Home International গাজা চুক্তি কি সত্যিই হল? ট্রাম্পের দাবির পরও কাটেনি সংশয়

গাজা চুক্তি কি সত্যিই হল? ট্রাম্পের দাবির পরও কাটেনি সংশয়

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
25 views 4 minutes read
A+A-
Reset

ওয়াশিংটন: গাজায় হামাসের ‘সম্পূর্ণ নিরস্ত্রীকরণ’ এবং ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহার নিয়ে একটি ঐতিহাসিক সমঝোতা হয়েছে বলে দাবি করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু হামাস ও ইজরায়েলের প্রতিক্রিয়ায় স্পষ্ট, চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলি কীভাবে এবং কখন কার্যকর হবে, তা নিয়ে এখনও বড়সড় মতপার্থক্য রয়ে গিয়েছে।

সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই সমঝোতা গাজায় একটি নতুন ফিলিস্তিনি সরকারের পথ খুলে দেবে। সেই সরকার ‘বোর্ড অব পিস’-এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে গাজার পুনর্গঠনে সাহায্য করবে। পাশাপাশি ইজরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে এবং গাজাকে আর ‘সন্ত্রাসী হামলার ঘাঁটি’ হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।

কিন্তু চুক্তির ঘোষণার পরই সামনে এসেছে মূল প্রশ্ন—হামাস কখন অস্ত্র ছাড়বে এবং তার আগে ইজরায়েল কতটা সেনা সরাবে?

২০ দফা পরিকল্পনায় কী আছে?

গত বছর মার্কিন মধ্যস্থতায় ইজরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতির একটি কাঠামো তৈরি হলেও, তার দ্বিতীয় পর্যায় নিয়ে আলোচনা দীর্ঘদিন ধরেই আটকে ছিল। বিশেষ করে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ এবং গাজার পুনর্গঠন নিয়ে মতবিরোধ ছিল তীব্র।

ট্রাম্পের ঘোষিত ২০ দফা পরিকল্পনায় হামাসকে সব অস্ত্র সমর্পণ করতে হবে। একই সঙ্গে গাজার বিস্তৃত সুড়ঙ্গ নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার কথা রয়েছে।

এর বিনিময়ে ইজরায়েলি সেনা গাজা থেকে সরে যাবে। একটি প্রযুক্তিনির্ভর অন্তর্বর্তী ফিলিস্তিনি প্রশাসন দায়িত্ব নেবে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন হবে এবং দীর্ঘ যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপ থেকে গাজা পুনর্গঠনের উদ্যোগ শুরু হবে।

খবর অনুযায়ী, হামাসের শীর্ষ নেতৃত্ব নীতিগতভাবে পরিকল্পনাটি মেনে নিতে রাজি। কিন্তু নিরস্ত্রীকরণের সময় নিয়েই মূল সংঘাত—ইজরায়েল সেনা প্রত্যাহারের আগে, নাকি পরে?

হামাসের শর্ত: আগে সেনা সরাক ইজরায়েল

হামাসের আলোচক দলের সদস্য গাজি হামাদ আল জাজিরা-কে বলেছেন, ইজরায়েল গাজা ছেড়ে যাওয়ার আগে হামাস নিরস্ত্রীকরণের কোনও পদক্ষেপ নেবে না।

এএফপিকেও তিনি জানান, চুক্তিতে ইজরায়েলের আগে নিজেদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। ইজরায়েল তা না করলে হামাসও নিজেদের প্রতিশ্রুতি কার্যকর করবে না—এমনই বার্তা দিয়েছেন তিনি।

অর্থাৎ হামাসের কাছে প্রথম ধাপ হল ইজরায়েলি সামরিক প্রত্যাহারের নিশ্চয়তা। তারপর আসবে অস্ত্র ছাড়ার প্রশ্ন।

ইজরায়েলের আপত্তি ঠিক কোথায়?

