হাইলাইটস:
- দেশের নানা প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও গুরুদুয়ারা প্রতিদিন খাবার, জল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠাচ্ছেন যন্তর-মন্তরের আন্দোলনস্থলে।
- খাবার পৌঁছে দেওয়া ডেলিভারি কর্মীদের অভিজ্ঞতা—“প্রথমবার এমন গ্রাহকের কাছে ডেলিভারি করছি, যাঁদের কোনও মুখ নেই, কিন্তু তাঁদের জন্য কাজ করাটা আলাদা এবং সঠিক বলে মনে হচ্ছে।”
- আন্দোলনের অংশ না হয়েও বহু মানুষ নীরবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছেন; তৈরি হয়েছে এক অনন্য নাগরিক সংহতির পরিবেশ।
- রাজনৈতিক সংঘাতের আবহে এই নীরব মানবিক উদ্যোগ আন্দোলনের সবচেয়ে শক্তিশালী সামাজিক বার্তাগুলির একটি হয়ে উঠেছে।
বাংলাস্ফিয়ার: নয়াদিল্লির যন্তর-মন্তরে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা ছাত্র-যুব আন্দোলনের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য শুধু বিক্ষোভ, অনশন বা রাজনৈতিক দাবিদাওয়া নয়। এর সমান্তরালে গড়ে উঠেছে এক নীরব, স্বতঃস্ফূর্ত এবং বিস্ময়কর মানবিক সংহতির পরিকাঠামো। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পৌঁছে যাচ্ছে রান্না করা খাবার, ফল, জল, ওআরএস, ওষুধ, কম্বল, স্যানিটারি সামগ্রী এবং প্রয়োজনীয় নিত্যসামগ্রী। যাঁরা এই সব পাঠাচ্ছেন, তাঁদের অধিকাংশই আন্দোলনের নেতৃত্বে নেই, রাজনৈতিক দলের সদস্যও নন। তাঁরা সাধারণ নাগরিক—যাঁরা মনে করছেন, প্রতিবাদে বসা মানুষদের পাশে অন্তত মানবিক দায়িত্ববোধ থেকে দাঁড়ানো উচিত।
এই সংহতির অন্যতম মুখ হয়ে উঠেছেন খাবার পৌঁছে দেওয়া ডেলিভারি কর্মীরা। তাঁদের অনেকেই জানিয়েছেন, জীবনে প্রথমবার তাঁরা এমন গ্রাহকের কাছে খাবার পৌঁছে দিচ্ছেন, যাঁদের কোনও নির্দিষ্ট নাম বা মুখ নেই। অ্যাপে শুধু একটি অবস্থান—‘যন্তর-মন্তর’—আর সেখানে অপেক্ষা করছেন শত শত অচেনা মানুষ।
এক ডেলিভারি কর্মীর কথায়, “সাধারণত একজন ব্যক্তির কাছে খাবার পৌঁছে দিই। এখানে এসে দেখি, খাবার ভাগ হয়ে যাচ্ছে বহু মানুষের মধ্যে। এটা অন্যরকম অনুভূতি। মনে হচ্ছে, আমি শুধু খাবার নয়, একটা উদ্দেশ্যের অংশ পৌঁছে দিচ্ছি।”
আরও এক কর্মী বলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম সাধারণ অর্ডার। কিন্তু এখানে এসে বুঝলাম, মানুষ নিজের টাকা খরচ করে অচেনা প্রতিবাদকারীদের জন্য খাবার পাঠাচ্ছেন। এতে কোনও ব্যবসায়িক সম্পর্ক নেই, আছে শুধু সহানুভূতি।”
আন্দোলনস্থলের বাইরে প্রতিদিন তৈরি হয়েছে ছোট ছোট ‘সহায়তা কেন্দ্র’। কেউ বড় বড় হাঁড়িতে খিচুড়ি রান্না করে নিয়ে আসছেন, কেউ রুটি-সবজি, কেউ আবার কেবল ঠান্ডা পানীয় জল বা ফল বিতরণ করছেন। দিল্লির বিভিন্ন গুরদোয়ারা, সামাজিক সংগঠন, ছাত্র সংগঠন, আবাসন সমিতি এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই ব্যবস্থা চলছে।
অনেকেই পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। তাঁদের বক্তব্য, “এটা কোনও রাজনৈতিক অবস্থান নয়। কেউ যদি দিনের পর দিন রাস্তায় বসে থাকে, তার অন্তত খাওয়ার ব্যবস্থা হওয়া উচিত।”
এই নীরব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন বহু স্বেচ্ছাসেবী। কেউ খাবার গ্রহণ করে সারিবদ্ধভাবে বিতরণ করছেন, কেউ বয়স্ক আন্দোলনকারীদের জন্য আলাদা খাবারের ব্যবস্থা করছেন, কেউ বা ওষুধপত্রের তালিকা তৈরি করছেন। চিকিৎসক, নার্স, মেডিক্যাল ছাত্রছাত্রীদের একটি অংশও প্রাথমিক স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী নিয়ে হাজির হচ্ছেন।
