অযোধ্যার শ্রী রাম জন্মভূমি মন্দিরে ভক্তদের অনুদান তছরুপের অভিযোগে চলা তদন্তের পরিধি এবার লখনউ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলি অভিযুক্তদের আত্মীয়-পরিজনদের স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির খোঁজখবর শুরু করেছে। অভিযোগ, মন্দিরের অনুদানের অর্থ আত্মসাৎ করে সেই টাকা জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান বা অন্য সম্পত্তি কেনার কাজে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সরকারি সূত্রের দাবি, এই মামলায় গ্রেফতার হওয়া আট অভিযুক্তের মোট ৫৪ জন আত্মীয়ের সম্পত্তির নথি সংগ্রহ করা হচ্ছে। তাঁদের নামে গত দু’বছরে কী কী সম্পত্তি কেনা হয়েছে, কোথায় বিনিয়োগ হয়েছে এবং সেই সম্পদের উৎস কী—সবই তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে। তদন্তকারীদের লক্ষ্য, অনুদানের অর্থের সম্ভাব্য গতিপথ চিহ্নিত করা এবং তা কোনও আত্মীয়ের নামে গোপনে বিনিয়োগ করা হয়েছে কি না, তার প্রমাণ সংগ্রহ করা।
এই উদ্দেশ্যে লখনউ পুরসভা, লখনউ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এলডিএ), উত্তরপ্রদেশ আবাসন ও উন্নয়ন পর্ষদ, স্ট্যাম্প ও নিবন্ধন দফতর এবং রাজস্ব দফতরের কাছে তথ্য চাওয়া হয়েছে। গত দুই বছরে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে জমি, ফ্ল্যাট, বাড়ি বা বাণিজ্যিক সম্পত্তি কেনাবেচার সমস্ত নথি তদন্তকারী সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তাদের মতে, শুধু অভিযুক্তদের ব্যক্তিগত সম্পত্তিই নয়, তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি হয়েছে কি না, সেটিও বিশদে পরীক্ষা করা হবে। কোনও সম্পত্তি যদি আত্মীয়দের নামে কেনা হয়ে থাকে এবং তার অর্থের উৎস ব্যাখ্যা করা না যায়, তবে সেটিকেও তদন্তের অংশ করা হবে।
এই মামলায় ইতিমধ্যেই গ্রেফতার হওয়া আট অভিযুক্তকে গত ২৬ জুন থেকে অযোধ্যা জেলে রাখা হয়েছে। অভিযোগ, তাঁরা মন্দিরে ভক্তদের দেওয়া অনুদান সংগ্রহ ও হিসাবরক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং সেই সুযোগে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। তদন্তে উঠে এসেছে, অনুদানের হিসাবের সঙ্গে প্রকৃত সংগ্রহের অঙ্কের অসঙ্গতি, নথিতে কারচুপি এবং অর্থ সরানোর একাধিক সন্দেহজনক লেনদেন।
তদন্তকারী সংস্থাগুলি এখন ব্যাংক হিসাব, ডিজিটাল লেনদেন, নগদ জমা এবং সম্পত্তি ক্রয়ের আর্থিক উৎসের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজছে। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকেও অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। অর্থ পাচারের সম্ভাবনা রয়েছে কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, অভিযুক্তদের আত্মীয়দের মধ্যে কেউ সাম্প্রতিক সময়ে বড় অঙ্কের সম্পত্তি কিনে থাকলে বা বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক বিনিয়োগ করে থাকলে, তাঁদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে। তদন্তকারীরা জানতে চাইবেন, ওই অর্থের উৎস কী ছিল এবং তা বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।
তদন্তে যুক্ত একাধিক সংস্থার মধ্যে সমন্বয় রেখে তথ্য যাচাইয়ের কাজ চলছে। সম্পত্তির নথি, রেজিস্ট্রি, কর সংক্রান্ত তথ্য, ব্যাংক লেনদেন এবং আর্থিক নথি মিলিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক চিত্র তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে। প্রয়োজনে সন্দেহজনক সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত করার দিকেও পদক্ষেপ করা হতে পারে, যদি প্রমাণিত হয় যে সেগুলি অপরাধলব্ধ অর্থে কেনা হয়েছে।
অযোধ্যার রামমন্দির দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্র। প্রতিদিন হাজার হাজার ভক্ত সেখানে অনুদান দেন। ফলে সেই অর্থের ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। তদন্তকারী সংস্থাগুলির বক্তব্য, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অনুদান নিয়ে কোনও ধরনের আর্থিক অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না এবং অপরাধের সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেকের ভূমিকা নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা হবে।
এই তদন্তের পরিধি লখনউ পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ায় স্পষ্ট, শুধু মূল অভিযুক্তদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে তদন্তকারীরা অর্থের সম্পূর্ণ গতিপথ অনুসরণ করতে চাইছেন। অনুদানের অর্থ যদি আত্মীয়স্বজন বা ঘনিষ্ঠদের নামে সম্পত্তি কেনার মাধ্যমে লুকিয়ে রাখা হয়ে থাকে, তবে সেই সম্পদও তদন্তের আওতায় আসবে। তদন্ত শেষ হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর আইনি পদক্ষেপ এবং সম্পত্তি সংক্রান্ত অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।