হাইলাইটস:

  • সায়নী ঘোষের দলত্যাগকে ব্যক্তিগত আঘাত বলে বর্ণনা করলেন মহুয়া মৈত্র।
  • বিদ্রোহী বিধায়কদের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ, “সাহস থাকলে পদত্যাগ করে ভোটে লড়ুন”।
  • মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বের প্রতি পূর্ণ আস্থা প্রকাশ।
  • বিরোধী দলনেতা ও চিফ হুইপ নিয়োগ নিয়ে আইনি লড়াইয়ে আশাবাদী তৃণমূল সাংসদ।
  • ইন্ডিয়া জোটে তৃণমূলের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়েও স্পষ্ট বার্তা।

বাংলাস্ফিয়ার: তৃণমূল কংগ্রেসের ইতিহাসে সম্ভবত সবচেয়ে অস্থির সময়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে দলের অন্যতম মুখপাত্র ও কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্র এমন এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, যা কেবল রাজনৈতিক অবস্থান নয়, তাঁর ব্যক্তিগত আঘাত, ক্ষোভ এবং ভবিষ্যৎ কৌশলও স্পষ্ট করে দেয়। বিদ্রোহী বিধায়কদের দলছাড়া, সায়নী ঘোষের অবস্থান পরিবর্তন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকা— সবকিছু নিয়েই তিনি খোলাখুলি কথা বলেছেন।

সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে আলোচিত অংশ অবশ্যই সায়নী ঘোষকে নিয়ে। মহুয়ার কথায়, “সায়নী আমার মেয়ের মতো ছিল। ওর চলে যাওয়া আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছে।” রাজনৈতিক দলবদল ভারতীয় রাজনীতিতে নতুন নয়, কিন্তু সবার প্রস্থান সমানভাবে আঘাত করে না। মহুয়ার বক্তব্যে স্পষ্ট, সায়নীর ক্ষেত্রে বিষয়টি কেবল রাজনৈতিক ছিল না, ছিল ব্যক্তিগত বিশ্বাসের প্রশ্নও। তিনি আক্ষেপ করে বলেন,

“যখন সায়নীর মতো মানুষও মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন আপনি কাকে বিশ্বাস করবেন? এটা খুবই কষ্টের।”

এই বক্তব্যের মধ্যে শুধু একজন নেত্রীর হতাশা নেই; রয়েছে তৃণমূলের বর্তমান সংকটের প্রতিচ্ছবি। গত কয়েক সপ্তাহে দলের একের পর এক বিধায়ক বিদ্রোহী শিবিরে নাম লেখানোয় তৃণমূলের ভিত নড়ে গেছে। কিন্তু মহুয়ার মতে, এই বিদ্রোহ নীতিগত নয়, বরং সুবিধাবাদী রাজনীতির ফল।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, যদি বিদ্রোহীদের সত্যিই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এত আপত্তি থাকত, তাহলে তাঁরা আগেই দল ছেড়ে বেরিয়ে যেতেন। তাঁর যুক্তি, বিজেপির বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যা করেছিলেন, সেটাই ছিল রাজনৈতিকভাবে সৎ পথ। তিনি দল ছেড়েছিলেন, নির্বাচনে লড়েছিলেন এবং জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় এসেছেন। বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়কদের ক্ষেত্রেও একই নৈতিকতার দাবি করেন মহুয়া।

মহুয়ার ভাষায়,

“সাহস থাকলে পদত্যাগ করুন, তারপর অন্য প্রতীকে ভোটে লড়ুন। কিন্তু তৃণমূলের প্রতীকে জিতে এসে পরে দল দখলের চেষ্টা করা গণতান্ত্রিক নয়।”

বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে তাঁর আরেকটি অভিযোগ, তাঁরা ভোটারদের দেওয়া ম্যান্ডেটকে অস্বীকার করছেন। ভোটাররা তাঁদের ব্যক্তিগত পরিচয়ে নয়, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূলের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত করেছিলেন। ফলে দলীয় প্রতীক ও নেত্রীর জনপ্রিয়তা ব্যবহার করে জিতে এসে পরে অন্য অবস্থান নেওয়া ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণার সামিল বলেই মনে করেন তিনি।

