Home বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ফেসবুকের উত্থানের অন্তরালের গল্প: কেন আজও প্রাসঙ্গিক ‘দ্য ফেসবুক এফেক্ট’

ফেসবুকের উত্থানের অন্তরালের গল্প: কেন আজও প্রাসঙ্গিক ‘দ্য ফেসবুক এফেক্ট’

Authored By Diptyajit Roy Chowdhury
26 views 4 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস

• মার্ক জাকারবার্গের উত্থান এবং ফেসবুকের জন্মকথার অন্যতম নির্ভরযোগ্য দলিল।

• শুধু প্রযুক্তি সংস্থার ইতিহাস নয়, এটি এক সামাজিক বিপ্লবেরও বিবরণ।

• প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারিয়ে কীভাবে ফেসবুক বিশ্বজুড়ে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করল, তার বিশদ বিশ্লেষণ।

• জাকারবার্গের ব্যক্তিত্ব, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন বইটির অন্যতম আকর্ষণ।

• প্রযুক্তি, ব্যবসা, সমাজ এবং ক্ষমতার সম্পর্ক বোঝার জন্য এখনও গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্য।

 

একবিংশ শতাব্দীর প্রথম দুই দশককে যদি কোনো একটি প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে থাকে, তবে তার নাম নিঃসন্দেহে ফেসবুক। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের যোগাযোগ, বন্ধুত্ব, রাজনীতি, সংবাদ গ্রহণ, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কের ধরনও বদলে দিয়েছে এই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম। কিন্তু কীভাবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসে শুরু হওয়া ছোট্ট উদ্যোগ কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের একটিতে পরিণত হল?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ডেভিড কার্কপ্যাট্রিকের লেখা ‘The Facebook Effect’ বইটি এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব।

বইটি প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে। তখনও ফেসবুক আজকের মতো সর্বগ্রাসী শক্তিতে পরিণত হয়নি। কিন্তু লেখক এমন এক সময়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছিলেন, যখন তার প্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গ এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা নিজেদের গল্প বলতে প্রস্তুত ছিলেন। ফলে বইটি কেবল বাইরের পর্যবেক্ষকের লেখা নয়; এটি অনেকটা ভিতরের মানুষের চোখে দেখা ফেসবুকের ইতিহাস।

বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হল এর বর্ণনার গতি। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মার্ক জাকারবার্গের একটি সাধারণ ধারণা কীভাবে ক্রমশ এক বিশ্বব্যাপী নেটওয়ার্কে রূপ নিল, সেই কাহিনি লেখক এমনভাবে বলেছেন যে তা উপন্যাসের মতো পড়া যায়। প্রথম দিকের প্রযুক্তিগত সমস্যা, বিনিয়োগ সংগ্রহের সংগ্রাম, সহ-প্রতিষ্ঠাতাদের দ্বন্দ্ব, প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে লড়াই—সবই এসেছে জীবন্তভাবে।

তবে বইটি শুধু একজন প্রতিভাবান উদ্যোক্তার সাফল্যের গল্প নয়। এটি মূলত একটি ধারণার গল্প। জাকারবার্গ বিশ্বাস করতেন, মানুষ নিজেদের পরিচয় এবং সম্পর্ককে অনলাইনে প্রকাশ করতে চায়। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি ফেসবুককে তৈরি করেছিলেন “মানুষকে সংযুক্ত করার” একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে।

বইটি পড়তে গিয়ে বোঝা যায়, ফেসবুকের সাফল্য শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত দক্ষতার ফল ছিল না। সে সময়ে অসংখ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল। কেউ ছবি শেয়ার করত, কেউ বন্ধুত্ব তৈরির সুযোগ দিত, কেউ আবার ব্যক্তিগত ব্লগিংয়ের ব্যবস্থা করত। কিন্তু ফেসবুক অন্যদের থেকে আলাদা ছিল একটি কারণে—এটি মানুষের বাস্তব পরিচয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল।

ফেসবুকের আগে ইন্টারনেটের অনেকটাই ছিল ছদ্মনামের জগৎ। সেখানে মানুষ নিজের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখত। জাকারবার্গ এই প্রবণতার বিপরীতে হাঁটলেন। তিনি মনে করতেন, প্রকৃত পরিচয়ের ভিত্তিতে গড়া নেটওয়ার্ক অনেক বেশি শক্তিশালী হবে। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, তাঁর ধারণা ভুল ছিল না।

