Home খবর বক্স অফিসে ব্যর্থ, ইতিহাসে অমর: ষাট বছরে ‘তিসরি কসম’-এর অবিশ্বাস্য পুনর্জন্ম

বক্স অফিসে ব্যর্থ, ইতিহাসে অমর: ষাট বছরে ‘তিসরি কসম’-এর অবিশ্বাস্য পুনর্জন্ম

Authored By বাংলাস্ফিয়ার ডেস্ক
6 views 3 minutes read
A+A-
Reset

হাইলাইটস:

  • মুক্তির ৬০ বছর পরও ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে বিবেচিত তিসরি কসম
  • প্রযোজক-গীতিকার শৈলেন্দ্র ছবির ব্যর্থতার ধাক্কা সামলাতে পারেননি; ঋণের বোঝায় জর্জরিত অবস্থায় অকালমৃত্যু।
  • ফণীশ্বরনাথ রেণুর গল্প অবলম্বনে নির্মিত ছবিতে গ্রামীণ ভারতের মানবিক সম্পর্ক ফুটে উঠেছে অনন্য সংবেদনশীলতায়।
  • মুক্তির সময় দর্শকের সমর্থন না পেলেও পরে রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য সম্মান অর্জন করে ভারতীয় সিনেমার ক্লাসিকের মর্যাদা পায়।

ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন ছবির সংখ্যা খুব বেশি নয়, যেগুলি মুক্তির সময় দর্শকের প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়ে, অথচ সময়ের বিচারে কালজয়ী শিল্পকর্মে পরিণত হয়েছে। সেই বিরল তালিকার একেবারে শীর্ষে থাকবে ‘তিসরি কসম’। ১৯৬৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত এই ছবির ষাট বছর পূর্তি শুধু একটি সিনেমার জন্মদিন নয়, ভারতীয় চলচ্চিত্রের শিল্পসত্তার এক অনন্য উদযাপনও বটে।

মুক্তির সময় ছবিটি বাণিজ্যিকভাবে ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছিল। প্রেক্ষাগৃহে দর্শক আসেননি, বিনিয়োগের অর্থ ফেরেনি। অথচ এই ছবির প্রযোজক ছিলেন হিন্দি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি গীতিকার শৈলেন্দ্র। অসংখ্য কালজয়ী গানের স্রষ্টা শৈলেন্দ্র জীবনে একটিই মাত্র ছবি প্রযোজনা করেছিলেন—‘তিসরি কসম’। সেই ছবির ব্যর্থতা তাঁকে আর্থিকভাবে বিধ্বস্ত করে দেয়। ঋণের চাপে, মানসিক যন্ত্রণায় তিনি ছবি মুক্তির কয়েক মাসের মধ্যেই প্রয়াত হন। তিনি জানতেই পারেননি, যে ছবির জন্য সবকিছু বাজি রেখেছিলেন, সেটিই একদিন ভারতীয় সিনেমার শ্রেষ্ঠ সম্পদগুলির অন্যতম বলে বিবেচিত হবে।

এই ছবির ভিত্তি ছিল ১৯৫৪ সালে বিহারের পূর্ণিয়া জেলার কিংবদন্তি সাহিত্যিক ফণীশ্বরনাথ রেণু রচিত ছোটগল্প ‘মারে গয়ে গুলফাম’। আঞ্চলিক জীবনের সূক্ষ্ম রূপকার হিসেবে রেণুর খ্যাতি ছিল সর্বজনবিদিত। তাঁর লেখায় উত্তর বিহারের মাটি, মানুষ, ভাষা, লোকসংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের সুখ-দুঃখ এমন জীবন্তভাবে ফুটে উঠত যে পাঠক যেন সেই গ্রামবাংলার ভেতরেই প্রবেশ করতেন। ‘তিসরি কসম’ সেই সাহিত্যিক জগতকে চলচ্চিত্রের ভাষায় অনবদ্যভাবে রূপ দিয়েছিল।

ছবির কেন্দ্রে রয়েছেন গরুর গাড়ির চালক হীরামন। সৎ, সরল, আত্মমর্যাদাবোধসম্পন্ন এই মানুষটি জীবনে তিনটি শপথ নেয়। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে তার জীবনে এসে পড়েন নওটঙ্কি নৃত্যশিল্পী হিরাবাই। সমাজের চোখে তিনি বিনোদনের শিল্পী, কিন্তু হীরামনের চোখে তিনি এক নিষ্পাপ, সম্মানযোগ্য নারী। এই দুই ভিন্ন জগতের মানুষের সম্পর্ক প্রেমের প্রচলিত সংজ্ঞায় আবদ্ধ নয়; বরং তা সম্মান, মমতা, আকাঙ্ক্ষা এবং অসম্ভব এক দূরত্বের মিশেলে গড়ে ওঠা এক হৃদয়স্পর্শী মানবিক কাহিনি।