ইজরায়েলের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত।

এক ইজরায়েলি কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, বর্তমানে আলোচনায় থাকা খসড়া দেশের মূল নিরাপত্তা শর্ত পূরণ করছে না।

ইজরায়েলের দাবি, গাজা থেকে সমস্ত অস্ত্র সরাতে হবে, হামাসকে সম্পূর্ণ নিরস্ত্র করতে হবে এবং গোটা উপত্যকাকে সামরিকমুক্ত করতে হবে। বর্তমান পরিকল্পনায় এই শর্তগুলি যথেষ্ট স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলেই আপত্তি তেল আভিভের।

মার্কিন প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্মকর্তাও স্বীকার করেছেন, দুই পক্ষের মধ্যে এখনও গুরুত্বপূর্ণ মতভেদ রয়েছে। ইজরায়েলের আশঙ্কা, হামাস সত্যিই অস্ত্র ছাড়বে কি না, তা নিয়ে এখনও নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

একই সঙ্গে তাঁর সতর্কবার্তা, ইজরায়েল যদি চুক্তি কার্যকর না করে, তাহলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘খুবই হতাশ’ হবেন।

হামাসের জন্য নিরস্ত্রীকরণ এত কঠিন কেন?

হামাসের প্রতিষ্ঠাকালীন আদর্শেই সশস্ত্র প্রতিরোধের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। রকেট, ট্যাঙ্কবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ও বিস্ফোরক-সহ সামরিক অস্ত্রশস্ত্র সংগঠনটির শক্তির অন্যতম ভিত্তি।

তাই অস্ত্র সম্পূর্ণভাবে ছেড়ে দেওয়া হামাসের কাছে নিছক একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়; সংগঠনটির ভবিষ্যৎ অস্তিত্ব ও প্রভাবের সঙ্গেও বিষয়টি জড়িত।

তবে চলতি মাসেই হামাস জানিয়েছে, তারা গাজার প্রশাসনিক দায়িত্ব ছেড়ে জাতিসংঘ-সমর্থিত একটি প্রযুক্তিনির্ভর কমিটির হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

নিরস্ত্রীকরণে লাগতে পারে এক বছর

মার্কিন প্রশাসন এবং ‘বোর্ড অব পিস’-এর কর্মকর্তাদের মতে, হামাস ও অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর নিরস্ত্রীকরণ সম্পূর্ণ হতে ২০০ থেকে ৩৫০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

তবে নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। আর এই সময়সূচি নিয়েই ভবিষ্যতে আরও দর-কষাকষি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হামাস চাইছে, ইজরায়েল আগে সামরিক অভিযান বন্ধ করা এবং সেনা প্রত্যাহারের লিখিত নিশ্চয়তা দিক। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে মিশর, কাতার ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় দফার আলোচনা হওয়ার কথা।

গাজি হামাদের মতে, পরিকল্পনার খুঁটিনাটি নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছতেই অন্তত ১৪ দিন বা তারও বেশি সময় লাগতে পারে। বাস্তবায়নের পদ্ধতি, সময়সূচি এবং প্রক্রিয়া—সব ক্ষেত্রেই সমঝোতা দরকার।

মাটিতে এখনও যুদ্ধ থামেনি

কূটনৈতিক স্তরে আশার আলো দেখা গেলেও গাজার মাটির বাস্তবতা এখনও সম্পূর্ণ আলাদা।

বৃহস্পতিবার ইজরায়েলি হামলায় অন্তত ছয়জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যাঁদের মধ্যে দু’জন শিশু। একই সময়ে ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু জানিয়েছেন, গাজার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা থেকে সরে আসছে না ইজরায়েল।

ফলে যুদ্ধবিরতির রূপরেখা আর বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে এখনও বড় ফারাক রয়েছে।

সামনে আরও কঠিন পরীক্ষা

আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনীতে কোন দেশগুলি অংশ নেবে, সেখানে কত সেনা মোতায়েন হবে, হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠী কত দিনে অস্ত্র ছাড়বে এবং ইজরায়েল আদৌ পুরো গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে কি না—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর এখনও অস্পষ্ট।

তাই ট্রাম্পের ঘোষণায় কূটনৈতিক আশাবাদ তৈরি হলেও, চুক্তির সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা এখনও বাকি।

কারণ চুক্তি ঘোষণা করা এক বিষয়, আর গাজার মাটিতে তার প্রতিটি শর্ত কার্যকর করা সম্পূর্ণ অন্য লড়াই।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles