হাইলাইটস:

  • রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হতেই ফের সোনিয়া গান্ধির শরণাপন্ন হওয়ার জল্পনা।
  • ২০০১ সাল থেকে একাধিকবার কংগ্রেস নেতৃত্বের সহায়তা নিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
  • বর্তমান সংকট আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গভীর ও অস্তিত্বের প্রশ্নে পরিণত।
  • সোনিয়া চাইলে সংসদীয় ও আইনি স্তরে কিছুটা সময় কিনে দিতে পারেন, কিন্তু সংগঠনগত ভাঙন রোখা কঠিন।
  • মমতার আসল লক্ষ্য হতে পারে রাজনৈতিক বৈধতা, নৈতিক সমর্থন এবং দিল্লির বিরোধী শিবিরকে নিজের পাশে রাখা।

বাংলাস্ফিয়ার: বাংলার রাজনীতিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সবচেয়ে বড় শক্তি কী? অনেকেই বলবেন জনসংযোগ, কেউ বলবেন লড়াকু মনোভাব, কেউ বা বলবেন তাঁর রাজনৈতিক প্রবৃত্তি। কিন্তু আরও একটি শক্তি আছে, যেটা প্রায়শই আড়ালে থেকে যায়। সেটা হল সংকটের সময় সঠিক দরজায় কড়া নাড়ার ক্ষমতা।

আর সেই দরজাগুলির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি হল সোনিয়া গান্ধির দরজা।

রাজনৈতিক মহলে এখন জোর জল্পনা, দলের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ, বিধায়ক ভাঙন, সাংসদদের অসন্তোষ এবং আইনি চাপে জর্জরিত পরিস্থিতিতে মমতা আবারও কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কেন?

এর উত্তর খুঁজতে গেলে একটু পিছনে ফিরতে হয়।

২০০১: প্রথম বড় আশ্রয়

২০০১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আগে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন। একদিকে তিনি সদ্য কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূল গড়েছেন, অন্যদিকে বামফ্রন্টের বিরুদ্ধে একা লড়ার মতো শক্তি তখনও তৈরি হয়নি।

সেই সময় দিল্লিতে সোনিয়া গান্ধির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা তাঁর জন্য ছিল রাজনৈতিক প্রয়োজন। কংগ্রেসের একাংশকে পাশে রাখা, বিজেপির সঙ্গে দূরত্বের ভারসাম্য রক্ষা করা এবং নিজেকে বৃহত্তর বিরোধী রাজনীতির অংশ হিসেবে তুলে ধরতে সোনিয়ার নীরব সমর্থন তাঁর কাজে এসেছিল।

পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন, ইউপিএ-১, ইউপিএ-২, এমনকি ২০১২ সালে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পরও ব্যক্তিগত স্তরে সোনিয়া ও মমতার যোগাযোগ পুরোপুরি ভাঙেনি।

রাজনীতিতে সম্পর্কের মূল্য অনেক। আর মমতা সেই মূল্যটা বরাবর বুঝেছেন।

এবারের সংকট কেন আলাদা?

এবারের সমস্যা কিন্তু কেন্দ্রের কোনও সরকার বা বিরোধী দলের সঙ্গে নয়। এবারের সমস্যা দলের ভেতরে। রাজনীতির ইতিহাস বলে, বাইরের আক্রমণ প্রতিহত করা সহজ, ভেতরের বিদ্রোহ সামলানো কঠিন। যখন বিরোধীরা আক্রমণ করে, তখন কর্মীরা নেতার চারপাশে জড়ো হন। কিন্তু যখন নিজেরাই দল ছাড়তে শুরু করেন, তখন নেতৃত্বের অস্তিত্বই প্রশ্নের মুখে পড়ে।

আজ মমতার সামনে সেই চ্যালেঞ্জ।

বিদ্রোহী বিধায়কদের সংখ্যা নিয়ে যতই বিতর্ক থাকুক, বাস্তব হল দলের অভ্যন্তরে অসন্তোষের আগুন আর গোপন নেই। বহু নেতা প্রকাশ্যে না বললেও নিজেদের অবস্থান বদলাচ্ছেন।

এই পরিস্থিতিতে সোনিয়া গান্ধি কোনও “ম্যাজিক ওয়ান্ড” নন। তিনি ফোন করে বিদ্রোহী বিধায়কদের ফিরিয়ে আনতে পারবেন না।

তাহলে মমতা তাঁর কাছে কী চাইতে পারেন?

