হাইলাইটস:

  • আমেরিকা ও ইরান দীর্ঘ কয়েক মাসের যুদ্ধের অবসান ঘটাতে একটি কাঠামোগত চুক্তিতে পৌঁছেছে।
  • এখনও পর্যন্ত চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ প্রকাশ করা হয়নি।
  • প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষিত তিন লক্ষ্য—ইরানের সামরিক শক্তি ধ্বংস, পারমাণবিক কর্মসূচির অবসান এবং শাসনব্যবস্থার পতন—কোনোটিই পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।
  • হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল পুনরায় শুরু হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
  • নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে কঠিন আলোচনা সামনে অপেক্ষা করছে।
  • লেবাননে সংঘর্ষ বন্ধ হবে কি না, তা নিয়ে এখনও মতবিরোধ রয়েছে।
  • জেনেভায় আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরের পর শুরু হবে ৬০ দিনের বিস্তৃত শান্তি আলোচনা।

বাংলাস্ফিয়ার: মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে আরেকটি রক্তাক্ত অধ্যায়ের আপাত সমাপ্তি ঘটল সোমবার। দীর্ঘ কয়েক মাসের যুদ্ধের পর আমেরিকা ও ইরান একটি কাঠামোগত শান্তি চুক্তিতে সম্মত হয়েছে। খবরটি প্রকাশ্যে আসতেই আন্তর্জাতিক বাজারে স্বস্তির সাড়া পড়ে। তেলের দাম দ্রুত নেমে যায়, লেবাননে লড়াইয়ের তীব্রতা কমার ইঙ্গিত মেলে এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের সাধারণ মানুষের মধ্যে সতর্ক আশাবাদের জন্ম হয়।

তবে এই স্বস্তির আড়ালে রয়েছে বহু অনিশ্চয়তা। কারণ চুক্তির সম্পূর্ণ পাঠ এখনও প্রকাশ করা হয়নি। ফলে দুই পক্ষ ঠিক কী শর্তে সম্মত হয়েছে, কোন বিষয়গুলি ভবিষ্যতের আলোচনার জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে এবং কোথায় মতপার্থক্য বজায় রয়েছে—তা এখনও স্পষ্ট নয়।

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছিলেন, তাঁর লক্ষ্য তিনটি। প্রথমত, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করা। দ্বিতীয়ত, দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচির অবসান ঘটানো। তৃতীয়ত, তেহরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে ক্ষমতাচ্যুত করা।

কিন্তু যুদ্ধবিরতির মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে, এই তিনটি লক্ষ্যই কার্যত অপূর্ণ রয়ে গেছে।

ইরানের শাসকগোষ্ঠী এখনও ক্ষমতায় রয়েছে। সামরিক বাহিনী ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভেঙে পড়েনি। আর পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনাই এখন শুরু হতে চলেছে। অর্থাৎ যুদ্ধের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবে তা সম্ভব হয়নি।

চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাৎক্ষণিক দিক হল হরমুজ প্রণালী।

বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের একটি বড় অংশ এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে যায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেখানে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যায় এবং বিভিন্ন দেশের অর্থনীতির উপর চাপ সৃষ্টি হয়।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, নতুন চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালী আবার নিরাপদ হবে এবং তেলবাহী জাহাজ স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারবে। তাঁর মতে, এর ফলে বিশ্ববাজারে স্থিতিশীলতা ফিরবে এবং মার্কিন নাগরিকরাও জ্বালানির উচ্চমূল্যের চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি পাবেন।

তবে এখানেও মতবিরোধ রয়েছে।

ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, হরমুজ প্রণালী চিরকালের জন্য টোলমুক্ত থাকবে। কিন্তু ইরানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘায়ি সোমবার জানিয়েছেন, জাহাজ চলাচলের জন্য যে পরিষেবা দেওয়া হবে, তার বিনিময়ে ইরান অর্থ আদায় করতে পারে।

অর্থাৎ চুক্তির ব্যাখ্যা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনও সম্পূর্ণ ঐকমত্য গড়ে ওঠেনি।

এই সমঝোতার নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদ জানিয়েছে, শুক্রবার জেনেভায় দুই দেশের প্রতিনিধিরা আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থিত থেকে চুক্তিতে স্বাক্ষর করবেন। এরপর শুরু হবে ৬০ দিনের একটি নতুন আলোচনাপর্ব, যার উদ্দেশ্য একটি পূর্ণাঙ্গ শান্তি চুক্তি তৈরি করা।

কিন্তু সেই পথ মোটেই মসৃণ নয়।

ইরানের বিদেশমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে সামনে দুটি অত্যন্ত কঠিন প্রশ্ন অপেক্ষা করছে—মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির সীমারেখা নির্ধারণ।

দুই দেশ বহু বছর ধরে এই দুটি বিষয়ে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে। তেহরানের দাবি, নিষেধাজ্ঞা তুলে না নিলে স্থায়ী শান্তি সম্ভব নয়। অন্যদিকে ওয়াশিংটন মনে করে, পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছাড়া ইরানকে বিশ্বাস করা যাবে না।

আরাঘচি বলেছেন, অতীতের ভঙ্গ প্রতিশ্রুতি ও অবিশ্বাসের ইতিহাস ভবিষ্যতের আলোচনা আরও কঠিন করে তুলবে।

মার্কিন প্রশাসনও স্বীকার করছে যে এখনও বহু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।

মার্কিন উপরাষ্ট্রপতি জে ডি ভ্যান্স একটি সাক্ষাৎকারে বলেছেন, পরবর্তী আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় নির্ধারণ করতে হবে। বিশেষ করে ইরানের কাছে মজুত উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা এখনও অনির্ধারিত।

এই ইউরেনিয়াম নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বের উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। কারণ এটি ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়।

চুক্তির আরেকটি বড় ধোঁয়াশা লেবাননকে ঘিরে।

যুদ্ধ চলাকালীন ইজরায়েল বারবার ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এখন প্রশ্ন উঠছে, মার্কিন-ইরান সমঝোতার ফলে সেই সংঘর্ষও কি বন্ধ হবে?

ইরান এবং পাকিস্তান উভয়েই বলছে, চুক্তির আওতায় সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান বন্ধ হবে, যার মধ্যে লেবাননও রয়েছে।

কিন্তু মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, লেবানন থেকে ইজরায়েলি সেনা প্রত্যাহার এই চুক্তির কোনও শর্ত নয়।

এরপর আরও স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন ইজরায়েলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইজরায়েল কাটজ। তিনি জানিয়েছেন, তিনি এবং প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু দুজনেই লেবানন থেকে সেনা সরিয়ে নেওয়ার বিরোধী।

এই বক্তব্য প্রমাণ করে যে আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি হলেও মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর সংঘাত এখনও শেষ হয়ে যায়নি।

বরং বলা যায়, এটি যুদ্ধের সমাপ্তি নয়, যুদ্ধের পরবর্তী অধ্যায়ের সূচনা।

হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি, ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া শহর এবং বিপর্যস্ত অর্থনীতির পর এই চুক্তি অবশ্যই স্বস্তির খবর। কিন্তু শান্তি কেবল বন্দুক থামিয়ে আনা যায় না; তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সমাধান, পারস্পরিক আস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা।

সেই পরীক্ষাই এখন শুরু হতে চলেছে।

আগামী ৬০ দিনের আলোচনা নির্ধারণ করবে, এই যুদ্ধ সত্যিই ইতিহাসের পাতায় স্থান পাবে কি না, নাকি এটি কেবল আরও বড় কোনও সংঘাতের আগে সাময়িক বিরতি হিসেবেই স্মরণীয় হয়ে থাকবে।