হাইলাইটস:

  • সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, গৃহিণীর ঘরোয়া পরিচর্যা ও গৃহস্থালি কাজের ক্ষতি একটি স্বতন্ত্র ও ক্ষতিপূরণযোগ্য ক্ষতির শিরোনাম (head of damages)।
  • মোটর দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ মামলায় গৃহিণীর গৃহস্থালি সেবার মূল্য মাসে ন্যূনতম ৩০,০০০ টাকা হিসেবে গণ্য করতে হবে।
  • বিচারপতি সঞ্জয় করোল বলেছেন, একজন গৃহিণী শুধু পরিবার নয়, জাতি গঠনেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।
  • ‘লস অফ ডোমেস্টিক কেয়ার’ (Loss of Domestic Care) ক্ষতিপূরণের একটি অতিরিক্ত ভিত্তি হবে, যা আগে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণের শিরোনামগুলির বাইরে।
  • আদালত মোটর দুর্ঘটনা দাবি ট্রাইব্যুনালগুলিকে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছে।

বাংলাস্ফিয়ার: ভারতের সুপ্রিম কোর্ট এক যুগান্তকারী রায়ে ঘোষণা করেছে যে, একজন গৃহিণীর দ্বারা পরিবারকে দেওয়া ঘরোয়া পরিচর্যা ও গৃহস্থালি সেবার ক্ষতি একটি স্বতন্ত্র এবং ক্ষতিপূরণযোগ্য ক্ষতি হিসেবে স্বীকৃত হবে। আদালত আরও বলেছে, মোটর দুর্ঘটনায় কোনও গৃহিণীর মৃত্যু বা গুরুতর অক্ষমতার ফলে পরিবার যে গৃহস্থালি সেবা থেকে বঞ্চিত হয়, তার আর্থিক মূল্যায়ন মাসিক ন্যূনতম ৩০,০০০ টাকা হিসেবে ধরা উচিৎ।

মোটর দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত একটি আপিল মামলার শুনানিতে বিচারপতি সঞ্জয় করোল এবং বিচারপতি এন. কে. সিংহের বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করে।

রায় ঘোষণা করতে গিয়ে বিচারপতি সঞ্জয় করোল বলেন—

“আমাদের মত হল, একজন গৃহিণী শুধু একজন মানুষকেই গড়ে তোলেন না, তিনি জাতির বিকাশেও অবদান রাখেন। একজন হোমমেকার জাতি গড়ে তোলেন। সেই কারণেই আমরা নীতিগত দিকগুলি নির্ধারণ করেছি। জাতি-গঠনের অংশীদার হিসেবে আমরা গৃহিণীর ক্ষেত্রে ‘গৃহস্থালি পরিচর্যার ক্ষতি’র মূল্য নির্ধারণ করেছি, যা মাসে ন্যূনতম ৩০,০০০ টাকা হবে।”

‘লস অফ ডোমেস্টিক কেয়ার’ হবে ক্ষতিপূরণের নতুন ভিত্তি

সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, গৃহিণীর মৃত্যু বা অক্ষমতার কারণে পরিবারের সদস্যরা যে পরিচর্যা, যত্ন, সন্তান প্রতিপালন, বয়স্কদের দেখাশোনা এবং দৈনন্দিন গৃহস্থালি ব্যবস্থাপনা থেকে বঞ্চিত হন, সেটি কেবল আবেগগত ক্ষতি নয়; এর একটি বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে।

এই কারণে আদালত বলেছে যে “Loss of Domestic Care” বা “গৃহস্থালি পরিচর্যার ক্ষতি” মোটর দুর্ঘটনা ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি স্বতন্ত্র ক্ষতিপূরণযোগ্য শিরোনাম হিসেবে গণ্য হবে।

বিচারপতি করোল জানান, এটি সেইসব ক্ষতিপূরণের শিরোনামের অতিরিক্ত, যেগুলি আগে সুপ্রিম কোর্টের বিখ্যাত National Insurance Co. Ltd. v. Pranay Sethi মামলায় নির্ধারিত হয়েছিল।

অর্থাৎ ভবিষ্যতে মোটর দুর্ঘটনা মামলায় ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের সময় শুধু আয় হারানোর হিসাব নয়, পরিবারের হারানো গৃহস্থালি পরিচর্যা ও যত্নের মূল্যও আলাদাভাবে বিবেচিত হবে।

গৃহিণীকে ‘জাতি-গঠনের কারিগর’ হিসেবে স্বীকৃতি

রায়ের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হল গৃহিণীর সামাজিক ভূমিকা সম্পর্কে আদালতের মন্তব্য।

দীর্ঘদিন ধরে সমাজে গৃহস্থালি শ্রমকে “অবৈতনিক” বা “অর্থনৈতিক মূল্যহীন” হিসেবে দেখা হয়েছে। আদালত সেই ধারণাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে।