সংহতির এই চিত্র শুধু দিল্লিতে সীমাবদ্ধ নয়। পঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, রাজস্থান, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, পশ্চিমবঙ্গ-সহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে মানুষ অর্থসাহায্য পাঠাচ্ছেন। কেউ এক বেলার খাবারের খরচ দিচ্ছেন, কেউ এক ট্রাক পানীয় জল পাঠাচ্ছেন, কেউ আবার অনলাইনে ছোট ছোট অনুদান দিয়ে এই উদ্যোগকে টিকিয়ে রাখছেন।
আন্দোলনস্থলে থাকা এক স্বেচ্ছাসেবীর কথায়, “প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কোনও না কোনও গাড়ি এসে থামছে। কেউ বলছেন, ‘এটা আমাদের গ্রামের পক্ষ থেকে’, কেউ বলছেন, ‘এটা আমার মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে।’ এই ভালোবাসার হিসাব রাখা সম্ভব নয়।”
খাবার বিতরণের ক্ষেত্রেও বিশেষ নিয়ম তৈরি হয়েছে। যাতে অপচয় না হয় এবং সবাই সমানভাবে পান, তার জন্য স্বেচ্ছাসেবীরা তালিকা অনুযায়ী বিতরণ করছেন। অতিরিক্ত খাবার নিকটবর্তী আশ্রয়হীন মানুষদের মধ্যেও বিলিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
অনেক আন্দোলনকারী জানিয়েছেন, এই সমর্থন তাঁদের মানসিক শক্তি বাড়িয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘ অনশন, ক্লান্তি এবং অনিশ্চয়তার মধ্যেও যখন অচেনা কেউ এক বোতল জল বা এক প্যাকেট খাবার হাতে তুলে দেন, তখন মনে হয় তাঁরা একা নন।
সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, এই ধরনের নাগরিক সংহতি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। আন্দোলনের সাফল্য বা ব্যর্থতার বাইরেও এটি প্রমাণ করে যে, সমাজের একাংশ এখনও স্বতঃস্ফূর্তভাবে মানবিক দায়িত্ব পালন করতে প্রস্তুত। রাজনৈতিক মতভেদ থাকলেও বিপদে বা সংকটে থাকা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংহতি কোনও সংগঠিত প্রচারের ফল নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছোট ছোট আহ্বান, ব্যক্তিগত যোগাযোগ এবং মুখে মুখে খবর ছড়িয়েই এই সহায়তার নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে। ফলে এটি অনেক বেশি বিশ্বাসযোগ্য এবং স্বতঃস্ফূর্ত।
অন্যদিকে, আন্দোলনস্থলে পৌঁছনো ডেলিভারি কর্মীদের অভিজ্ঞতা নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সাধারণত তাঁরা নির্দিষ্ট গ্রাহকের কাছে নির্দিষ্ট সময়ে খাবার পৌঁছে দেন। কিন্তু এখানে তাঁরা এমন এক গন্তব্যে আসছেন, যেখানে গ্রাহক একজন নন—একটি আন্দোলন, একটি সমষ্টি। সেই অভিজ্ঞতা তাঁদের পেশাগত জীবনের বাইরে গিয়েও ব্যক্তিগত অনুভূতিকে স্পর্শ করছে।
এক তরুণ ডেলিভারি কর্মীর ভাষায়, “আজ বুঝলাম, খাবার শুধু ক্ষুধা মেটায় না। কখনও কখনও এটা মানুষের পাশে থাকার ভাষাও হয়ে ওঠে।”
রাজনৈতিক উত্তেজনা, পুলিশি নজরদারি এবং অনিশ্চয়তার আবহে যন্তর-মন্তরের এই নীরব মানবিক চিত্র তাই আলাদা করে চোখে পড়ছে। বক্তৃতা, স্লোগান বা সংঘর্ষের বাইরেও সেখানে প্রতিদিন লেখা হচ্ছে সংহতির এক অন্য ইতিহাস—যেখানে অচেনা মানুষের জন্য রান্না হচ্ছে খাবার, স্বেচ্ছাসেবীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে তা বিলি করছেন, আর ডেলিভারি কর্মীরা বলছেন, জীবনে প্রথমবার তাঁরা এমন এক ‘গ্রাহকের’ কাছে পৌঁছেছেন, যার কোনও মুখ নেই, অথচ যার জন্য কাজ করতে পেরে তাঁদের মনে হচ্ছে—“এটাই ঠিক কাজ।”