Table of Contents
হাইলাইটস
- ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে জারি হয়েছে চরম তাপপ্রবাহের সতর্কতা।
- ফ্রান্স, স্পেন, ব্রিটেন, জার্মানি, পর্তুগালসহ একাধিক দেশে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তারও বেশি হতে পারে।
- ফ্রান্সের কিছু এলাকায় ৪৩ ডিগ্রি এবং স্পেনে ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ওঠার পূর্বাভাস।
- প্যারিসে জুন মাসে প্রথমবার ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করার সম্ভাবনা।
- ব্রিটেনে জারি হয়েছে বিরল ‘রেড হিট ওয়ার্নিং’; লন্ডনেও ৪০ ডিগ্রি ছোঁয়ার আশঙ্কা।
- বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপে তাপপ্রবাহ আরও ঘনঘন ও তীব্র হচ্ছে।
ইউরোপের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বর্তমানে এক ভয়াবহ তাপপ্রবাহের কবলে। আবহাওয়াবিদরা সতর্ক করেছেন, চলতি সপ্তাহে ফ্রান্স, স্পেন, ব্রিটেন, জার্মানি, পর্তুগাল, সুইৎজারল্যান্ড ও লুক্সেমবার্গের বহু এলাকায় জুন মাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে। কিছু অঞ্চলে পারদ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করার সম্ভাবনা রয়েছে, যা বছরের এই সময়ের জন্য অত্যন্ত অস্বাভাবিক। সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি ফ্রান্সে। দেশটির আবহাওয়া দফতর মেতো-ফ্রান্স জানিয়েছে, প্যারিসে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছতে পারে, যা জুন মাসে আগে কখনও দেখা যায়নি। দেশের অর্ধেকেরও বেশি অংশে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ স্তরের ‘রেড অ্যালার্ট’। মধ্য ফ্রান্সের কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
স্পেনেও পরিস্থিতি কম ভয়াবহ নয়। দেশটির আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, মধ্য ও দক্ষিণ স্পেনের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির ওপরে উঠবে। কোথাও কোথাও ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছতে পারে। যদিও বৃহস্পতিবারের পর থেকে কিছুটা স্বস্তি ফেরার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রিটেনেও নজিরবিহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দেশটির আবহাওয়া দফতর ‘মেট অফিস’ ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বহু অংশের জন্য বিরল ‘রেড ওয়ার্নিং’ জারি করেছে। লন্ডন-সহ দক্ষিণ ও মধ্য ইংল্যান্ডে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস স্পর্শ করলে তা হবে বছরের এত তাড়াতাড়ি সময়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ রেকর্ড। ব্রিটেনে এর আগে মাত্র একবার, ২০২২ সালের জুলাইয়ে, তাপমাত্রা ৪০.৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসে উঠেছিল।
‘হিট ডোম’-এর প্রভাব
আবহাওয়াবিদদের মতে, ইউরোপের ওপর একটি শক্তিশালী ‘হিট ডোম’ বা তাপগম্বুজ তৈরি হয়েছে। এই অবস্থায় উচ্চচাপ বলয়ের কারণে গরম বাতাস আটকে যায় এবং ক্রমাগত উত্তপ্ত হতে থাকে। ফলে দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকে। এই পরিস্থিতিই ফ্রান্স, স্পেন ও ব্রিটেনের মতো দেশে তাপপ্রবাহকে আরও তীব্র করে তুলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সতর্কবার্তা
বিজ্ঞানীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, একক কোনও তাপপ্রবাহকে সরাসরি জলবায়ু পরিবর্তনের ফল বলা না গেলেও বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে এই ধরনের চরম আবহাওয়া এখন অনেক বেশি ঘনঘন দেখা যাচ্ছে। ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশগুলির মধ্যে অন্যতম। ২০২৫ সালেও প্রায় গোটা ইউরোপ স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি গরম ছিল। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ইউরোপে প্রতি বছর কয়েক দশ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে তাপপ্রবাহ-সম্পর্কিত কারণে।
কেন ইউরোপ এত ঝুঁকিতে?
ইউরোপের বহু বাড়ি, স্কুল ও অফিস এমন সময়ে তৈরি হয়েছিল যখন আবহাওয়া তুলনামূলক শীতল ছিল। ব্রিটেনের অনেক বাড়িই শীতের তাপ ধরে রাখার জন্য নির্মিত, ফলে গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহে সেগুলি কার্যত ‘ওভেন’-এ পরিণত হয়। অন্যদিকে, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার এখনও ইউরোপের অনেক দেশে সীমিত। ফ্রান্সে এয়ার কন্ডিশনার স্থাপন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে, আর ব্রিটেনে বিদ্যুতের উচ্চমূল্য অনেককে তা ব্যবহার থেকে বিরত রাখে।
কীভাবে নিরাপদ থাকবেন?
বিশেষজ্ঞরা কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন—
- নিয়মিত জল পান করতে হবে এবং শরীরকে আর্দ্র রাখতে হবে।
- দুপুরের তীব্র রোদ এড়িয়ে চলতে হবে।
- জানালায় পর্দা বা মোটা কাপড় টাঙিয়ে ঘর ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করতে হবে।
- রাতে জানালা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে।
- ঠান্ডা জল দিয়ে মুখ ও শরীর ভেজানো বা স্নান করা উপকারী।
- বাইরে বেরোলে ঠান্ডা পানীয় সঙ্গে রাখতে হবে।
- মাথা ঘোরা, বমি বমি ভাব, দ্রুত হৃদস্পন্দন, মাথাব্যথা বা অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নিতে হবে।
বৃহত্তর বার্তা
এই তাপপ্রবাহ শুধু একটি আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি ইউরোপের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা জলবায়ু সংকটেরও স্পষ্ট সতর্কবার্তা। বিজ্ঞানীদের মতে, আগামী দশকগুলিতে যদি গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণে না আনা যায়, তবে ইউরোপে এমন তাপপ্রবাহ আরও ঘনঘন, দীর্ঘস্থায়ী এবং প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে যে তাপমাত্রা ব্যতিক্রম বলে মনে হচ্ছে, ভবিষ্যতে সেটিই হয়তো নতুন স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়াবে।