বিচারপতি করোল বলেন— “আমরা আশা করি এবং বিশ্বাস করি, ‘হোমমেকার’ শব্দটি এখন থেকে ‘নেশন বিল্ডার’ বা জাতি-গঠনের কারিগর হিসেবেও স্বীকৃতি পাবে।”

আদালতের মতে, একজন গৃহিণী সন্তানদের মানুষ করেন, পরিবারের সুস্থতা নিশ্চিত করেন, সামাজিক মূল্যবোধের ভিত্তি গড়ে তোলেন এবং পরোক্ষভাবে দেশের মানবসম্পদ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাই তাঁর শ্রমকে শুধুমাত্র ‘ঘরের কাজ’ বলে খাটো করে দেখা যায় না।

২০২৪ সালের গুরুত্বপূর্ণ রায়ের ধারাবাহিকতা

এই রায় আসলে সুপ্রিম কোর্টের পূর্ববর্তী অবস্থানেরই আরও শক্তিশালী সম্প্রসারণ।

২০২৪ সালের একটি উল্লেখযোগ্য মামলায় সুপ্রিম কোর্ট বলেছিল যে, গৃহিণীরা কাজ করেন না এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল।

সেই মামলায় আদালত নির্দেশ দিয়েছিল যে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের সময় একজন গৃহিণীর “ধারণাগত আয়” (deemed income) কোনও অবস্থাতেই একজন দৈনিক মজুরের জন্য সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির চেয়ে কম ধরা যাবে না।

বর্তমান রায়ে আদালত আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে গৃহস্থালি পরিচর্যার আর্থিক মূল্যকে আলাদাভাবে স্বীকৃতি দিল এবং তার ন্যূনতম পরিমাণও নির্ধারণ করে দিল।

ফলে গৃহিণীদের অবৈতনিক শ্রমকে অর্থনৈতিক কাঠামোর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করার বিচারিক প্রবণতা আরও শক্তিশালী হল।

মোটর দুর্ঘটনা মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির নির্দেশ

রায়ে শুধু ক্ষতিপূরণের নীতি নয়, মোটর দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলাগুলির দীর্ঘসূত্রিতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সুপ্রিম কোর্ট।

আদালত উল্লেখ করেছে যে মোটর যান আইন (Motor Vehicles Act)-এর ১৬৯ নম্বর ধারা অনুযায়ী মোটর দুর্ঘটনা দাবি ট্রাইব্যুনালের (MACT) কার্যক্রম একটি সংক্ষিপ্ত ও দ্রুত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে বহু ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ পেতে ভুক্তভোগীদের বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়।

এই প্রেক্ষাপটে আদালত আশা প্রকাশ করেছে যে ধারা ১৬৯-এর বিধান “অক্ষরে ও আত্মায়” কার্যকর করা হবে।

হাই কোর্টগুলির প্রধান বিচারপতিদের প্রতি বার্তা

সুপ্রিম কোর্ট আরও বলেছে যে দেশের বিভিন্ন হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতিরা মোটর দুর্ঘটনা সংক্রান্ত মামলাগুলির অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করবেন বলে তাদের প্রত্যাশা।

এর উদ্দেশ্য হল—

  • মামলার অযথা বিলম্ব রোধ করা,
  • ক্ষতিপূরণ দ্রুত নির্ধারণ করা,
  • ট্রাইব্যুনালগুলির কার্যকারিতা বাড়ানো,
  • এবং এই রায়ে নির্ধারিত নীতিগুলির যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

কেন এই রায় ঐতিহাসিক?

এই রায়ের গুরুত্ব কেবল মোটর দুর্ঘটনা আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এটি ভারতীয় বিচারব্যবস্থার পক্ষ থেকে একটি স্পষ্ট স্বীকৃতি যে গৃহিণীর শ্রম অদৃশ্য নয়, মূল্যহীন নয় এবং শুধুমাত্র ভালোবাসা বা কর্তব্যের বিষয়ও নয়; এর একটি বাস্তব অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে।

দশকের পর দশক ধরে দেশের কোটি কোটি নারী যে অবৈতনিক গৃহস্থালি শ্রম করে চলেছেন, সেই শ্রমকে আইনি ও অর্থনৈতিক মর্যাদা দেওয়ার পথে এটি একটি বড় পদক্ষেপ।

সুপ্রিম কোর্টের ভাষায়, একজন গৃহিণী কেবল একটি পরিবারের দেখভাল করেন না; তিনি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলেন, মানবসম্পদ তৈরি করেন এবং সেই অর্থে তিনি একজন “Nation Builder” বা জাতি-গঠনের কারিগর।

এই কারণেই তাঁর হারিয়ে যাওয়া শ্রম, যত্ন এবং পরিচর্যাকে এখন থেকে আইনও একটি স্বতন্ত্র ক্ষতি হিসেবে গণ্য করবে এবং তার যথাযথ আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করবে।