ব পেতে পারেন শতাব্দী রায়।
  • বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-কে সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়ে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ গড়ে তুলছে বিদ্রোহী গোষ্ঠী।

বাংলাস্ফিয়ার: তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে নতুন দল ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অব ইন্ডিয়া (এনসিপিআই)-তে যোগ দেওয়া বিদ্রোহী সাংসদদের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে জল্পনা চলছিল। সেই জল্পনারই অবসান ঘটিয়ে স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে যে, নতুন দলে গিয়েও তাঁরা কার্যত পুরনো তৃণমূল কাঠামোকেই অনুসরণ করতে চলেছেন। অর্থাৎ দল বদলালেও নেতৃত্বের স্তরবিন্যাস বা সাংগঠনিক ক্ষমতার কেন্দ্রগুলিতে খুব বেশি পরিবর্তন ঘটছে না।

হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তৃণমূল ছেড়ে বেরিয়ে আসা ২০ জন সাংসদ, যারা ইতিমধ্যেই বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছেন, তাঁরা এনসিপিআইয়ের সাংগঠনিক রূপরেখা প্রায় তৃণমূলের আদলেই সাজাতে চাইছেন। এর ফলে স্পষ্ট যে বিদ্রোহী শিবির নিজেদের আলাদা রাজনৈতিক পরিচয় গড়ে তুললেও নেতৃত্বের ক্ষেত্রে পরীক্ষিত মুখগুলির উপরেই ভরসা রাখতে চাইছে।

বিদ্রোহী গোষ্ঠীর প্রধান মুখ কাকলি ঘোষ দস্তিদার জানিয়েছেন, নেতৃত্বের প্রশ্নে কোনও বড় পরিবর্তনের পরিকল্পনা নেই। তাঁর কথায়, “আলোচনা চলছে। কিন্তু আগের যে ব্যবস্থা ছিল, সেটাই বহাল থাকবে।” এই মন্তব্য থেকেই স্পষ্ট যে নতুন দলে দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষেত্রে ধারাবাহিকতাকেই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

দলীয় সূত্রের দাবি, কাকলি ঘোষ দস্তিদারকে এনসিপিআইয়ের চিফ হুইপ করা হতে পারে। তৃণমূলে থাকাকালীনও তিনি কিছু সময়ের জন্য এই দায়িত্ব সামলেছিলেন। পরে সেই পদে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। ফলে সংসদীয় কৌশল ও সাংগঠনিক সমন্বয়ের ক্ষেত্রে তাঁর অভিজ্ঞতাকেই কাজে লাগাতে চাইছে নতুন দল।

অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের সাংসদ এবং তৃণমূলের অন্যতম প্রবীণ মুখ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে এনসিপিআইয়ের লোকসভা দলনেতা বা ফ্লোর লিডার করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। একসময় লোকসভায় তৃণমূলের মুখ ছিলেন সুদীপ। গত বছর সেই দায়িত্ব অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে যাওয়ার পর থেকেই তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছিল। এখন নতুন দলে তিনি ফের সংসদীয় নেতৃত্বের কেন্দ্রে উঠে আসছেন।

শতাব্দী রায়কেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ভাবনা রয়েছে। সূত্রের খবর, তাঁকে ডেপুটি লিডার করা হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বীরভূমের জনপ্রতিনিধি হিসেবে পরিচিত শতাব্দী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অন্যতম পরিচিত মুখ। ফলে সাংসদদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই পদবিন্যাস কেবল সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নয়, এর মধ্যে রয়েছে একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তাও। বিদ্রোহী সাংসদরা বোঝাতে চাইছেন যে তাঁরা কোনও আকস্মিক বা আবেগপ্রসূত সিদ্ধান্ত নেননি। বরং একটি বিকল্প রাজনৈতিক কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্যেই তাঁরা এগোচ্ছেন। সেই কারণে পরিচিত নেতৃত্বকে সামনে রেখে স্থিতিশীলতার বার্তা দেওয়া হচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, এনসিপিআই কত দ্রুত সংসদে স্বীকৃত শক্তি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারে। ২০ জন সাংসদের সমর্থন নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যা। তার উপর যদি আরও কয়েকজন সাংসদ ভবিষ্যতে এই শিবিরে যোগ দেন, তাহলে জাতীয় রাজনীতিতে দলটির গুরুত্ব আরও বাড়তে পারে।

বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ-র প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিতও এই সমীকরণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সরাসরি বিজেপিতে যোগ না দিয়েও এনডিএ-র পাশে দাঁড়ানোর কৌশল বিদ্রোহীদের রাজনৈতিক স্বাধীনতা বজায় রাখার সুযোগ দিচ্ছে। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে নিজেদের দর-কষাকষির ক্ষমতাও বাড়াচ্ছে।

তৃণমূলের জন্য অবশ্য এই ঘটনা একটি বড় ধাক্কা। কারণ দলত্যাগীদের মধ্যে রয়েছেন এমন বহু নেতা, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে দলের সাংগঠনিক ও সংসদীয় মুখ ছিলেন। তাঁদের নতুন দলে একই ধরনের দায়িত্ব পাওয়ার সম্ভাবনা দেখাচ্ছে যে বিদ্রোহ কেবল ব্যক্তিগত ক্ষোভের ফল নয়, বরং একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের অংশ।

ফলে আগামী দিনে এনসিপিআইয়ের আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক ঘোষণা এবং সংসদে তাদের অবস্থান জাতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নজরকাড়া ঘটনা হয়ে উঠতে পারে। দল বদলালেও নেতৃত্বের সমীকরণ যে খুব একটা বদলাচ্ছে না, সেই বার্তাই আপাতত সবচেয়ে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।