Table of Contents
হাইলাইটস:
- বিরোধী দলনেতা নির্বাচন সংক্রান্ত প্রস্তাবে জাল স্বাক্ষরের অভিযোগের মামলায় তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিন সপ্তাহের অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিল কলকাতা হাইকোর্ট।
- বিচারপতি কৌশিক চন্দের নির্দেশ, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় সিআইডির সামনে হাজির হয়ে তদন্তে সহযোগিতা করতে হবে।
- আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ, কোনও অভিযুক্তকে এমন নথি জমা দিতে বাধ্য করা যায় না যা তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
- আদালত বলেছে, সংবিধানের ২০ নম্বর অনুচ্ছেদ অভিযুক্তকে নিজের দোষ স্বীকারে বাধ্য করার বিরুদ্ধে সুরক্ষা দেয়।
- সিআইডিকে আদালতের নির্দেশ, প্রয়োজনীয় নথি উদ্ধারের জন্য আইনসম্মত অনুসন্ধান ও জব্দের পথেই এগোতে হবে।
বাংলাস্ফিয়ার: বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্ট তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে জোরপূর্বক পদক্ষেপ থেকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা প্রদান করেছে। বিধানসভা নির্বাচনের পর বিরোধী দলনেতা নিয়োগ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবে নবনির্বাচিত তৃণমূল বিধায়কদের স্বাক্ষর জাল করার অভিযোগে যে মামলা চলছে, সেই মামলাতেই এই নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
বিচারপতি কৌশিক চন্দের একক বেঞ্চ নির্দেশ দেয় যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় পশ্চিমবঙ্গ সিআইডির তদন্তকারীদের সামনে হাজির হতে হবে এবং তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করতে হবে। একই সঙ্গে আদালত পরবর্তী তিন সপ্তাহ তাঁর বিরুদ্ধে কোনও রকম জবরদস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
মামলার পটভূমি
অভিযোগ, বিধানসভা নির্বাচনের পর বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের বিষয়ে তৃণমূল বিধায়কদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করে একটি প্রস্তাব তৈরি করা হয়েছিল। সেই প্রস্তাব এবং তার সঙ্গে সংযুক্ত উপস্থিতি তালিকায় একাধিক বিধায়কের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে।
এই অভিযোগের তদন্তে এর আগেই পশ্চিমবঙ্গ সিআইডি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাসভবন-সংলগ্ন তৃণমূল কংগ্রেসের দলীয় কার্যালয়ে তল্লাশি চালিয়েছিল।
অভিষেকের পক্ষে কী যুক্তি দেওয়া হয়?
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আইনজীবী আদালতে যুক্তি দেন যে মামলায় মূল অভিযোগ জালিয়াতি ও প্রতারণা সংক্রান্ত। সংশ্লিষ্ট সময়ে অভিষেক কোনও বিধায়ক ছিলেন না; তিনি কেবল দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তাঁদের বক্তব্য, নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিধায়কদের মধ্যে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিল এবং দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে অভিষেক সেই সিদ্ধান্তের কথাই স্পিকারকে জানিয়েছিলেন।
আদালত প্রশ্ন তোলে, একজন সাংসদ হিসেবে নয়, তিনি কেন স্পিকারকে চিঠি লিখেছিলেন? এর জবাবে তাঁর আইনজীবী জানান, তিনি তা করেছিলেন শুধুমাত্র দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে।
রাজ্যের বক্তব্য
রাজ্যের পক্ষে অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল রাজদীপ মজুমদার আদালতে বলেন, তদন্তে বেশ কিছু গুরুতর অসঙ্গতি সামনে এসেছে।
তাঁর দাবি, প্রথমে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় স্পিকারকে বিরোধী দলনেতা নির্বাচনের বিষয়ে চিঠি দেন, কিন্তু সেই চিঠির সঙ্গে বৈঠকের কার্যবিবরণী বা অন্য কোনও সমর্থনকারী নথি সংযুক্ত ছিল না। পরে স্পিকার নথি চাওয়ার পর একটি প্রস্তাবপত্র ও স্বাক্ষরযুক্ত উপস্থিতি তালিকা জমা দেওয়া হয়।
রাজ্যের অভিযোগ, ওই নথিতে দাবি করা হয়েছে যে ৬ মে একটি বৈঠক হয়েছিল। কিন্তু একাধিক বিধায়ক তদন্তকারীদের জানিয়েছেন যে ওই দিনে কোনও বৈঠকই হয়নি এবং তাঁরা কোনও নথিতে স্বাক্ষরও করেননি।
রাজ্যের আরও দাবি, অন্তত পাঁচজন বিধায়ক নথিতে থাকা স্বাক্ষরের সত্যতা অস্বীকার করেছেন। এমনকি তাঁদের মনোনয়নপত্রে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে তুলনা করে উল্লেখযোগ্য অমিলও পাওয়া গেছে।
সিআইডির পক্ষ থেকে বলা হয়, বারবার নোটিস দেওয়া সত্ত্বেও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় মূল প্রস্তাবপত্র জমা দেননি। তাই সেই নথি উদ্ধারের জন্য তাঁকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।
আদালতের গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ
তবে আদালত বারবার প্রশ্ন তোলে, কোনও নথি উদ্ধার করার জন্য হেফাজতে নেওয়া কেন প্রয়োজন?
