হাইলাইটস
- ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর ইরান, ইরাক ও সিরিয়া আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে আকাশসীমা বন্ধ করেছে।
- ইরাক ৭২ ঘণ্টার জন্য দেশের আকাশপথে বিমান চলাচল স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছে।
- সিরিয়া দামাস্কাস বিমানবন্দরে উড়ান বন্ধ করে দক্ষিণাঞ্চলের আকাশসীমা ১২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ রেখেছে।
- ইজরায়েলের দাবি, ইরান থেকে ছোঁড়া সমস্ত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভূপাতিত করেছে।
- এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এটিই ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের সবচেয়ে বড় সামরিক উত্তেজনা।
পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধবিরতির স্থায়িত্ব নিয়ে যে আশঙ্কা দীর্ঘদিন ধরেই ছিল, তা আবারও সামনে চলে এসেছে। ইজরায়েলের বিরুদ্ধে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর শুধু দুই দেশের মধ্যেই নয়, গোটা অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটেছে। তারই সরাসরি প্রতিফলন দেখা গেল আকাশপথে।
ইরান, ইরাক এবং সিরিয়া—তিন দেশই নিরাপত্তাজনিত কারণে নিজেদের আকাশসীমার ওপর জরুরি বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। বাণিজ্যিক বিমান চলাচল থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক উড়ান—সবকিছুর ওপর এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
রবিবার গভীর রাতে ইরান ইজরায়েলের দিকে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। তেহরানের দাবি, লেবাননে হিজবুল্লাহর অবস্থানের ওপর ইজরায়েলের সাম্প্রতিক হামলার জবাব হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানায়, এপ্রিল মাসে আমেরিকা ও ইজরায়েলের সঙ্গে যে যুদ্ধবিরতিতে তারা সম্মত হয়েছিল, তার অন্যতম শর্ত ছিল আঞ্চলিক সংঘর্ষ বন্ধ রাখা। ইজরায়েল সেই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বলেই তারা পাল্টা আঘাত হেনেছে।
হামলার কিছুক্ষণের মধ্যেই ইরানের জাতীয় বেসামরিক বিমান চলাচল সংস্থা দেশের পশ্চিমাঞ্চলের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ এবং সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকি বিবেচনা করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এরপর পরিস্থিতি আরও বিশালাকার ধারণ করে।
ইরাকের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করে, পরবর্তী ৭২ ঘণ্টার জন্য দেশের আকাশসীমা বন্ধ রাখা হবে। পশ্চিম এশিয়ার বিমান পরিবহণে ইরাকের আকাশপথ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে যাতায়াতকারী বহু আন্তর্জাতিক বিমান নিয়মিত এই করিডর ব্যবহার করে। ফলে এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলিকে দ্রুত বিকল্প রুট খুঁজতে বাধ্য করেছে।
সিরিয়াও একই ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে। দামাস্কাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়ান সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের আকাশসীমা অন্তত ১২ ঘণ্টার জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান, ইরাক ও সিরিয়ার এই সমন্বিত পদক্ষেপ প্রমাণ করছে যে সংশ্লিষ্ট দেশগুলি সম্ভাব্য বৃহত্তর সংঘর্ষের আশঙ্কা করছে।
ইজরায়েলের প্রতিক্রিয়াও ছিল দ্রুত।
ইজরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইডিএফ জানিয়েছে, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরান থেকে নিক্ষিপ্ত ক্ষেপণাস্ত্রগুলি শনাক্ত করে সফলভাবে ধ্বংস করেছে। সরকারি সূত্রের দাবি, হামলায় কোনও প্রাণহানি বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
তবে সারা দেশে সতর্কতা জারি করা হয়। বিভিন্ন শহরে সাইরেন বাজানো হয় এবং সাধারণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
রাতের উত্তেজনা শেষ হওয়ার আগেই নতুন করে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।
সোমবার ভোরে ইজরায়েলি বিমানবাহিনী ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুর ওপর পাল্টা হামলা চালানোর কথা ঘোষণা করে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, রাজধানী তেহরান ছাড়াও তাবরিজ ও ইসফাহানে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
এই ঘটনাগুলি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ কারণ এপ্রিল মাসে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর এটিই প্রথম বড় সামরিক সংঘর্ষ।
সেই যুদ্ধবিরতি মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কিছুটা কমিয়েছিল। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ ধরে লেবানন সীমান্তে সংঘর্ষ, হিজবুল্লাহ ও ইজরায়েলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা এবং ইরানের কঠোর অবস্থান পরিস্থিতিকে আবারও অস্থির করে তুলছিল।
এখন অনেক বিশেষজ্ঞই আশঙ্কা করছেন যে অঞ্চলটি আবারও পূর্ণমাত্রার সংঘর্ষের দিকে এগোতে পারে।
বিশ্ববাজারও এই উত্তেজনার দিকে নজর রাখছে। কারণ পশ্চিম এশিয়ার আকাশসীমা বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বিমান পরিবহণের খরচ বাড়ে, সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয় এবং জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে ইরাক ও ইরানের আকাশপথ দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ থাকলে ইউরোপ-এশিয়া রুটে বিমান সংস্থাগুলিকে কয়েকশো কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হতে পারে।
কূটনৈতিক মহলেও উদ্বেগ বাড়ছে। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং একাধিক আঞ্চলিক শক্তি ইতিমধ্যেই উভয় পক্ষকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।
কিন্তু বাস্তবতা হল, যুদ্ধবিরতির পর যে ভঙ্গুর শান্তির পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা এখন নতুন করে পরীক্ষার মুখে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং তার পরবর্তী আকাশসীমা বন্ধের সিদ্ধান্ত শুধু একটি সামরিক ঘটনার প্রতিক্রিয়া নয়; এটি গোটা পশ্চিম এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামো কতটা ভঙ্গুর হয়ে উঠেছে, তারও স্পষ্ট ইঙ্গিত। এখন বিশ্বের নজর তেহরান, জেরুজালেম, বাগদাদ এবং দামাস্কাসের দিকে—পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়, তার ওপরই নির্ভর করবে এই সংকট সীমিত থাকবে, নাকি আরও বড় সংঘাতে রূপ নেবে।