বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য মূলধনী লাভ কর (capital gains tax) এবং বন্ডের উপর withholding tax তুলে দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা চলছে।
লক্ষ্য হল বিদেশি পুঁজি ভারতে আরও বেশি করে আকর্ষণীয় করে তোলা।
এর ফলে ভারতীয় বন্ড ও শেয়ারবাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
বেশি ডলার এলে টাকার উপর চাপ কমবে এবং মুদ্রার মান তুলনামূলকভাবে শক্তিশালী হতে পারে।
তবে সমালোচকদের মতে, এতে সরকারের কর-আয় কমতে পারে এবং দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈষম্যের প্রশ্নও উঠতে পারে।

সম্প্রতি অর্থনৈতিক মহলে একটি খবর নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। খবরের শিরোনামটি ছিল—“To draw funds, prop rupee, govt scraps FII capital gains, withholding tax on bonds”। প্রথম দেখায় বিষয়টি বেশ জটিল মনে হতে পারে। কিন্তু এর অর্থ আসলে খুবই সহজ।
সরকার এমন একটি পরিকল্পনা বিবেচনা করছে, যার মাধ্যমে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের (Foreign Institutional Investors বা FII) জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ কর তুলে দেওয়া হতে পারে। উদ্দেশ্য একটাই—বিদেশ থেকে আরও বেশি টাকা ভারতে নিয়ে আসা এবং একই সঙ্গে টাকার মূল্যকে শক্তিশালী রাখা।
প্রথমে বুঝে নেওয়া যাক, এখানে কোন কোন করের কথা বলা হচ্ছে।
মূলধনী লাভ কর বা Capital Gains Tax কী?
ধরুন, কোনও বিদেশি তহবিল ভারতীয় শেয়ারবাজারে ১০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করল। কয়েক মাস পরে সেই বিনিয়োগের মূল্য বেড়ে ১২০ কোটি টাকা হল। অর্থাৎ তাদের লাভ হল ২০ কোটি টাকা।
এই লাভের উপর সরকার যে কর নেয়, সেটিই মূলধনী লাভ কর বা capital gains tax।
সরকার যদি এই কর তুলে দেয়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লাভের পরিমাণ আরও বাড়বে। ফলে তারা অন্য দেশের তুলনায় ভারতে বিনিয়োগ করতে বেশি উৎসাহিত হতে পারেন।
Withholding Tax আবার কী?
ধরুন, কোনও বিদেশি বিনিয়োগকারী ভারত সরকারের বন্ড বা কোনও ভারতীয় সংস্থার বন্ড কিনলেন।
বন্ড থেকে যে সুদ পাওয়া যায়, তার একটি অংশ সরকার আগেই কেটে নেয়। এটিই withholding tax।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আপনার যদি ১০০ টাকা সুদ পাওয়ার কথা থাকে এবং সরকার আগে থেকেই ১০ টাকা কেটে নেয়, তাহলে হাতে পাবেন ৯০ টাকা।
যদি এই কর তুলে দেওয়া হয়, তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা পুরো সুদটাই পাবেন। ফলে ভারতীয় বন্ড তাদের কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
সরকার কেন এই পদক্ষেপ নিতে চাইছে?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে টাকার মধ্যে।
গত কয়েক বছরে বিশ্ব অর্থনীতিতে অস্থিরতা বেড়েছে। অনেক সময় বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারত থেকে টাকা তুলে নিয়ে আমেরিকার মতো নিরাপদ বাজারে চলে যান। তখন ভারতে ডলারের প্রবাহ কমে যায়।
অন্যদিকে আমদানি করতে ভারতের প্রচুর ডলার প্রয়োজন হয়। বিশেষ করে তেল, গ্যাস, ইলেকট্রনিক পণ্য এবং বিভিন্ন শিল্প কাঁচামাল কিনতে।
যখন ডলারের চাহিদা বেশি এবং সরবরাহ কম, তখন টাকার মূল্য কমতে শুরু করে।
সরকার মনে করছে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য করের বোঝা কমানো গেলে তারা আরও বেশি টাকা ভারতে আনবেন। এতে ডলারের প্রবাহ বাড়বে এবং টাকার উপর চাপ কমবে।
সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব কী হতে পারে?