ছবিতে হীরামনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রাজ কাপুর। তাঁর অভিনয় ছিল সংযত, স্বাভাবিক এবং গভীর মানবিকতায় ভরপুর। অন্যদিকে হিরাবাইয়ের চরিত্রে ওয়াহিদা রহমান এমন এক সংবেদনশীল অভিনয় উপহার দেন, যা আজও ভারতীয় চলচ্চিত্রের অন্যতম সেরা নারী চরিত্রাভিনয়ের উদাহরণ হিসেবে স্মরণ করা হয়। তাঁদের দুজনের রসায়ন কখনও উচ্চকণ্ঠ নয়, বরং নীরব দৃষ্টিবিনিময়, অপ্রকাশিত অনুভূতি এবং অপূর্ণতার মধ্যেই ছবির আবেগ নির্মিত হয়েছে।

ছবির পরিচালক বাসু ভট্টাচার্য মূলধারার বিনোদনের চেয়ে বাস্তবতার ওপর জোর দিয়েছিলেন। লোকসংগীত, গ্রামীণ মেলা, ধুলোমাখা পথ, গরুর গাড়ির ধীর গতি—সব মিলিয়ে তিনি এমন এক চলচ্চিত্রভাষা নির্মাণ করেন, যা সেই সময়ের ঝলমলে বাণিজ্যিক সিনেমার দর্শকদের কাছে অপরিচিত ছিল। সম্ভবত এই কারণেই মুক্তির সময় ছবিটি প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি।

তবে ছবির সংগীত শুরু থেকেই ছিল অসাধারণ। শঙ্কর-জয়কিষণের সুরে শৈলেন্দ্র ও হাসরতের লেখা গানগুলি আজও শ্রোতাদের হৃদয়ে অমলিন। ‘সজন রে ঝুঁঠ মত বলো’, ‘সজনওয়া বৈরি হো গয়ে হামার’, ‘চলত মুসাফির মোহ লিও রে’ কিংবা ‘দুনিয়া বনানে ওয়ালে’—প্রতিটি গান কাহিনির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। এগুলি শুধু জনপ্রিয় গান নয়, চরিত্রগুলির অন্তর্জগতেরও ভাষ্য।

সময়ের সঙ্গে দর্শকের রুচি বদলেছে, চলচ্চিত্র সমালোচকদের মূল্যায়নও গভীর হয়েছে। তখন বোঝা গেছে, ‘তিসরি কসম’ আসলে গ্রামীণ ভারত, মানবিক সম্পর্ক এবং সামাজিক বৈষম্যের এক অনন্য দলিল। ছবিটি পরে রাষ্ট্রপতির স্বর্ণপদক অর্জন করে এবং দেশ-বিদেশের চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছে ভারতীয় সিনেমার ক্লাসিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। আজ চলচ্চিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতেও এটি পাঠ্য হিসেবে আলোচিত হয়।

‘তিসরি কসম’-এর সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এই যে, প্রকৃত শিল্পের মূল্য সবসময় তাৎক্ষণিকভাবে নির্ধারিত হয় না। অনেক সময় বাজার ব্যর্থতার রায় দেয়, কিন্তু ইতিহাস সেই রায় বদলে দেয়। শৈলেন্দ্র জীবদ্দশায় সেই স্বীকৃতি পাননি। কিন্তু তাঁর স্বপ্ন, রেণুর সাহিত্য, বাসু ভট্টাচার্যের নির্মাণ এবং রাজ কাপুর-ওয়াহিদা রহমানের অভিনয় মিলিয়ে যে সৃষ্টি জন্মেছিল, তা আজ ভারতীয় চলচ্চিত্রের অমূল্য সম্পদ।

ষাট বছর পরে দাঁড়িয়ে ‘তিসরি কসম’ আমাদের মনে করিয়ে দেয়—কোনও শিল্পকর্মের প্রকৃত সাফল্য শুধু টিকিট বিক্রির অঙ্কে মাপা যায় না। মানুষের হৃদয়ে, সংস্কৃতির স্মৃতিতে এবং ইতিহাসের পাতায় যে সৃষ্টি অমর হয়ে থাকে, তার মূল্য সময়ই একদিন নির্ধারণ করে।

Description. online stores, news, magazine or review sites.

Edtior's Picks

Latest Articles