সাক্ষাৎকারে বিরোধী দলনেতা (এলওপি) এবং চিফ হুইপ নিয়োগ নিয়েও বিস্তারিত কথা বলেছেন মহুয়া। বর্তমানে এই ইস্যু আদালতে বিচারাধীন। মহুয়ার দাবি, আইন স্পষ্টভাবে বলে যে বিরোধী দলনেতা এবং চিফ হুইপ নির্ধারণ করবে রাজনৈতিক দল, বিধায়ক দল নয়। তাই বিদ্রোহী শিবিরের পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত আদালতে টিকবে না বলেই তাঁর বিশ্বাস।

তাঁর বক্তব্য, ভারতের দলত্যাগ বিরোধী আইনও রাজনৈতিক দলের কর্তৃত্বকেই স্বীকৃতি দেয়। ফলে শুধুমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠ বিধায়কের সমর্থন থাকলেই কোনও গোষ্ঠী দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থানকে অগ্রাহ্য করতে পারে না। এই কারণেই তৃণমূল আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত আইনি জয় তাদেরই হবে বলে তিনি মনে করেন।

অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ঘিরে যে অসন্তোষের কথা বিদ্রোহীরা বলছেন, তা নিয়েও মহুয়া সরব। তাঁর মতে, অভিষেককে সামনে রেখে বিদ্রোহের যুক্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তবে এর পিছনে রয়েছে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ক্ষমতার লড়াই। তিনি ইঙ্গিত দেন, অনেকেই দলের মধ্যে নিজেদের প্রত্যাশিত গুরুত্ব না পেয়ে অন্য পথ বেছে নিয়েছেন।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব নিয়ে অবশ্য মহুয়ার অবস্থান একেবারে স্পষ্ট। তিনি মনে করেন, এখনও তৃণমূলের সবচেয়ে বড় সম্পদ মমতা নিজেই। রাজনৈতিক সংকট যতই গভীর হোক, দলের মূল সমর্থনভিত্তি এখনও তাঁর সঙ্গেই রয়েছে। অতীতেও তৃণমূল বহুবার ভাঙনের মুখে পড়েছে, কিন্তু প্রতিবারই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা দলকে টেনে তুলেছে।

সাক্ষাৎকারে ইন্ডিয়া জোট নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক, ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সমীকরণ এবং বিরোধী ঐক্য নিয়ে নানা জল্পনা থাকলেও মহুয়া স্পষ্ট করে দেন যে তিনি তৃণমূল কংগ্রেসের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গেই আছেন। দলীয় অবস্থান থেকে বিচ্যুত হওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই।

তবে পুরো সাক্ষাৎকারে সবচেয়ে লক্ষণীয় বিষয় হল রাজনৈতিক যুক্তির পাশাপাশি আবেগের উপস্থিতি। সাধারণত মহুয়া মৈত্রকে দেখা যায় তীক্ষ্ণ ভাষায় আক্রমণ শানাতে। কিন্তু এই সাক্ষাৎকারে তাঁর মধ্যে এক ধরনের আহত বিশ্বাসের সুর শোনা যায়। বিশেষ করে সায়নী ঘোষকে নিয়ে তাঁর মন্তব্যগুলি প্রমাণ করে যে রাজনৈতিক সম্পর্কের আড়ালেও ব্যক্তিগত বন্ধন তৈরি হয়, আর সেই বন্ধন ভেঙে গেলে আঘাতটা অনেক গভীর হয়।

তৃণমূলের বর্তমান সংকট কতটা সাময়িক আর কতটা স্থায়ী, তা সময় বলবে। কিন্তু মহুয়া মৈত্রের এই সাক্ষাৎকার স্পষ্ট করে দিয়েছে যে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এখনও বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে আপসের পথ নয়, রাজনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের পথই বেছে নিয়েছে। একই সঙ্গে তিনি এটাও বুঝিয়ে দিয়েছেন যে সংখ্যার অঙ্কের চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে বিশ্বাসের প্রশ্ন। আর সেই কারণেই তাঁর সবচেয়ে স্মরণীয় মন্তব্যটি সম্ভবত এটিই— “যখন সায়নীর মতো মানুষও মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন আপনি কাকে বিশ্বাস করবেন?”  

সূত্র: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত মহুয়া মৈত্রের একান্ত সাক্ষাৎকার।