হাইলাইটস:

  • কলকাতা মেট্রোয় চালকবিহীন (ড্রাইভারলেস) ট্রেন চালুর প্রস্তুতি শুরু।
  • প্রথম পর্যায়ে গ্রিন লাইন (ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো) ও পার্পল লাইনে এই ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা।
  • দিল্লি ও বেঙ্গালুরু মেট্রোর অভিজ্ঞতা অনুসরণ করে প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হবে।
  • অত্যাধুনিক সিগন্যালিং ও স্বয়ংক্রিয় ট্রেন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে চলবে ট্রেন।
  • যাত্রী নিরাপত্তা, সময়নিষ্ঠ পরিষেবা ও পরিচালন দক্ষতা বাড়ানোই মূল লক্ষ্য।
  • পরীক্ষামূলক ধাপ সফল হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য করিডরেও চালকবিহীন পরিষেবা চালুর সম্ভাবনা।

বাংলাস্ফিয়ার: কলকাতা মেট্রোয় গণপরিবহনের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে চলেছে। অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পরীক্ষা-নিরীক্ষা শুরু হয়েছে এবং সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী দিনে শহরের গ্রিন লাইন (ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রো) এবং পার্পল লাইনে চালকবিহীন ট্রেন চলতে দেখা যাবে। দেশের প্রথম মেট্রো রেলব্যবস্থা হিসেবে কলকাতা একসময় পথ দেখিয়েছিল। এবার সেই কলকাতাই আধুনিক প্রযুক্তির আরও এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপে প্রবেশ করতে চলেছে।

রেল সূত্রে জানা গিয়েছে, ড্রাইভারলেস ট্রেন পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় স্বয়ংক্রিয় নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, সিগন্যালিং প্রযুক্তি এবং নিরাপত্তা অবকাঠামো ধাপে ধাপে প্রস্তুত করা হচ্ছে। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। এই পরীক্ষাগুলি সফল হলে পরবর্তী পর্যায়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন নিয়ে পরিষেবা চালু করা হবে।

কেন চালকবিহীন ট্রেন?

ড্রাইভারলেস ট্রেন মানেই ট্রেনে কোনও চালক থাকবে না—বিষয়টি এতটা সরল নয়। এই ব্যবস্থায় ট্রেনের গতি নিয়ন্ত্রণ, স্টেশনে থামা, দরজা খোলা-বন্ধ, নির্দিষ্ট সময়ে যাত্রা শুরু—সবই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে নিয়ন্ত্রণকক্ষে প্রশিক্ষিত কর্মীরা সার্বক্ষণিক নজরদারি চালান এবং প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের সুযোগ থাকে।

বিশ্বের বহু বড় শহরে এই প্রযুক্তি বহু বছর ধরেই ব্যবহৃত হচ্ছে। ভারতে দিল্লি মেট্রো ইতিমধ্যেই ম্যাজেন্টা, পিঙ্ক ও ইয়েলো লাইনের কিছু অংশে চালকবিহীন ট্রেন চালাচ্ছে। বেঙ্গালুরু মেট্রোও একই পথে এগিয়েছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হতে চলেছে কলকাতা।

গ্রিন ও পার্পল লাইন কেন প্রথম?

ইস্ট-ওয়েস্ট বা গ্রিন লাইন তুলনামূলকভাবে নতুন করিডর। এই লাইনে আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা এবং উন্নত ট্রেন নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে চালকবিহীন পরিষেবা চালুর জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ভিত্তি এখানে তুলনামূলকভাবে সহজলভ্য।

অন্যদিকে নির্মীয়মাণ পার্পল লাইনেও শুরু থেকেই সর্বাধুনিক প্রযুক্তি মাথায় রেখে অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। তাই এই দুই করিডরকে প্রথম পর্যায়ের জন্য উপযুক্ত বলে মনে করা হচ্ছে।

নিরাপত্তায় কোনও আপস নয়

ড্রাইভারলেস প্রযুক্তি নিয়ে সাধারণ মানুষের অন্যতম বড় প্রশ্ন নিরাপত্তা। মেট্রো কর্তৃপক্ষের দাবি, এই ব্যবস্থায় মানবিক ভুলের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যায়। ট্রেনের অবস্থান, গতি, ট্র্যাকের পরিস্থিতি এবং স্টেশন পরিচালনা—সবকিছু কম্পিউটারভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়।

প্রতিটি ট্রেন এবং নিয়ন্ত্রণকক্ষের মধ্যে সারাক্ষণ তথ্য আদান-প্রদান চলতে থাকে। কোনও অস্বাভাবিক পরিস্থিতি দেখা দিলে ব্যবস্থা নিজেই ট্রেন থামাতে পারে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে সরাসরি নির্দেশ পাঠানোর ব্যবস্থাও থাকবে।

যাত্রীদের কী সুবিধা হবে?

চালকবিহীন প্রযুক্তি চালু হলে ট্রেন চলাচল আরও নির্ভুল ও সময়নিষ্ঠ হবে। ট্রেনের মধ্যবর্তী ব্যবধান কমানো সম্ভব হবে, ফলে ব্যস্ত সময়ে বেশি সংখ্যক ট্রেন চালানো যাবে। এর ফলে যাত্রীদের অপেক্ষার সময় কমবে এবং পরিষেবার নির্ভরযোগ্যতা বাড়বে।

এছাড়া শক্তি ব্যবহারের ক্ষেত্রেও এই প্রযুক্তি বেশি দক্ষ। নির্দিষ্ট গতিতে চলাচল এবং স্বয়ংক্রিয় ব্রেকিংয়ের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সাশ্রয় করা সম্ভব হয়। দীর্ঘমেয়াদে পরিচালন ব্যয়ও কমতে পারে।

মানবসম্পদের ভূমিকা কি কমে যাবে?

মেট্রো বিশেষজ্ঞদের মতে, চালকবিহীন প্রযুক্তি চালু হলেও কর্মীদের গুরুত্ব কমবে না। বরং তাঁদের ভূমিকার পরিবর্তন হবে। ট্রেন চালানোর পরিবর্তে নজরদারি, প্রযুক্তিগত রক্ষণাবেক্ষণ, নিয়ন্ত্রণকক্ষ পরিচালনা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার মতো ক্ষেত্রে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন আরও বাড়বে। ফলে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মীদের নতুন প্রশিক্ষণ দেওয়াই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

ভবিষ্যতের মেট্রো পরিষেবার ইঙ্গিত

কলকাতা মেট্রো ধাপে ধাপে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। আধুনিক সিগন্যালিং, উন্নত ট্রেন নিয়ন্ত্রণ, স্মার্ট স্টেশন ব্যবস্থাপনা এবং এখন চালকবিহীন ট্রেন—সব মিলিয়ে শহরের গণপরিবহণকে আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে।

প্রথম পর্যায়ের পরীক্ষা ও পরিচালনা সফল হলে ভবিষ্যতে অন্যান্য নতুন করিডরেও একই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হতে পারে। যদিও পুরনো লাইনে এই ব্যবস্থা চালু করতে গেলে অবকাঠামোগত পরিবর্তন ও বড় বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।

কলকাতা একসময় ভারতের প্রথম মেট্রো শহর হিসেবে ইতিহাস গড়েছিল। এবার চালকবিহীন ট্রেনের যুগে প্রবেশের মাধ্যমে সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রযুক্তিগত অগ্রগতির নতুন অধ্যায়ও যুক্ত হতে চলেছে। যাত্রীদের কাছে এর অর্থ হবে আরও নিরাপদ, সময়নিষ্ঠ, আধুনিক এবং দক্ষ মেট্রো পরিষেবা।