বিচারপতি চন্দ মন্তব্য করেন যে তদন্তকারী সংস্থার কাছে অনুসন্ধান (Search) ও জব্দ (Seizure)-এর পর্যাপ্ত আইনি ক্ষমতা রয়েছে। সেক্ষেত্রে অভিযুক্তকে হেফাজতে নিয়ে নথি উদ্ধারের যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
এক পর্যায়ে আদালত স্পষ্ট ভাষায় বলে: “একটি নথি পাওয়ার জন্য আপনি কাউকে জেরা করতে পারেন না। কোনও অভিযুক্তকে নিজের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে বাধ্যও করতে পারেন না।”
আদালত আরও জানায়, তদন্তকারী সংস্থা যদি কোনও নথি উদ্ধার করতে চায়, তবে তাদের আইনসম্মত অনুসন্ধান ও জব্দের(search and seizure) পথেই এগোতে হবে। অভিযুক্তকে সেই নথি জমা দিতে বাধ্য করা যাবে না।
রাজ্যের পক্ষ থেকে যখন দাবি করা হয় যে অভিযুক্তকে কোনও সুরক্ষা দেওয়া উচিত নয়, তখন বিচারপতি চন্দ বলেন:
“আমাকে একটি আইন দেখান যেখানে বলা আছে তদন্তকারী সংস্থা কোনও অভিযুক্তকে নথি দিতে বাধ্য করতে পারে। এমন কোনও বিধান নেই। আপনাদের অনুসন্ধান ও জব্দের পথেই যেতে হবে।”
সংবিধানের ২০ নম্বর অনুচ্ছেদের উল্লেখ
শুনানির সময় আদালত বিশেষভাবে সংবিধানের ২০ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা উল্লেখ করে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনও অভিযুক্তকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিতে বা নিজের দোষ স্বীকারে বাধ্য করা যায় না।
আদালতের মতে, যদি কোনও নথি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে, তাহলে তাকে সেই নথি জমা দিতে বাধ্য করা সংবিধান-প্রদত্ত সুরক্ষার পরিপন্থী হবে।
আদালতের চূড়ান্ত নির্দেশ
যদিও আদালত স্বীকার করেছে যে বিধানসভার মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত নথিতে জাল স্বাক্ষরের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং তার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত হওয়া উচিত, তবুও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তদন্তে সহযোগিতা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে আদালত তাঁকে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আদালত নির্দেশ দিয়েছে—
- অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টায় তদন্তকারীদের সামনে হাজির হতে হবে।
- ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে ২৪ ঘণ্টার নোটিস দিয়ে তাঁকে ডাকা যাবে।
- তদন্তকারী সংস্থা আইন অনুযায়ী জিজ্ঞাসাবাদ, অনুসন্ধান, জব্দ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে পারবে।
- তবে আগামী তিন সপ্তাহ তাঁর বিরুদ্ধে কোনও জোরপূর্বক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না।
মামলাটি দুই সপ্তাহ পরে পুনরায় শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে।
কেন এই পর্যবেক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ?
এই আদেশের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হল আদালতের সেই মন্তব্য, যেখানে বলা হয়েছে যে তদন্তের স্বার্থেও কোনও অভিযুক্তকে নিজের বিরুদ্ধে প্রমাণ সংগ্রহে বাধ্য করা যায় না। আদালত কার্যত স্পষ্ট করে দিয়েছে যে তদন্তকারী সংস্থার ক্ষমতা বিস্তৃত হলেও তা সংবিধান-নির্ধারিত মৌলিক অধিকারের ঊর্ধ্বে নয়।
ফলে এই মামলার তাৎপর্য শুধু অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্তর্বর্তী সুরক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অভিযুক্তের নিজের দোষ স্বীকারে বাধ্য না হওয়ার সাংবিধানিক অধিকারের প্রশ্নেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক পর্যবেক্ষণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।