প্রথম লক্ষ্য: রাজনৈতিক বৈধতা

রাজনীতিতে অনেক সময় বাস্তবতার মতোই গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক।

যদি সোনিয়া গান্ধি প্রকাশ্যে বা নীরবে মমতার পাশে দাঁড়ান, তাহলে একটি বার্তা যাবে—মমতা এখনও সর্বভারতীয় বিরোধী রাজনীতির গ্রহণযোগ্য মুখ।

এটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বর্তমানে তাঁর বিরোধীরা চেষ্টা করছেন তাঁকে একঘরে প্রমাণ করতে। দিল্লিতে যদি কংগ্রেস নেতৃত্ব বলে, “মমতা এখনও আমাদের মিত্র”, তাহলে সেই একঘরে করার প্রচেষ্টা অন্তত আংশিকভাবে ব্যর্থ হবে।

দ্বিতীয় লক্ষ্য: সংসদীয় রসদ

ধরা যাক, সংসদে তৃণমূলের একাংশ আলাদা অবস্থান নিল। সেক্ষেত্রে কংগ্রেসের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।লোকসভা ও রাজ্যসভায় বিরোধী রাজনীতির অনেক হিসাবই শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে কে কাকে সমর্থন করছে তার ওপর। মমতা চাইতেই পারেন, কংগ্রেস যেন প্রকাশ্যে বিদ্রোহীদের স্বীকৃতি না দেয় কিংবা তাদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখে। এতে অন্তত দিল্লিতে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান কিছুটা শক্তিশালী থাকবে।

তৃতীয় লক্ষ্য: সময় কেনা

রাজনীতিতে কখনও কখনও জেতার চেয়ে সময় কেনা বেশি জরুরি। একজন অভিজ্ঞ নেতা হিসেবে মমতা জানেন, আজ যে নেতা বিদ্রোহী, তিনি ছয় মাস পরে অন্য অবস্থানেও যেতে পারেন। তাই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য হতে পারে পরিস্থিতি স্থিতিশীল করা। সোনিয়া গান্ধি এবং কংগ্রেস নেতৃত্ব যদি মধ্যস্থতার ভূমিকা নেয়, তাহলে মমতা কিছুটা সময় পেতে পারেন নিজের সংগঠন পুনর্গঠনের জন্য।

কিন্তু সনিয়ার ক্ষমতারও সীমা আছে

এখানেই আসল প্রশ্ন। সোনিয়া গান্ধি কি সত্যিই “বিপদতারিণী” হতে পারবেন?

সম্ভবত আংশিকভাবে। কারণ আজকের কংগ্রেস ২০০৪ সালের কংগ্রেস নয়।

আজ কংগ্রেস নিজেই সাংগঠনিক সংকটে ভুগছে। বহু রাজ্যে তাদের ভিত্তি দুর্বল। পশ্চিমবঙ্গে তো প্রভাব আরও সীমিত। ফলে সোনিয়া নৈতিক সমর্থন দিতে পারেন, রাজনৈতিক বার্তা দিতে পারেন, সংসদীয় সহযোগিতা করতে পারেন। কিন্তু তৃণমূলের সাংগঠনিক ভাঙন আটকানোর ক্ষমতা তাঁর নেই। যে বিধায়ক বা নেতা দল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁকে সোনিয়ার ফোন খুব বেশি প্রভাবিত করবে এমন বিশ্বাস করার কারণ প্রায় নেই।

আরেকটি বড় বাধা: অভিষেক ফ্যাক্টর

মমতার সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু যদি কেবল বিরোধীরা হতেন, তাহলে সোনিয়ার ভূমিকা অনেক বেশি কার্যকর হতে পারত। কিন্তু অভিযোগের বড় অংশই যদি দলের ভেতরের নেতৃত্ব কাঠামোকে ঘিরে হয়, তাহলে বাইরের কোনও নেতা সেই সংকট সমাধান করতে পারবেন না। অনেক অসন্তুষ্ট নেতার অভিযোগ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বিশেষকে ঘিরে। সেই সমস্যার সমাধান দিল্লি থেকে সম্ভব নয়।সেটা করতে হবে মমতাকেই।

শেষ কথা: সোনিয়া কি লাইফবোট, নাকি কেবল ভাসমান ভেলা?

সোনিয়া গান্ধি মমতার জন্য একটি রাজনৈতিক লাইফবোট হতে পারেন কিন্তু ডুবে যাওয়া জাহাজকে বন্দরে ফিরিয়ে আনার টাগবোট নন। তিনি আন্তর্জাতিক ভাষায় যাকে বলে “স্ট্যাবিলাইজার”—পরিস্থিতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করতে পারেন, কিন্তু উল্টে যাওয়া সমীকরণ পুরো বদলে দিতে পারবেন না।

মমতা সম্ভবত তাঁর কাছে তিনটি জিনিস চাইবেন—সমর্থন, বৈধতা এবং সময়।

প্রথম দুটো হয়তো তিনি পেতে পারেন। কিন্তু তৃতীয়টি অর্থাৎ সময় পেলেও, সেই সময়কে কাজে লাগিয়ে দলকে নতুন করে গড়ে তুলতে না পারলে কোনও সোনিয়া গান্ধিই তাঁকে বাঁচাতে পারবেন না।

কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম সত্যটি হল—বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে জেতা যায়, কিন্তু ভেতরের বিদ্রোহের বিরুদ্ধে জয়ী হতে হলে শেষ পর্যন্ত নিজের ঘরটাই আগে গুছিয়ে নিতে হয়।