হাইলাইটস
- হরিয়ানার পালওয়াল থেকে গ্রেপ্তার বন্ধুয়া শ্রম চক্রের মূল অভিযুক্ত অনকিত বালিয়ান।
- অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অভিযোগে প্রথমে গ্রেপ্তার করে হরিয়ানা পুলিশ।
- উত্তরপ্রদেশ পুলিশ ২৩ জুন থেকে পাঁচটি বিশেষ দল গঠন করে তার খোঁজ চালাচ্ছিল।
- মুজফ্ফরনগরের একটি পাতার থালা-বাটি তৈরির কারখানায় শ্রমিকদের আটকে রেখে জোরপূর্বক কাজ করানোর অভিযোগ।
- রাজস্থান, বিহার, উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক পাচারের অভিযোগও উঠেছে।
- তদন্তকারীদের দাবি, কারখানায় শ্রমিকদের অমানবিক পরিবেশে আটকে রেখে নির্যাতন করা হত।
হরিয়ানার পালওয়াল জেলা থেকে গ্রেপ্তার হল উত্তরপ্রদেশের বহুল আলোচিত বন্ধুয়া শ্রমিক কাণ্ডের মূল অভিযুক্ত অনকিত বালিয়ান। প্রায় দশ দিন ধরে পুলিশের চোখে ধুলো দিয়ে পালিয়ে বেড়ানোর পর বৃহস্পতিবার হরিয়ানা পুলিশ তাকে পাকড়াও করে। তার গ্রেপ্তারের ফলে মুজফ্ফরনগরের ওই কারখানাকে ঘিরে সামনে আসা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে নতুন গতি এল বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, পালওয়ালের হোদল থানার এলাকায় অভিযানের সময় অনকিত বালিয়ানের কাছ থেকে একটি অবৈধ দেশি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার হয়। সেই অভিযোগেই প্রথমে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পরে উত্তরপ্রদেশ পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করে হরিয়ানা পুলিশ গোটা ঘটনার তথ্য ভাগ করে নেয়। মুজফ্ফরনগরের পুলিশ সুপার সঞ্জয় কুমার বর্মা জানিয়েছেন, অভিযুক্তকে উত্তরপ্রদেশে এনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।
গত ২৩ জুন থেকে অনকিত বালিয়ানের খোঁজে পাঁচটি বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করেছিল উত্তরপ্রদেশ পুলিশ। একাধিক জায়গায় তল্লাশি চালানো হলেও এতদিন সে ধরা পড়েনি। পুলিশের দাবি, বারবার অবস্থান বদলে তদন্ত এড়ানোর চেষ্টা করছিল সে। শেষ পর্যন্ত হরিয়ানা পুলিশের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, মুজফ্ফরনগরের মাণ্ডি গ্রামের একটি পাতার থালা ও বাটি তৈরির কারখানার মালিক অনকিত বালিয়ান। অভিযোগ, এই কারখানাতেই প্রায় এক ডজন শ্রমিককে বেআইনিভাবে আটকে রেখে কাজ করানো হত। শ্রমিকদের বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা ছিল না, পর্যাপ্ত খাবার, চিকিৎসা বা বিশ্রামের ব্যবস্থাও ছিল না বলে অভিযোগ।
পুলিশের দাবি, ওই শ্রমিকদের অনেককে রাজস্থান, বিহার, উত্তরাখণ্ড এবং উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে কাজের প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে আসা হয়েছিল। পরে তাদের জোর করে কারখানায় আটকে রেখে দীর্ঘ সময় কাজ করানো হত। অনেক ক্ষেত্রে মজুরি দেওয়া হত না বা নামমাত্র টাকা দেওয়া হত। তদন্তকারীদের মতে, এটি শুধু শ্রম আইন লঙ্ঘনের ঘটনা নয়, বরং সংঘবদ্ধ মানব পাচার ও বন্ধুয়া শ্রম ব্যবস্থার একটি সুসংগঠিত চক্রের অংশ হতে পারে। প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, শ্রমিকদের উপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে। তাঁদের চলাফেরার উপর কড়া নজর রাখা হত এবং বাইরের লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগ করতে দেওয়া হত না। উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের বয়ানের ভিত্তিতে পুলিশ ইতিমধ্যেই একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করেছে।
অনকিত বালিয়ানের গ্রেপ্তারের পর এখন তদন্তের মূল লক্ষ্য এই চক্রের সঙ্গে আর কারা যুক্ত ছিল তা খুঁজে বের করা। শ্রমিকদের কোথা থেকে আনা হত, কারা এই পাচার চক্র পরিচালনা করত এবং স্থানীয় স্তরে কেউ সহযোগিতা করেছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশের ধারণা, এই চক্রের সঙ্গে আরও কয়েকজন জড়িত থাকতে পারে। এই ঘটনায় মানবাধিকার সংগঠনগুলিও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তাদের বক্তব্য, দেশে বন্ধুয়া শ্রম নিষিদ্ধ হলেও বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে এখনও গোপনে এমন চক্র সক্রিয় রয়েছে। দারিদ্র্য, অশিক্ষা এবং কাজের অভাবকে কাজে লাগিয়ে অসহায় মানুষদের ফাঁদে ফেলা হচ্ছে। তাই শুধু অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করলেই হবে না, এই ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত অভিযান চালানোরও দাবি উঠেছে।
উত্তরপ্রদেশ পুলিশ জানিয়েছে, অনকিত বালিয়ানকে নিজেদের হেফাজতে এনে বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের পুনর্বাসন এবং আইনি সহায়তার বিষয়েও প্রশাসন পদক্ষেপ করছে। এই মামলার মাধ্যমে বন্ধুয়া শ্রম ও শ্রমিক পাচারের বিরুদ্ধে আরও বড় অভিযান শুরু হতে পারে বলেই মনে করছেন তদন্তকারীরা।