হাইলাইটস
- মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তির খবরে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৪-৫ শতাংশ কমেছে।
- ডলারের তুলনায় রুপির দাম পাঁচ সপ্তাহের সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছে।
- ভারতের আমদানি বিল, মুদ্রাস্ফীতি ও চলতি হিসাবের ঘাটতির ওপর চাপ কমতে পারে।
- পেট্রোল-ডিজেলের দাম কমার সম্ভাবনা তৈরি হলেও তাৎক্ষণিক স্বস্তির আশা কম।
- তবে চুক্তির স্থায়িত্ব ও হরমুজ প্রণালীর সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হওয়াই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
বাংলাস্ফিয়ার: আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ও শান্তি চুক্তির ঘোষণার পর সবচেয়ে বড় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছে ভারত। কারণ, বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে ভারতের অর্থনীতি পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতার ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। গত কয়েক মাসের সংঘাতে যখন হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়েছিল, তখন অপরিশোধিত তেলের দাম, পরিবহণ ব্যয় এবং বীমা খরচ একসঙ্গে বেড়ে ভারতের অর্থনীতির ওপর চাপ তৈরি করেছিল। এখন সেই চাপ কিছুটা কমার ইঙ্গিত মিলছে।
শান্তি চুক্তির খবরে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম তিন মাসের সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবাহিত হয়। ফলে এই জলপথ পুনরায় খুলে গেলে সরবরাহ-সংকট অনেকটাই কেটে যাবে বলে বাজারের ধারণা।
এই পরিবর্তনের প্রথম ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে ভারতীয় মুদ্রায়। সোমবার রুপি ডলারের বিপরীতে পাঁচ সপ্তাহের সর্বোচ্চ স্তরে উঠে ৯৪.৭১ টাকায় বন্ধ হয়েছে। যুদ্ধের সময় যে রুপি দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়েছিল, এখন তেলের দাম কমার ফলে তার ওপর চাপ কমেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকলে রুপি আরও শক্তিশালী হয়ে ৯৩-৯৪ টাকার ঘরে চলে যেতে পারে।
ভারতের জন্য এর তাৎপর্য অনেক। দেশটি তার প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেলের প্রায় ৮৫-৯০ শতাংশ আমদানি করে। তেলের দাম কমলে সরকারের আমদানি বিল কমবে, বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা হ্রাস পাবে এবং চলতি হিসাবের ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে। এর ফলে মুদ্রাস্ফীতির চাপও কমতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি ও পরিবহণ খরচ কমলে খাদ্যদ্রব্য থেকে শিল্পপণ্য—সব ক্ষেত্রেই মূল্যবৃদ্ধির গতি কিছুটা শ্লথ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শেয়ারবাজারও ইতিমধ্যে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। শান্তি চুক্তির খবরের পর সেনসেক্স ও নিফটিতে শক্তিশালী উত্থান দেখা গেছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মনোভাবও বদলাতে শুরু করেছে। যুদ্ধের সময় যে ঝুঁকিভীতি কাজ করছিল, তা কমে আসায় ভারতীয় বাজারে নতুন করে বিনিয়োগের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—পেট্রোল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাস কি সস্তা হবে? উত্তর হল, হতে পারে, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নয়। তেলের আন্তর্জাতিক দাম কমলেও খুচরো বাজারে তার প্রভাব পৌঁছতে সময় লাগে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল সংস্থাগুলি আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে। ফলে দাম কমলেও তা ধাপে ধাপে হতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেলের দাম যদি দীর্ঘ সময় ৮০ ডলারের নিচে থাকে, তবেই উল্লেখযোগ্য মূল্যহ্রাসের সম্ভাবনা তৈরি হবে।
আরও একটি সতর্কতার জায়গা রয়েছে। শান্তি চুক্তি হলেও যুদ্ধের ক্ষত রাতারাতি মুছে যাবে না। হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণ নিরাপদ করতে মাইন অপসারণ, অবকাঠামো মেরামত এবং নৌ চলাচল স্বাভাবিক করতে সময় লাগতে পারে। আন্তর্জাতিক বাজারও এখনও চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে সতর্ক।
সুতরাং, মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তি ভারতের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। শক্তিশালী রুপি, কম তেলের দাম, নিয়ন্ত্রিত মুদ্রাস্ফীতি এবং চাঙ্গা শেয়ারবাজার—সব মিলিয়ে অর্থনীতির জন্য এটি এক বড় সুযোগ। কিন্তু সেই সুযোগ বাস্তবে কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নির্ভর করছে একটাই বিষয়ের ওপর—পশ্চিম এশিয়ার শান্তি কতদিন স্থায়ী হয়।