বইটির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হল জাকারবার্গের চরিত্র বিশ্লেষণ। তিনি প্রচলিত অর্থে কর্পোরেট প্রধান ছিলেন না। ব্যবসায়িক পোশাক, ঝকঝকে বক্তৃতা কিংবা জনসংযোগের চর্চা—এসবের চেয়ে তিনি বেশি মনোযোগ দিয়েছিলেন পণ্যের উন্নতিতে। বইয়ে বারবার দেখা যায়, তিনি জনপ্রিয়তার চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যকে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

এখানেই বইটি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ লেখক দেখিয়েছেন, অনেক সময় জাকারবার্গ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যা বিনিয়োগকারী বা সহযোগীদের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে হয়েছে। কিন্তু তাঁর বিশ্বাস ছিল, যদি ব্যবহারকারীর অভিজ্ঞতা উন্নত করা যায়, তাহলে ব্যবসায়িক সাফল্য নিজেই আসবে।

বইটিতে ফেসবুকের বিস্তারের আন্তর্জাতিক মাত্রাও তুলে ধরা হয়েছে। কীভাবে এটি আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুরু করে ইউরোপ, এশিয়া, লাতিন আমেরিকা এবং আফ্রিকার কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠল, তার বিশদ বিবরণ রয়েছে। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশে স্থানীয় প্রতিদ্বন্দ্বীদের হারানোর কৌশল বইটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

তবে ‘The Facebook Effect’  পুরোপুরি নিরপেক্ষ বই নয়—এমন সমালোচনাও রয়েছে। অনেক সমালোচকের মতে, লেখক ফেসবুকের প্রতি কিছুটা সহানুভূতিশীল ছিলেন। তথ্য গোপনীয়তা, নজরদারি, ভুল তথ্যের বিস্তার, রাজনৈতিক প্রভাব—এসব বিতর্ক পরে যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, বইটিতে তা স্বাভাবিকভাবেই অনুপস্থিত বা সীমিত।

এখানেই বইটির একটি ঐতিহাসিক মূল্য রয়েছে। এটি এমন এক সময়ের দলিল, যখন ফেসবুককে এখনও মূলত উদ্ভাবন এবং সংযোগের প্রতীক হিসেবে দেখা হত। পরবর্তী দশকে প্রতিষ্ঠানটি যেসব বিতর্কের মুখে পড়েছে, সেগুলোর আলোকে বইটি পড়লে এক ধরনের নাটকীয় বৈপরীত্য চোখে পড়ে।

আজকের পাঠকের কাছে তাই বইটির গুরুত্ব দ্বিমুখী। একদিকে এটি বিশ্বের অন্যতম সফল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের জন্ম ও বিকাশের ইতিহাস। অন্যদিকে এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রথমে কী স্বপ্ন নিয়ে শুরু করেছিল এবং পরে সেই স্বপ্ন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে কীভাবে বদলে গেছে।

ভাষার দিক থেকে বইটি সহজ, তথ্যসমৃদ্ধ এবং গবেষণাভিত্তিক। প্রযুক্তি সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান না থাকলেও পাঠক সহজেই এর সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারবেন। ব্যবসা, প্রযুক্তি, সমাজবিজ্ঞান কিংবা গণমাধ্যম—যে ক্ষেত্রেরই পাঠক হোন না কেন, বইটি আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে।

সবশেষে বলা যায়, ‘The Facebook Effect’  কেবল ফেসবুকের ইতিহাস নয়; এটি ডিজিটাল যুগের উত্থানের ইতিহাস। এটি এমন এক সময়ের গল্প, যখন কয়েকজন তরুণ বিশ্বাস করেছিলেন যে মানুষকে অনলাইনে সংযুক্ত করা গেলে সমগ্র পৃথিবী বদলে যেতে পারে। সেই বিশ্বাস কতটা সফল হয়েছে, কতটা ব্যর্থ হয়েছে—তা নিয়ে বিতর্ক চলতেই পারে। কিন্তু সেই বিপ্লবের সূচনাকালকে বুঝতে চাইলে ‘The Facebook Effect’ এখনও অন্যতম অপরিহার্য বই।

রায়: প্রযুক্তি, উদ্যোক্তা-চিন্তা এবং আধুনিক সমাজের রূপান্তর নিয়ে আগ্রহী যে কোনো পাঠকের জন্য এটি অবশ্যপাঠ্য। ফেসবুককে ভালোবাসুন বা ঘৃণা করুন—ফেসবুককে বোঝার জন্য এই বই পড়তেই হবে।

 

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles