Table of Contents
হরমুজ প্রণালিতে ফের উত্তেজনা চরমে। মার্কিন সামরিক নিরাপত্তায় চলাচলের চেষ্টা করা দুটি তেলবাহী ট্যাঙ্কারে হামলা চালিয়ে সেগুলিকে থামিয়ে দেওয়ার দাবি করেছে ইরান। অন্যদিকে, যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়া, জ্বালানির দাম বাড়া এবং ঘরে-বাইরে রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই শুক্রবার ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার জরুরি বৈঠক ডেকেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরানের ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)-এর দাবি, ‘নিয়ম না মানা’ দুটি তেলবাহী জাহাজকে লক্ষ্য করেই এই অভিযান চালানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, জাহাজ দুটি নির্ধারিত নৌপথ এড়িয়ে মার্কিন বিমানবাহিনীর নিরাপত্তায় হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার চেষ্টা করছিল।
আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, হামলার পর আরও চারটি তেলবাহী জাহাজ পথ পরিবর্তন করে আগের অবস্থানে ফিরে যায়।
হরমুজ এখন যুদ্ধের নতুন ফ্রন্ট
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়েই যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত ক্রমশ বাড়ছে। তেহরানের দাবি, ওমান উপকূলঘেঁষা দক্ষিণের নির্দিষ্ট নৌপথ ব্যবহার করা যাবে না। সেই নির্দেশ অমান্য করলে জাহাজে হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে ইরান।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানি জাহাজ ও বন্দর ঘিরে অবরোধ কার্যকর করতে গিয়ে নিজেদের নির্ধারিত নিয়ম ভাঙা জাহাজগুলির বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নিচ্ছে।
ফলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
দুই সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ফের সরাসরি সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই জলপথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে ব্যাহত। তার সরাসরি ধাক্কা পড়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে। বৃহস্পতিবার জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে আঘাত হানার পর অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।
কুয়েতেও ইরানি ড্রোন
শুক্রবারও সংঘর্ষ থামেনি। কুয়েতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও পরিকাঠামোগত স্থাপনা লক্ষ্য করে আসা ইরানের ড্রোন ভূপাতিত করেছে তারা। ঘটনায় কোনও হতাহতের খবর নেই।
অন্যদিকে, লেবাননেও নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। প্রাচীন বউফোর্ট দুর্গের কাছে রাতের অন্ধকারে বড় বিস্ফোরণ ঘটায় ইজরায়েলি সেনাবাহিনী।
ইজরায়েলের দাবি, হিজবুল্লাহর সুড়ঙ্গ ও সামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস করতেই এই অভিযান। বিস্ফোরণের অভিঘাতে দক্ষিণ লেবাননের বিস্তীর্ণ এলাকায় ছাই ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু দূর পর্যন্ত বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
তবে স্থানীয় প্রশাসনের অভিযোগ, এই হামলা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন। ইজরায়েলের পাল্টা যুক্তি, উত্তর সীমান্তের বাসিন্দাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ জরুরি ছিল।
‘কয়েক সপ্তাহের যুদ্ধ’ এখন পাঁচ মাসের
যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, মার্কিন অভিযান কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শেষ হয়ে যাবে। বাস্তবে পাঁচ মাস পেরিয়ে গেলেও সংঘাত থামেনি।
যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, ততই তার অর্থনৈতিক চাপ বাড়ছে আমেরিকার অভ্যন্তরে। পেট্রোল থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য—বাড়ছে একাধিক পণ্যের দাম। ফলে সাধারণ মানুষের অসন্তোষও ক্রমশ বাড়ছে।
এই পরিস্থিতিতেই শুক্রবার মেরিল্যান্ডের ক্যাম্প ডেভিডে মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকেন ট্রাম্প। হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লিভিট আগেই জানিয়েছিলেন, বৈঠকের কেন্দ্রে থাকবে ইরান যুদ্ধ।
তবে শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই নয়, ট্রাম্পের জন্য চাপ বাড়ছে দেশের রাজনীতিতেও।
যুদ্ধের সমর্থন তলানিতে
রয়টার্স-ইপসসের সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, এখন মাত্র প্রতি তিনজন আমেরিকানের একজন ইরানের বিরুদ্ধে চলা যুদ্ধকে সমর্থন করছেন। সংঘাত শুরু হওয়ার পর এটাই সমর্থনের সর্বনিম্ন স্তর।
যুদ্ধ নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসেও বিভাজন স্পষ্ট। প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়ে আনা একটি প্রতীকী ‘ওয়ার পাওয়ার্স রেজোলিউশন’ সিনেটে মাত্র এক ভোটের ব্যবধানে খারিজ হয়েছে—৪৯-৫০ ভোটে।
ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যেই যুদ্ধজনিত মূল্যবৃদ্ধিকে রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত করতে চাইছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ রিপাবলিকানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়াই তাদের অন্যতম লক্ষ্য।
যুদ্ধের আঁচে তেল সংস্থার মুনাফা
অন্যদিকে, সাধারণ মানুষ যখন জ্বালানির বাড়তি দামের চাপে, তখন বড় তেল সংস্থাগুলির মুনাফা বেড়েছে চোখে পড়ার মতো।
এক্সনমোবিলের মুনাফা দ্বিগুণ হয়েছে। একই সময়ে শেভরন গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পাঁচ গুণেরও বেশি লাভের কথা জানিয়েছে।
অর্থাৎ, হরমুজের সংঘাতের প্রভাব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে নেই। তেলের বাজার থেকে আমেরিকার রান্নাঘর, আর সেখান থেকে সরাসরি ট্রাম্পের ভোটের অঙ্কে—যুদ্ধের ঢেউ পৌঁছে যাচ্ছে সর্বত্র।
ক্যাম্প ডেভিডের বৈঠকে তাই শুধু যুদ্ধ কীভাবে চালানো হবে, সেই প্রশ্ন নয়; ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে এখন আরও বড় প্রশ্ন—এই যুদ্ধের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্য কতদূর গিয়ে গড়াবে?