অনেকেই ভাবতে পারেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কর ছাড় দিলে সাধারণ মানুষের কী লাভ?
আসলে পরোক্ষভাবে এর প্রভাব যথেষ্ট বড় হতে পারে।
টাকা দুর্বল হলে বিদেশ থেকে পণ্য কেনা আরও ব্যয়বহুল হয়ে যায়। ফলে তেলের দাম বাড়ে, পরিবহণ খরচ বাড়ে, শিল্প উৎপাদনের খরচ বাড়ে। শেষ পর্যন্ত তার প্রভাব পড়ে বাজারের প্রায় সব জিনিসের উপর।
যদি টাকার মূল্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে, তাহলে আমদানি খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
এছাড়া বিদেশি বিনিয়োগ বাড়লে শেয়ারবাজারেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অনেক সংস্থা সহজে পুঁজি তুলতে পারে, নতুন প্রকল্প শুরু করতে পারে এবং কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।
এর কোনও ঝুঁকি নেই?
অবশ্যই আছে।
প্রথমত, সরকার কর থেকে যে রাজস্ব পায়, তার একটি অংশ হারাবে।
দ্বিতীয়ত, প্রশ্ন উঠতে পারে—যদি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কর ছাড় দেওয়া হয়, তাহলে দেশীয় বিনিয়োগকারীরা একই সুবিধা পাবেন না কেন?
তৃতীয়ত, বিদেশি পুঁজি অনেক সময় খুব দ্রুত আসে এবং আবার দ্রুত বেরিয়েও যায়। অর্থনীতিবিদরা একে “হট মানি” বা বলেন।
যদি কোনও আন্তর্জাতিক সংকট তৈরি হয়, তাহলে এই অর্থ একদিনে বাজার ছেড়ে বেরিয়ে যেতে পারে। তখন আবার টাকার উপর চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশ্বে এমন উদাহরণ কি আছে?
হ্যাঁ। বিশ্বের বহু দেশ বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে কর ছাড়, বিশেষ আর্থিক সুবিধা বা সহজ নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা চালু করেছে।
বিশেষ করে সিঙ্গাপুর, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কিছু এশীয় আর্থিক কেন্দ্র বিদেশি পুঁজি টানার জন্য করনীতিকে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে।
ভারতও দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে একটি বড় বৈশ্বিক বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। বিশ্বের বহু সংস্থা এখন চিনের বাইরে বিকল্প বাজার খুঁজছে। সেই সুযোগ কাজে লাগাতেই সরকার আরও প্রতিযোগিতামূলক কর কাঠামো তৈরির কথা ভাবছে বলে মনে করা হচ্ছে।
শেষ কথা
সংক্ষেপে বলতে গেলে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য capital gains tax এবং bond withholding tax তুলে দেওয়ার ধারণার মূল উদ্দেশ্য হল ভারতে আরও বেশি বিদেশি টাকা আনা, টাকাকে শক্তিশালী রাখা এবং আর্থিক বাজারকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলা।
এটি কার্যকর হলে শেয়ারবাজার ও বন্ড বাজারে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়তে পারে। তবে এর বিনিময়ে সরকারকে কিছু কর-রাজস্ব ছাড়তে হবে এবং বিদেশি পুঁজির উপর নির্ভরতা বৃদ্ধির ঝুঁকিও মাথায় রাখতে হবে।
অর্থাৎ, এটি এক ধরনের অর্থনৈতিক বাজি—সরকার আশা করছে যে কর কমিয়ে স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজস্ব হারালেও দীর্ঘমেয়াদে বেশি বিনিয়োগ, বেশি অর্থনৈতিক কার্যকলাপ এবং শক্তিশালী টাকার মাধ্যমে তার চেয়ে বড় লাভ পাওয়া যাবে।